সালটা ছিল ২০০৮। সেই বছর মুক্তি পেয়েছিল রাজ চক্রবর্তী পরিচালিত অসমাপ্ত প্রেম কাহিনির নেপথ্যে তৈরি সিনেমা 'চিরদিনই তুমি যে আমার।' সেই ছবিতে প্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Banerjee) অভিনয় সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছিল। কাকতালীয়ভাবে জলের স্রোতে তলিয়ে গেলেন একই সিনেমার একই গানের গায়ক ও নায়ক। ২০২৫-এর ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই জুবিনের মৃত্যু সংবাদ! অসমের ভূমিপুত্রের মৃত্যুর বছর ঘোরার আগেই দিঘা সংলগ্ন তালসারিতে শুটিং করতে গিয়ে ভয়াল ঢেউ কেড়ে নিল রাহুলের জীবনও। যদিও মৃত্যুর কারণ তদন্ত সাপেক্ষ।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একজন অভিনেতাই ছিলেন না তিনি ছিলেন একাধারে একজন লেখক, থিয়েটার শিল্পীও। বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন রাহুলের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই সোশাল মিডিয়ায় উঠে এসেছে জুবিন প্রসঙ্গ। রাজের সিনেমার দুই সদস্যের শেষ সময়ে একই পরিণতি! জলের অপর নাম জীবন কিন্তু, সেই জল জীবনদানের পরিবর্তে জীবনটাই কেড়ে নিল! এ যেন এক অদ্ভুত সমাপতন! হালফিলে বাংলা সিনেমা পরিবেশনের ধরন বদলেছে। কিন্তু, আজ থেকে ১৮ বছর আগে ফিরে গেলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অন্য ছবি। সেইসময় বাংলা ইন্ডাস্ট্রি কাঁপাচ্ছেন দুই সুপারস্টার দেব আর জিৎ।
টিকে থাকার লড়াইটা তখন আরও কঠিন। 'নেক্সট বিগ থিং'-হওয়ার প্রতিযোগীতায় সামিল প্রতিটি অভিনেতা-অভিনেত্রী। ঠিক সেই সময় কৃষ্ণ-পল্লবীর প্রেমকাহিনি যেন সব হিসেবে এলোমেলো করে দিল। আহান পাণ্ডে ও অনীত পাড্ডার 'সাইয়ারা'-র হৃদয় বিদারক প্রেম কাহিনির জনপ্রিয়তার মাঝেও বাঙালি দর্শকের মনে 'চিরদিনই তুমি যে আমার'- এর রাহুল-প্রিয়াঙ্কার স্মৃতি যেন ফের জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। নবাগত রাহুলের সাবলীল অভিনয়ের সঙ্গে জুবিন গর্গের জাদুকরী কণ্ঠের মিশেলে 'পিয়া রে' গান বাঙালির অনুভূতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। উসকোখুসকো চুল, চোখ আর শরীরী ভাষায় ব্যর্থ প্রেমিক রাহুল যেন ঠিক পাশের বাড়ির ছেলে।
আটের দশকে এমন কোনও প্রেমিক-প্রেমিকা বোধহয় ছিল না যাঁর হৃদয় এই গান ছুঁয়ে যায়নি। সেই সময় সোশাল মিডিয়ার এত বাড়বাড়ন্তও ছিল না। সিনেমার প্রচারেও থাকত না বিশেষ কোনও চমক। আর যদি রাহুলের কথা বলা হয় তাহলে তো না ছিল দেবের মতো পেটানো চেহারা না ছিল জিতের মতো গ্ল্যামার। তবুও কৃষ্ণ প্রেমে বিভোর হয়েছিল সিনেপ্রেমীরা। বলিউডে জুবিনের পরিচিতি থাকলেও বাংলা ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে চিনেছে 'পিয়া রে' গানেই। জুবিন জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল এই গানটি। আর সমুদ্রের নোনা জলেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল জুবিনের স্বর আর রাহুলের 'ব্যর্থ প্রেমে'র যন্ত্রণা।
একজন শিক্ষিত, সংবেদনশীল বাঙালি অভিনেতা হিসেবে রাহুল ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের একটা পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। যে কোনও বিষয়ে সাহসের সঙ্গে নিজের মতামত ব্যক্ত করতে পিছপা হতেন না। মূল ধারার বাণিজ্যিক ছবি নিয়ে রাহুলের কোনও ছুঁৎমার্গ ছিল না। কিন্তু, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারনে 'আঁতেল' বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ সেই 'আঁতেল'-ই কিন্তু বাংলা সিনেমার ইতিহাসে 'চিরদিনই তুমি যে আমার'-এর মতো একটি নজিরবিহীন কাজ করেছেন, মৃত্যুর পরবর্তী সময়ও যা তাঁর সঙ্গী হয়ে থেকে যাবে।
