জন্মদায়িনী মায়ের নিস্পন্দ দেহে প্রণাম করে চোখভরা কান্নার জল মুছতে মুছতে মাধ্যমিক পরীক্ষায় (Madhyamik Exam) বসলেন মেয়ে। সোমবার ছিল অঙ্ক পরীক্ষা! এদিকে তাঁর জীবনে বদলে গিয়েছে সমস্ত অঙ্ক! বাড়িতে মায়ের নিথর দেহ রেখে কান্নাকে বুকে চেপে পরীক্ষাকেন্দ্রে অঙ্কের সমাধান করতে করতে হঠাৎই যেন কলম থেমে থেমে যাচ্ছিল তার, সারাজীবনের জন্য হারানো মায়ের কথা ভেসে আসতেই চোখের জলের ফোঁটায় যেন ভেসে যাচ্ছিল পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র। তবুও দৃঢ়, অনড়! তিন ঘন্টা পরীক্ষার শেষে দুপুরে গর্ভধারিণীর মুখাগ্নি করতে বাড়ি থেকে মায়ের দেহ নিয়ে শ্মশানের পথে রওনা দিল স্বজন-পড়শিদের সঙ্গে পরীক্ষার্থী সন্তান। এমনই হৃদয় বিদায়ক ঘটনার সাক্ষী থাকল ইটাহারের দানগাছি গ্রাম।
দুর্গাপুর ভুপালচন্দ্র বিদ্যাপীঠের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী নন্দিনী বর্মন। অসুস্থ মায়ের দেখাশোনার মধ্যেই গত চার দিন ধরে যথাযথ ভাবেই রায়গঞ্জের মাড়াইকুড়া ইন্দ্রমোহন উচ্চ বিদ্যাপীঠের পরীক্ষাকেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছিল। কিন্তু সোমবার গণিত পরীক্ষা শুরুর কয়েক ঘন্টা আগেই জীবনের সবচেয়ে বড় অঘটনটি ঘটে যায়! তাও আবার কিনা জীবনের বড় পরীক্ষার মুহূর্তে। সোমবার ভোর চারটা নাগাদ রায়গঞ্জের একটি নার্সিংহোমে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ৩৯ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন পরীক্ষার্থীর মা রেখা বর্মন। সেই সময় পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছনোর জন্য দুর্গাপুরের দানগাছির বাড়িতে প্রস্তুত হচ্ছিল পরীক্ষার্থী কন্যা। আর সেইসময় মর্মান্তিক পরিণতির খবর পৌঁছয় বাড়িতে। কান্নায় ভেঙে পড়ল নন্দিনী। তারপর নার্সিংহোমে পৌঁছে সদ্য প্রয়াত মায়ের পায়ে ছুঁয়ে প্রণাম করে কাঁদতে কাঁদতে পরিবারের জ্যাঠা পার্থ বর্মনের সঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছয় ওই পরীক্ষার্থী। পরীক্ষাকেন্দ্রে বাকি সাধারণ পরীক্ষার্থীদের সঙ্গেই আগের নির্দিষ্ট ঘরেই গণিত পরীক্ষা দেয়। কিন্তু উত্তরপত্রে অঙ্কের সমাধান লিখতে লিখতে মায়ের কথা মনে পড়তেই লেখা থামিয়ে কান্নায় ভেসে যায় ছাত্রী। কেন্দ্রের পরীক্ষকদের সহযোগিতায় ফের উত্তরপত্রে লিখতে শুরু করে সে।
মায়ের দেহের পাশে কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়ে।
পরীক্ষাকেন্দ্র স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক বিশ্বজিৎ মন্ডল বলেন," পরীক্ষা চলাকালীন মাঝে মাঝে কান্নাকাটি করছিল ওই পরীক্ষার্থী। তবে পুরো সময় পরীক্ষা দিয়েছিল।" বেলা দু'টো নাগাদ পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরতেই ততক্ষণে বাইরের মাঠে শায়িত মায়ের দেহ ঘিরে পাড়ার স্বজন আত্মীয়েরা। মাকে দেখেই নির্বাক সে। পরীক্ষার ব্যাগ ফেলে মায়ের মুখে হাত বাড়িয়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করে একমাত্র কন্যা। বাবা শ্যামল বর্মন কোনক্রমে মেয়ের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মায়ের দেহ আঁকড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছে মেয়ে। তারপর দেহ নিয়ে শেষকৃত্যের জন্য দুর্গাপুর শ্মশানের পথে স্থানীয় লোকজনেরা। সঙ্গে পরীক্ষার্থী। অকালে স্ত্রীকে হারিয়ে কান্না ভেজায় গলায় স্বামী শ্যমল বর্মন বলেন," মৃত্যুর আগে স্ত্রী মেয়েকে বলে গিয়েছিল মুখাগ্নির জন্য। তাছাড়া আমার তো কোন ছেলে নেই৷ তাই মেয়েই মুখাগ্নি করেছে।"
তবে আশ্চর্যের বিষয়, দুর্গাপুরের ভুপালচন্দ্র বিদ্যাপীঠের কোন শিক্ষক শিক্ষিকাকে দেখা যায়নি মা হারা পরীক্ষার্থীর পাশে। স্কুলের প্রধানশিক্ষক উৎপল গোস্বামী বলেন," খোঁজ নেব।" শ্মশানের চিতায় খড়ির উপর শায়িত মায়ের দেহে শেষপর্যন্ত আগুন সংযোগ করল পরীক্ষার্থী কন্যা। আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। মায়ের চিতাকে পিছনে রেখে কান্নায় ভাসল কন্যা।
