‘ওসিডি’ ছবিটা ঘরানার দিক থেকে সাইকোলজিকাল থ্রিলার। যে সিনেমার বীজ প্রোথিত হয়ে আছে শৈশবের ট্রমায়। ছবিটা এককথায় বহুস্তরীয়। প্রথম দৃশ্য থেকে মনযোগ টেনে নেয়। এক শিশুর মনে কানে শোনার কথার কী মারাত্মক প্রভাব তৈরি হতে পারে? ‘ওসিডি’ দেখতে দেখতে উপলব্ধি করা যায়।
শ্বেতার ‘নোংরা’ সরানোর পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু কোনওভাবেই এই ছবিটিকে উপেক্ষা করা যাবে না। এত জোরালো অভিনয় এবং নির্মাণ। আর জীবনের কাহিনির চলনের সঙ্গে থ্রিল এলিমেন্ট চমৎকার ভাবে মিশেছে। অতীত-বর্তমানে সাঁকো বাঁধার পদ্ধতি প্রায় নির্ভুল।
ছবির কেন্দ্রে শ্বেতা (জয়া আহসান)। যে পেশায় ডার্মাটোলজিস্ট। ছোটবেলা কেটেছে অত্যন্ত রক্ষণশীল ঠাম্মার সান্নিধ্যে। যে তাকে শিখিয়েছে ‘ক্লিনলিনেস ইজ গডলিনেস’। ঠাম্মি তাকে আরও শিখিয়েছে শরীর নোংরা হলে মনটাও অপরিষ্কার হয়ে যায়। এই মেয়েটি ছোটবেলায় এমন কিছু নোংরা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়, যা তার মনে গভীর অভিঘাত রেখে যায়। সে ভাবতে থাকে, ভগবান যে সুন্দর পৃথিবী গড়েছেন, তাকে নোংরা করে তুলছে কিছু মানুষ। তাদের বয়স্ক বাড়িওয়ালা ভালোকাকুর (ফজলুর রহমান বাবু) ব্যাড টাচের অভিজ্ঞতা ছাপ রেখে যায় তার শিশুমনে। অন্যদিকে ঠাম্মার কথামতো পরিচ্ছন্ন থাকার অভ্যাস একসময় শ্বেতার ‘ওসিডি’-র রূপ নেয়। একটা মানুষের বেড়ে ওঠা, অতীত কীভাবে বাকি জীবনের দিক-নির্দেশ করে এই ছবিতে দেখার। শৈশবের নিগ্রহ যে গভীর ক্ষত তৈরি করে মনে, তার প্রভাবে মানুষের জীবনবোধ ও পরবর্তী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত হতে পারে এবং এখানে শ্বেতার প্রতিশোধ স্পৃহার নেপথ্য কারণ হিসেবে উঠে আসে অতীত। তার মানসিক স্থিতি কীভাবে নড়ে যায় এবং সে পৃথিবীর জঞ্জাল সরানোর দায় নিয়ে নেয় নিজের দিকে। ঘটনাক্রমে তার জায়গা হয় অ্যাসাইলামে। অপরাধী শ্বেতার সঙ্গে দেখা করতে আসে এক উকিল (কার্তিকেয় ত্রিপাঠী)। শুরুতে এই কথোপকথনের মাধ্যমে ছবির গল্প একটু একটু করে সামনে আসে।
‘ওসিডি’তে জয়া আহসান, ছবি: ফেসবুক
সৌকর্য অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিত্রনাট্য বুনেছেন। প্রায় পিঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো গল্পটা সামনে আসে। আর দ্বিতীয়ার্ধ আরও চিত্রাকর্ষক। দুটো দৃশ্যের কথা না বললেই নয়, দুটি বাচ্চা (শ্বেতা ও নতুন ভাই, অভিনয় : আর্শিয়া ও ঋষাণ) একসময় মুখোমুখি হয়। একজন মাকে হারিয়েছে অন্যজন বাবাকে। তাদের দেখা হচ্ছে শ্বেতার বাবার দ্বিতীয় বিবাহসূত্রে। অনবদ্য সেই আলাপের মুহূর্ত। আর একটি, যখন শ্বেতার সত্তার সমস্ত দিক স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে সায়ানের সামনে। বাকিটা ছবিতে দেখাই ভালো। সিনেমায় ওসিডি এবং পিডোফিলিয়া শুধু নয়, সমকামের প্রসঙ্গও এসেছে নির্ভার উচ্চারণে। তবে শ্বেতার ‘নোংরা’ সরানোর পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু কোনওভাবেই এই ছবিটিকে উপেক্ষা করা যাবে না। এত জোরালো অভিনয় এবং নির্মাণ। আর জীবনের কাহিনির চলনের সঙ্গে থ্রিল এলিমেন্ট চমৎকার ভাবে মিশেছে। অতীত-বর্তমানে সাঁকো বাঁধার পদ্ধতি প্রায় নির্ভুল। ছবির মেজাজ তৈরিতে অকৃত্রিম ও পরিমিত শব্দের ব্যবহার দারুণ কার্যকরি হয়েছে। অলোক মাইতির ক্যামেরার কাজ ছবিটিকে অন্য মাত্রায় উত্তীর্ণ করে। অর্ঘ্যকমল মিত্রের সম্পাদনা সিনেমার গতি ধরে রেখেছে নিখুঁতভাবে।
এবার আসি অভিনয় প্রসঙ্গে। জয়া আহসান কেন্দ্রচরিত্রে নিজেকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তাঁর চরিত্রের বিষণ্ণতা, ক্রোধ, নির্লিপ্ত স্রেফ অভিব্যক্তি আর চোখের চাউনিতে ধরেছেন তিনি। একটা দৃশ্যেও নিজেকে শিথিল করেননি। বান্ধবী সায়ানের চরিত্রে শ্বেতা ভট্টাচার্য একেবারে এফর্টলেস। অ্যাডভোকেটের রোলে কার্তিকেয় ত্রিপাঠী আগাগোড়া সাবলীল। কৌশিক সেন প্রতিবেশী কাউন্সিলারের ভূমিকায় দুর্দান্ত। তাঁর এমন ডার্ক শেড আগে দেখিনি। ঠাম্মার ভূমিকায় অনসূয়া মজুমদারও দারুণ। ভালোকাকুর চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু চরিত্রের চাহিদা পূরণ করেছেন। তাঁর স্ত্রীর রোলে কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় যতটুকু আছেন বিশ্বাসযোগ্য। কিশোরী শ্বেতার চরিত্রে ভালোলাগে আর্শিয়াকেও। সব মিলিয়ে এই ছবি প্রেক্ষাগৃহে দেখার। পরিচালক সৌকর্য ঘোষাল সম্পর্কে বলব, তাঁর আগের সব কাজ ছাপিয়ে গিয়েছেন। আগামীতে তাঁর কাছে আরও ভালো ছবির প্রত্যাশা রইল।
