২০১৯ সাল, ১৫ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার মুক্তি পেল 'ভবিষ্যতের ভূত'। কিন্তু সেদিন নন্দনে ঠাঁই পাননি অনীক দত্ত! বলা ভালো, ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পোস্টার আস্ফালনে প্রতিবাদের জেরেই সরকারি প্রেক্ষাগৃহের পর্দায় প্রদর্শিত হয়নি তাঁর সিনেমা। সাত বছর বাদে, ২৯ মে, আজও এক শুক্রবার। সেই নন্দন চত্বরেই শেষবারের মতো অনীক দত্তকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানানো হল। উপস্থিত ছিলেন টলিউডের বিশিষ্টজনেরা। এরপর টালিগঞ্জের এনটিওয়ান স্টুডিও হয়ে কেওড়াতলায় মহাশ্মশানে পৌঁছয় অনীক দত্তর নিথর দেহ। কিন্তু কাতারে কাতারে সেলেবদের ভিড়ে সেভাবে চোখে পড়েনি অনীকের 'সত্যজিৎ' জীতু কমলকে (Jeetu On Anik Dutta's Demise)। স্টুডিওর বাইরে এককোণে ঠাঁয় পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন অভিনেতা।
"বহু প্রযোজকের মুখে শুনেছি, অনীক দত্তের ছবি করলে রিলিজে সমস্যা হবে। আরও অনেক কিছু, সেই কথাগুলো তো অনীকদার কানেও যেত।..."
অভিভাবকসম পরিচালকের প্রয়াণের শোক চোখেমুখে স্পষ্ট। বুধবার অনীকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন হাসপাতালে। তারপর থেকে 'চুপ' জীতু। শুক্রবার নীরবতা ভাঙলেন কেওড়াতলা মহাশ্মশানে দাঁড়িয়ে। ঠিক যখন পরিচালকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলছে। সেখানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কার্যত বোমা ফাটালেন অনীক দত্তর 'মাণিক' জীতু কমল। বললেন, "ওঁর সিনেমা চালাতেই দেবে না। কী অন্যায় করেছিলেন অনীকদা? জানেন, উনি কীরকম মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল? এখন চলে যাওয়ার পর বলা হচ্ছে- উনি মানসিক রোগী ছিলেন, এছাড়াও নানারকমভাবে কাঁটাছেড়া করা হচ্ছে! কিন্তু এই অবসাদের বীজবপন কোথায় হয়েছিল? একবার খোঁজ নিন তো। ২০২২-'২৩ সালের পর যে ছবিটা করলেন 'যত কাণ্ড কলকাতাতেই', সেসময়ে উনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তবে এই মানসিক অবসাদের বীজটা কিন্তু অনেক আগেই বপন করা হয়েছিল।" কীরকম?
"পূর্বতন সরকারের দেওয়া মানসিক যন্ত্রণা,ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সেই সময় শিল্পীমহলের কেউই কোনও কথাই বলেনি। বরং সেই ঝান্ডাকে আরও উড্ডীয়মান করেছে গিয়েছেন প্রতিনিয়ত শিল্পীমহলের সিংহভাগ..."
জীতুর সংযোজন, "বহু প্রযোজকের মুখে শুনেছি, অনীক দত্তের ছবি করলে রিলিজে সমস্যা হবে। আরও অনেক কিছু, সেই কথাগুলো তো অনীকদার কানেও যেত। লড়াই আমিও করি। কিন্তু ওই বয়সে এসে উনি যে লড়াইটা করতেন, সেটা কুর্নিশ জানানোর মতো। কীভাবে ওঁর ছবি আটকে দেওয়া হয়েছে, সেটাও দেখেছি। প্রযোজকদের বলে দেওয়া হত, অনীক দত্তর সঙ্গে যেন কেউ কাজ না করেন। অনীকদার কাছে আমার একটাই প্রার্থনা, ওঁর মতো ঋজু মনোভাব যেন আমি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত রাখতে পারি।"
অনীক দত্তর শেষ যাত্রা। নিজস্ব চিত্র
"অনীককে বার বার সরকারের তরফে অপমান করা হচ্ছিল। ওর সিনেমাগুলিকে বন্ধ করানোর চেষ্টা। সেই শোধটা তুলতাম কিন্তু ও সুযোগ দিল না।..."
জীতুর কথায়, "পূর্বতন সরকারের দেওয়া মানসিক যন্ত্রণা,ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সেই সময় শিল্পীমহলের কেউই কোনও কথাই বলেনি। বরং সেই ঝান্ডাকে আরও উড্ডীয়মান করেছে গিয়েছেন প্রতিনিয়ত শিল্পীমহলের সিংহভাগ, সেসব অত্যাচারীদের সমর্থন করে করে। অকারণে একটা মানুষকে নন্দন থেকে কার্যত ব্যান করে রাখা হল, কোনও মাথারাই কিন্তু কথা বলেনি। ঘাপটি মেরেছিল।" অভিনেতার পাশাপাশি এদিন টালিগঞ্জের এনটিওয়ান স্টুডিওয় দাঁড়িয়ে চোখে জল নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ও। নেত্রী-অভিনেত্রী বললেন, "অনীককে বার বার সরকারের তরফে অপমান করা হচ্ছিল। ওর সিনেমাগুলিকে বন্ধ করানোর চেষ্টা। সেই শোধটা তুলতাম কিন্তু ও সুযোগ দিল না। ও কেন সুযোগ দিল না? সেই শোধটা তুলতাম আমরা সকলেই। দল-মত নির্বিশেষে আমরা সবাই অনীককে ভালোবাসি। ওঁর স্ত্রীকে বহু বছর ধরে চিনি। অনীকদের বাড়িতেও গিয়ে শুটিং করেছি, খেয়েছি। সে বহু বছর আগের কথা। তার পর ফোনেও কথা হত। আজ নন্দনে ওঁকে সম্মান জানানো হল। কিন্তু এভাবে তো আমরা ওঁকে সম্মান জানাতে চাইনি।"
