আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা আন্দোলন নিয়ে জোর বিতর্ক দানা বাঁধল জঙ্গলমহলে। মানভূমের মাতৃভাষা বাংলা রক্ষার আন্দোলনকে অস্বীকার করলেন আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা! মানভূমের ভাষা আন্দোলনই হয়নি বলে মনে করেন মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো। যখন কুড়মি জনজাতির কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করতে রাজ্য সরকারের তরফে কেন্দ্রকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, সেসময় অজিতপ্রসাদের এমন বক্তব্যে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ কুড়মিদের একটা বড় অংশ।
মানভূমের ভাষা আন্দোলন। ফাইল চিত্র।
শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিন মানভূমের ভাষা আন্দোলন নিয়ে রীতিমতো বিতর্কের পরিবেশ পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলে। এদিন অজিতপ্রসাদ মাহাতোর বক্তব্য, বৃহত্তর ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠনের আন্দোলন নিয়েই তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় পার হয়েছে। এখন তা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেও জঙ্গলমহলে কেউ বা কারা যদি এই দাবি নিয়ে সরব হন তাহলে তিনি সেই পথে হাঁটবেন। মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো সেই আন্দোলনকে অস্বীকার করায় পালটা দিয়েছেন ওই আন্দোলনে যুক্ত লোকসেবক সংঘের সচিব তথা কুড়মি জনজাতির সমাজকর্মী সুশীল মাহাতো। অজিতকে বিঁধে তিনি বললেন, ‘‘এতদিন বৃহত্তর ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠনের দাবি নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে বহু মানুষ শহিদ হওয়ার পর এখন ওঁর (অজিতপ্রসাদ মাহাতো) মনে হচ্ছে, কুড়মালি একটা ভাষা। তার স্বীকৃতি প্রয়োজন। তাহলে তখন কেন তিনি বৃহত্তর ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠনের জন্য পথে নেমেছিলেন? তাহলে এত মানুষ মারা যেতেন না। এখন যে কুড়মালি ভাষার কথা বলছেন সেই ভাষায় কথা বলতে পারেন না কুড়মি জনজাতির অধিকাংশ মানুষজন।'' সবমিলিয়ে ভোটের মুখে নিজ নিজ ভাষার অধিকার নিয়ে রীতিমত তপ্ত হয়ে উঠল জঙ্গলমহল।
মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো। নিজস্ব ছবি
কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে মুখ্যসচিবের চিঠিরও সমালোচনা করেছেন মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো। তিনি বলেন, "সম্প্রতি কোটশিলায় আমাদের একটি কর্মসূচি থেকে বলেছিলাম আমাদের আদিবাসী তালিকাভুক্তির দাবিতে রাজ্য সরকার কোনও কিছু করছে না। তাই তৃণমূলকে একটি ভোট নয়। নির্বাচন আচরণ বিধি চালু হওয়ার আগে পর্যন্ত বিজেপি যদি কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পদক্ষেপ নেয় তাহলে আমরা বিজেপির পক্ষে থাকব। এরপরই রাজ্য সরকার ভোটের মুখে চিঠি পাঠাল। তাহলে এতদিন কেন পাঠায়নি? ভোটের মুখে কুড়মি মন জয় করতে এই কাজ। অথচ কমেন্ট-জাস্টিফিকেশন পাঠাচ্ছে না। তাই ওই চিঠি প্রহসন ছাড়া কিছু নয়।"
মানভূমে ভাষা আন্দোলনের শরিক লোকসেবক সংঘের সচিব সুশীল মাহাতো। নিজস্ব ছবি
তিনি মানভূমের ভাষা আন্দোলনকে অস্বীকার করায় ভাষা সেনানিদের পরিবার ক্ষুব্ধ। মূল মানতা বলেন, "মানভূমে কোন ভাষা আন্দোলন হয়নি। বিহার-বাংলা অঞ্চল স্থানান্তর আইন ছিল।" লোকসেবক সংঘের সচিব সুশীল মাহাতো বলেন, "বৃহত্তর ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠনের উনি আন্দোলন করায় বহু মানুষ শহিদ হন। বহু মায়ের কোল খালি হয়। স্ত্রী স্বামীহারা হন। ছেলেমেয়ে পিতৃহারা হয়েছেন। আর আজ উনি বলছেন, আমি আপাতত ওই পথে যাচ্ছি না। এখন তাঁর মনে হচ্ছে কুড়মালি ভাষার স্বীকৃতি প্রয়োজন। অথচ এই ভাষায় কুড়মি জনজাতির অধিকাংশ মানুষজনই কথা বলতে পারেন না।" তাঁর কথায়, "সেই সময় নবগঠিত কংগ্রেসের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাঁরা বলেছিলেন, আমাদের মাতৃভাষা হিন্দি, বিহার মে রহেঙ্গে। তাদের পরিবারের মানুষজনই এখন বলছেন আমাদের মাতৃভাষা কুড়মালি।"
