নির্মল ধর: ধর্মেন্দ্রর শেষ ছবি। সেই আবেগ আঁকড়েই প্রেক্ষাগৃহে 'ইক্কিস' (Ikkis Review) দেখতে ঢুকি। শ্রীরাম রাঘবন পরিচালিত এই সিনেমা যে একাত্তর সালের বসন্তর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৈরি, সেটা জানাই ছিল। একাধিক ঝলক দেখেও মনে হয়েছিল, 'ইক্কিস'-এ শুধুই ভারত-পাকিস্তানের শত্রুতার নিদর্শন আর যুদ্ধ দেখতে পাব। কিন্তু ফিরলাম দেশের মাটির গন্ধ আর এক অনন্য অনুভূতি নিয়ে। তবে 'ইক্কিস'কে শুধু ধর্মেন্দ্রর শেষ ছবি না বলে অগস্ত্য নন্দার কেরিয়ারের প্রথম মাইলস্টোন বলতে হবে। কেন? তাহলে একটি বিশ্লেষণ করেই বলা যাক।
বলিউড এবং দক্ষিণী সিনেনির্মাতারা বর্তমানে যেখানে পর্দায় প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে ব্যস্ত কিংবা দেশপ্রেমের নামে ক্রমাগত দুটি দেশের মধ্যে বিরোধের আগুন জ্বালিয়ে চলেছে, সেই আবহ থেকে ১৮০ ডিগ্রি সরে পরিচালক শ্রীরাম রাঘবন দেখিয়ে দিলেন স্বদেশ চেতনার সঙ্গে মানবিকতা বোধ ও যুদ্ধে লিপ্ত যুযুধান দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের একটা সেতু গড়া ভীষণ জরুরি। সেই কাজটাই করল 'ইক্কিস'। সেইজন্যেই সম্ভবত এই সিনেমার শেষ দিনের শুটিংয়ে ধর্মেন্দ্র বলেছিলেন, "ইক্কিস ভারত-পাকিস্তান দু'দেশের নাগরিকদেরই দেখা উচিত।"
এই ছবি প্রমাণ করে দিল উগ্র দেশাত্মবোধের নামে রণহুঙ্কারের স্লোগান নয়। চোখধাঁধানো অ্যাকশন, কামান, ট্যাংক নিয়ে গোলাগুলির লড়াই আর রক্তের বন্যা বইয়ে দর্শকের হৃদয় জয় করা যায় না। হয়তো তাৎক্ষণিক আর্থিক সাফল্য আসে! ঘটনা ও চরিত্রের বিশ্লেষণ যেমন যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছে 'ইক্কিস', তেমনই দেশপ্রেমের জন্য ভারতীয় সৈনিকের আত্মত্যাগের কথাও বলেছে। একাত্তর সালে বসন্তরে ভারত-পাক যুদ্ধের আবহে জাতীয় প্রতিরক্ষা অ্যাকাডেমি থেকে সদ্য পাশ করা তরুণ অরুণ ক্ষেত্রপাল সরাসরি সীমান্তে পোস্টিং পান। পুনা হর্স রেজিমেন্টের ট্যাংক কমান্ডার হয়ে সীমানা পেরিয়ে পাকিস্তানের মাটিতে ঢুকে রীতিমতো বিধ্বংসী লড়াই চালান অরুণ তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে। একইসঙ্গে শত্রুপক্ষ পাকিস্তানের সৈনিক ব্রিগেডিয়ার নাসিরের আক্রমণে বীরের মতো শহিদ হন তরুণ ভারতীয় যোদ্ধা অরুণ (অগস্ত্য নন্দা)। এরপর চিত্রনাট্য অনুযায়ী, পরিচালক অরুণ ক্ষেত্রপালের অবসরপ্রাপ্ত বয়স্ক বাবা মদনলালকে (ধর্মেন্দ্র) কলেজের পুনর্মিলন অনুষ্ঠানে পাঠিয়ে দেন লাহোরে। সেখানে তিনি আতিথেয়তা পান ব্রিগেডিয়ার সৈনিক নাসিরের (জয়দীপ আহলাত) বাড়িতে। তিনিই মদনলালকে নিয়ে যান সারগোদা গ্রামে তাঁর পুরোনো ভিটে দেখাতে। শুধু তাই নয়, তিরিশ বছর আগে যে মাঠে একটা গাছের তলায় বীরের মতো যুদ্ধের করাকালীন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন তাঁর পুত্র, সেখানেও নিয়ে যান। তারপর ফিরে আসা দেশে।
ছবির মূল বক্তব্য, যুদ্ধে দুই দেশের কেউই জেতে বা হারে না, শুধু মৃত্যু হয় মানুষের। যার ফলে হারে মানবিকতা, মূল্যবোধ এবং উগ্র দেশপ্রেমের অছিলায় সত্যিকার দেশপ্রেম! চারদিকে যখন সিনেদুনিয়ার একাংশ 'আইএসআই', 'র'-এর গুপ্তচরদের হুংকার ও অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখিয়ে ব্যবসা করতে ব্যস্ত, তখন রাঘবন দেখিয়ে দিলেন, যে কোনও যুদ্ধেরই একটা অন্যদিক রয়েছে।
এই ছবির আরও বড় প্রাপ্তি হল নতুন মুখ অগস্ত্য নন্দা। প্রথম ছবিতেই যিনি বাজিমাত করেছেন। তরুণ অগস্ত্য তাঁর পরিবারের অভিনয়ধারাকে শুধু অনুসরণ করেনি, হোমওয়ার্ক করে বেশ পোক্ত হয়েই ক্যামেরার সামনে এসেছে। এমনকি প্রেমিকা কিরণের (সিমন ভাটিয়া) সঙ্গে রোমান্টিক দৃশ্যের অভিনয়েও খুবই সাবলীল লাগলো অমিতাভ বচ্চনের নাতিকে। ধর্মেন্দ্র তাঁর জীবনের শেষ অভিনয়েও বুঝিয়ে দিলেন তিনি সত্যিই কত বড় মাপের অভিনেতা ছিলেন। অ্যাকশন হিরো হয়েও তিনি আস্তিনের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলেন সংবেদনশীল মনের এক শিল্পীকে। যা তিনি উজাড় করে দিলেন এই শেষ ছবি 'ইক্কিস'-এ। সেই সঙ্গে নাসিরের চরিত্রে জয়দীপ আহলাতও দক্ষ অভিনয়ে ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গিয়েছেন। কলকাতার একাবল্লী খান্না নাসিরের স্ত্রীর ভূমিকায় বেশ সাবলীল। অল্প সময়ে ছোট্ট ভূমিকায় চোখে পড়েন প্রয়াত আসরানিও। প্রায় প্রত্যেক শিল্পীর স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত অভিনয়, পরিচালকের সামাজিক দায়িত্ববোধ ও পরিবেশনার সৌকর্য 'ইক্কিস'কে নতুন বছরের প্রথম দিনের এক সুন্দর উপহারজ্ঞানে গ্রহণ করতেই পারেন।
