বাঙালির পয়লা বৈশাখ মানেই নস্ট্যালজিয়া। পোশাক থেকে খাবার, আড্ডা থেকে হালখাতা, সবেতেই থাকে বাঙালিয়ানার ছাপ। তবে আজকের বাঙালি কি ততটাই উন্মুখ থাকে নববর্ষ নিয়ে? অতীত স্মৃতিচারণা এবং এবারের নববর্ষের পরিকল্পনা নিয়ে 'সংবাদ প্রতিদিন' ডিজিটালে লিখলেন অনুপম রায়।

পয়লা বৈশাখ নিয়ে ছোটবেলার দেদার স্মৃতি রয়েছে। দুই দাদু-দিদার থেকে নতুন জামা পেতাম, তাই নিয়ে খুব উৎসাহ ছিল। বুঝতে পারতাম এটা একটা বিশেষ দিন। বাইরে কোথাও খেতে যাওয়া হত। তবে সেটা এখনকার মতো রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া নয়। তখন একটা কোলড্রিংক খাওয়াও ছিল খুব বড় ব্যাপার। কারণ রোজ রোজ ঠান্ডা পানীয় খাওয়ার নিয়ম ছিল না। মূলত উৎসবের দিনেই এইসব খাওয়া হত। আমার কাছে জীবনের নানান অধ্যায়ে পয়লা বৈশাখের গুরুত্ব পালটে-পালটে গিয়েছে। ছোটবেলার কথা তো বললাম, তখন মা শিখিয়েছিলেন এটা বাংলা বছরের শুরু। কলেজে উঠে এই দিনটার বিশেষ প্রয়োজন বোধ করিনি। পয়লা বৈশাখ তখন কেবলমাত্র খাতায়-কলমের একটা ব্যাপার। পয়লা বৈশাখের গুরুত্ব বিশেষ করে টের পেয়েছিলাম যখন কলকাতা ছেড়ে আমি বেঙ্গালুরু শিফট করলাম। সেখানে আমরা বাঙালিরা মাইনরিটি। মাইনরিটির একটা অদ্ভুত ক্রাইসিস থাকে। নিজের আইডেনটিটি বা অস্তিত্ব নিয়ে আমি বিশেষ করে খুব চিন্তিত থাকতাম। এই যে নিজের আইডেনটিটি প্রকাশ করতে পারছি না, এক্সপ্রেস করতে পারছি না, সেটা নিয়ে একটা অস্বস্তি কাজ করত। তার প্রধান কারণ চাকরি করতে গিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হিন্দি কিংবা ইংরেজিতে কথা বলতে হত। একটা কসমোপলিটন কালচারের মধ্যে তখন আমার যাপন। অফিসের ক্যাফেটেরিয়াতে গোটা ভারতের নানান সংস্কৃতির মিশ্রণ। সেখানে আমি যে বাঙালি বা স্পেশাল কিছু, সেটা আলাদা করে প্রমাণ করতে ইচ্ছে করত। এটার মনস্তাত্ত্বিক কারণ আমি ঠিক বলতে পারব না। কলেজে যেটা করিনি, সেটা এখানে এসে করেছি।
প্রতি পয়লা বৈশাখে পাঞ্জাবি পরে অফিসে যেতাম। দুপুরে লাঞ্চ স্কিপ করে আমরা কয়েকজন বাঙালি মিলে বাইরে খেতে যেতাম। তখন থেকেই কিন্তু ‘বেঙ্গলি থালি’, ‘বেঙ্গলি লাঞ্চ’- এই ব্যাপারটা শুরু হয়ে গিয়েছে। সে সব প্রচণ্ড দাম দিয়ে খেয়ে দারুণ তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। অন্য কলিগরা একটু অবাক হত, আমরা তখন ক্যাজুয়ালি বলতাম, ‘পয়লা বৈশাখে আমরা তো এটা করেই থাকি।' প্রবাসে যারা বাঙালি তারা গেট-টুগেদার করত। সেই সব গ্যাদারিংয়ে যাওয়া নিয়ে উৎসাহ কাজ করত। সেখানে আড্ডা, গানবাজনা এবং বাঙালি খাওয়াদাওয়া হত। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সব বাঙালি একজায়গায় হলেই সকলে শেষমেশ গানই গায়। সেখানে আমিও গিটার নিয়ে চলে যেতাম আর গানবাজনা করতাম। এইভাবে ছ’টা পয়লা বৈশাখ পার করেছি। তারপর যখন আমি কলকাতায় ফিরে আসি, ততদিনে খানিকটা নাম-ডাক হয়ে গিয়েছে। আর বিখ্যাত হওয়ার কারণে পয়লা বৈশাখে নানান অনুষ্ঠানে ডাক পড়া শুরু করল। বাঙালির যে কালচারাল ক্ষেত্র আমি তার একটা অংশ বলেই মনে করি। ফলে আমি যদি কখনও পয়লা বৈশাখ ভুলেও যাই, আমাকে ভুলে যেতে দেওয়া হয় না। মারাত্মক গ্লোবালাইজেশনের মধ্যেও বাংলা মাস, বাংলা ক্যালেন্ডার মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, এটা ভালোই বলতে হয়। এবারেও পয়লা বৈশাখের আশপাশে নানান গানের অনুষ্ঠান করেছি।
এখন আর আগের মতো পয়লা বৈশাখে নতুন জামা কেনা হয় না। আসলে আগে বাঙালি নতুন জামা-কাপড় কিনত বছরে দু’বার- পয়লা বৈশাখ এবং দুর্গা পুজোয়। মানুষের হাতে সবসময় টাকা থাকত না আর থাকলেও সেটা খরচ করত বিশেষ উৎসবের সময়। এখন সারাবছর কিছু না কিছু লেগেই থাকে। অনলাইন কেনাকাটাও এসে গিয়েছে। সারাবছর মানুষ কেনাকাটা করে। যে কোনও কিছুই অতি ব্যবহারে বা সহজলভ্য হয়ে গেলে তার বিশেষত্ব হারিয়ে ফেলে। তাই নতুন জামা কেনার যে উত্তেজনা, ম্যাজিক-মোমেন্ট সেটা হারিয়ে গিয়েছে।