সরকারি হাসপাতাল লক্ষ লক্ষ মানুষের শেষ ভরসা। কিন্তু সেই ভরসার ভিত কতটা মজবুত? কোথায় দুর্বল স্বাস্থ্য পরিষেবা? পরিকাঠামোর অভাবই কি বাড়াচ্ছে রোগীদের দুর্ভোগ? চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীরা সচেষ্ট, তবু গাফিলতি কোথায়? 'সংবাদ প্রতিদিন' অন্তর্তদন্ত।
নামেই মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল! সুপার স্পেশালিটি পরিষেবা দূর-অস্ত, ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরিষেবাটাও মিলছে না। শয্যার ঘাটতি, চিকিৎসকের ঘাটতি, স্নায়ু বা কর্ডিওলজির পরিষেবা মেলে না। জটিল রোগ নিয়ে কোনও রোগী এলে দায়িত্ব নেন না জুনিয়র ডাক্তাররা। রেফার করে দেন অন্যত্র। রায়গঞ্জ গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালকে এখন অনেকেই রসিকতা করে বলেন, "রোগীর চিকিৎসা হবে কীভাবে হবে, হাসপাতালই তো রেফার রোগে আক্রান্ত।"
উত্তর দিনাজপুরের একমাত্র মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল চালু হলেও ছয় তলার সার্জিক্যাল বিভাগের পুরুষ ওয়ার্ডের একাধিক শয্যার উপর পাখা নেই। বাইরের থেকে ব্যক্তিগত বৈদ্যুতিক পাখা নিয়ে এলেও ওয়ার্ডের সুইচবোর্ডে প্লাগে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। ওয়াটার পিউরিফায়ার মেশিন থাকলেও, তা অকেজো। অধিকাংশ ওয়ার্ডে শৌচাগার ব্যবহারের অযোগ্য। প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন স্নায়ুর জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে এখানে ভর্তি হন। অথচ এই হাসপাতালে নিউরোলজির একজনও চিকিৎসক নেই। ফলে অন্যত্র রেফার করে দেন কর্মরত চিকিৎসকেরা। কার্ডিওলজি বিভাগের কোনও চিকিৎসক এতদিনেও নিযুক্ত হননি এখানে। অথচ প্রায় প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন। শুধু ইসিজি ছাড়া অন্য কোনও পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। হৃদরোগীদের শুধুই ওষুধ দেওয়া হয়। নিরুপায় হয়ে কেউ কেউ কলকাতা কিংবা সুদূর বেঙ্গালুরুর বেসরকারি হাসপাতালে ছুটে যান।
ট্রমা কেয়ার ইউনিট গড়ার পরিকল্পনা এতদিনেও আলোর মুখ দেখেনি। অথচ প্রায় প্রতিদিন গড়ে দশ থেকে বারোজন পথ দুর্ঘটনায় আক্রান্ত জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের ট্রমা অ্যাম্বুল্যান্সে করে এই মেডিক্যাল হাসপাতালে সুচিকিৎসার আশায় আসেন। কিন্তু শেষ রক্ষার আগেই শেষ হয়ে যান। রায়গঞ্জ গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চালু হয় ২০১৯ সালে। দশতলা বিশিষ্ট মেডিক্যাল হাসপাতালে ৯০০ শয্যার অনুমোদন থাকলেও শুরু থেকে এখনও ৫৪৮টি শয্যা কার্যকর করছে। এই আবহে শয্যার অভাবে প্রায়ই একাধিক বিভাগের অনেক রোগাক্রান্তের চিকিৎসা নিতে ওয়ার্ডের মেঝেতেই ঠাঁই হতে হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বদলে প্রায়ই জুনিয়র ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করানোয় মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে পরিজনদের বিক্ষোভে প্রায়ই মেডিক্যাল ক্যাম্পাস সরগরম হয়ে উঠে। ঝুঁকি এড়াতে প্রায়দিনই মুমূর্ষু রোগীদের উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কিংবা কলকাতায় রেফার করে দেওয়া যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে এখানে।
যদিও সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিক্ষক চিকিৎসক-সহ ১৬০ জন নিযুক্ত হলেও তার মধ্যে রোগীদের সরাসরি চিকিৎসায় নিযুক্ত ৭০ জন। হাসপাতালের এক আধিকারিক-চিকিৎসক বলেন, "মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নাম হলেও এখনও জেলা হাসপাতালের স্বাস্থ্য পরিষেবার মধ্যেই আটকে রয়েছে।” তবে অধ্যক্ষ স্নেহাংশু পান অবশ্য বলেন, "চিকিৎসক শিক্ষক-সহ চিকিৎসকের সংখ্যা ১৬০ জন হলেও শুধুমাত্র চিকিৎসকের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। ফলে সমস্যা তো আছেই। স্বাস্থ্য ভবনে সব জানানো হয়েছে।"
(চলবে)
