ফ্লাইটে মুম্বই-আমেদাবাদ। নেটফ্লিক্সের দু’টো দীর্ঘ এপিসোড। একখানা আস্ত ফুটবল ম্যাচ। ছুটির দুপুরের লম্বা ভাতঘুম। রোববার গুজরাট স্পোর্টস ক্লাব থেকে বিশ্বকাপ ফাইনালের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে আসতে যত সময় লাগল, তাতে উপরে যা লিখলাম, তার যে কোনও একটা অনায়াসে হয়ে যাবে! অবশ্যই রোববারের প্রেক্ষিতে এ হেন সময়-বয়ান লেখা। বছরের আর পাঁচদিনের খতিয়ান তা মোটেই নয়। দূরত্ব মাত্র দশ কিলোমিটার যে! গুগলে সার্চ দিয়ে দেখলাম, গাড়ি থাকলে মিনিট কুড়ি। সরকারি পরিবহনে আধঘণ্টা। কিন্তু এ দিন মিডিয়া বাসে সেই দশ কিলোমিটার রাস্তা পেরোতে লাগল ঝাড়া দু’ঘণ্টা!
গতকাল লেখাপত্র মিটিয়ে গভীর রাতে প্রেসবক্স ছেড়ে বেরনোর সময় দেখেছি, আহমেদাবাদ স্টেডিয়ামের সামনে অন্তত শ’পাঁচেক লোক দাঁড়িয়ে। আপাত-দৃষ্টিতে দেখে মনে হবে, এঁরা সবাই উদ্দেশ্যহীন ক্রিকেট-অভিযাত্রী। কেন দাঁড়িয়ে, কীসের প্রতীক্ষায়, কেউ জানে না। আদতে তা নয়। এঁরা প্রত্যেকে বুভুক্ষু টিকিট-প্রত্যাশী। ফাইনালের একখানা টিকিট জোগাড় করতে পারলে জীবন যাঁদের বর্তে যাবে! তাই রাত-বিরেতকে আমল না দিয়ে স্টেডিয়ামে চলে আসা। স্টেডিয়াম চত্বরে ঘুরঘুর করা। ওই যে, যেদিকে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন!
মাঠে ট্রফি আনছেন রোহিত-ধোনি। ছবি: সংগৃহীত।
শুনলাম, রোববার সকালে বিশ্বকাপ ফাইনালের এক-একটা পাতি টিকিট বিক্রি হয়েছে পঁচিশ হাজার টাকায়! সাধারণ হোটেলের রুম ভাড়া গিয়ে দাঁড়িয়েছে দশ থেকে বারো হাজারে! ফাইনাল খেলতে নিউজিল্যান্ড যে হোটেলে ছাউনি ফেলেছে, তার ভাড়া পঁচাত্তর হাজার! আর ভারত যেখানে আছে? সেই হোটেলে থাকতে গেলে পকেটে রেস্ত থাকতে হবে কত? কত পড়বে খরচপাতি? সস্তাই। মাত্র এক লক্ষ পঁচিশ হাজার!
আশ্চর্যের হচ্ছে, ক্রিকেট জনতা তা দিচ্ছেও। সামান্যতম পিছপা হচ্ছে না। বিশ্বকাপ ফাইনাল দর্শনই তাঁদের কাছে মুখ্য। কত গেল, কত পড়ল, পুরোদস্তুর গৌণ। মিডিয়া বাস যে রাস্তা দিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে যায়, তার পাশেই আমেদাবাদ মেট্রো লাইন। বাসের জানালা দিয়ে দেখছিলাম, দুপুর তিনটে থেকে মেট্রোয় ঠাসা ভিড়। রোহিত-বিরাট-অভিষেকের জার্সি পরে জনজোয়ার চলেছে আমেদাবাদের ক্রিকেট-কলোসিয়াম অভিমুখে। ঠিকই আছে। যাবে না-ই বা কেন? পাঁচগুণ বেশি দাম দিয়ে ফাইনালের টিকিট কিনবে না কেন? জিভে জল আনা ক্রিকেট-যুদ্ধ, স্বচক্ষে আড়াই বছর আগের অভিশাপ কাটতে দেখার প্রত্যাশা–সে সমস্ত ছেড়েই দিলাম। আনুষঙ্গিক ক্রিকেট-বিনোদন যা ছিল এদিন, তার আকর্ষণও বা কম কী?
দিন দুই আগে আইসিসি সরকারি বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল, বিশ্বকাপ ফাইনালের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে কারা কারা পারফর্ম করতে আসছেন। ফাল্গুনী পাঠক। সুখবীর সিং। ‘আলে আলে’ খ্যাত রকস্টার রিকি মার্টিন। ’৯৮ ফুটবল বিশ্বকাপে যিনি শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা কাক-পক্ষীকেও জানতে দেয়নি, বিনোদনের পুণ্যকুম্ভে তার আসল মহাতারকা কে? উঁহু, কোনও ফাল্গুনী পাঠক বা রিকি মার্টিন নয়। ভদ্রলোক এসেছিলেন কালো টি শার্ট পরে, রোহিত শর্মার সঙ্গে, খেলা শুরুর আগে মাঠে বিশ্বকাপ ট্রফি রাখতে। নাম যাঁর মহেন্দ্র সিং ধোনি!
ওয়াংখেড়েতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলা দেখতে মাঠে এসেছিলেন এমএসডি। অনেকে ভেবেছিলেন যে, সেমিফাইনালের দিন সকালে শচীন তেণ্ডুলকরের পুত্র অর্জুনের বিয়েতে নিমন্ত্রণ ছিল বলে রাতে এসেছিলেন মাঠে। ফাইনালে তাঁকে দেখতে পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। কারণ, ধোনি সচরাচর অন্তরালে থাকতে পছন্দ করেন। আইপিএলের দু’মাস বাদ দিলে জন-সমাজে তাঁকে প্রায় দেখাই যায় না। কেউ ভাবতেও পারেনি যে, সেই ধোনি ফাইনাল দেখতে চলে আসবেন! রোববার সকালে সর্বপ্রথম সম্প্রচারকারী সংস্থা দু’বারের বিশ্বজয়ী ভারত অধিনায়কের হোটেলে প্রবেশের ভিডিও প্রকাশ করে। কিন্তু তখনও কেউ বুঝতে পারেনি, ধোনি শুধু ফাইনাল দেখতে আসবেন না। রোহিতের সঙ্গে ট্রফি নিয়ে মাঠেও ঢুকবেন!
সহজে, বিশ্বকাপ হাতে দেশের দুই টি-টোয়েন্টি বিশ্বজয়ী অধিনায়ক! রীতিমতো শিহরণ জাগানো দৃশ্য! এমএসডিকে দেখামাত্র এক লক্ষ তিরিশ হাজারের স্টেডিয়ামে যে গর্জনটা উঠল, তা উপস্থিতকে সাময়িক বধির করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট! কবিতা কৃষ্ণমূর্তিকে দিয়ে আবার জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ানো হল। সব ঠিক আছে। জনতার মন পেতে কম রিকি মার্টিনরা কম চেষ্টা-চরিত্র করেননি। কিন্তু তাঁরা দেখে গেলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার বছর সাত পরেও ভারতবর্ষের প্রকৃত ‘হৃদয়’ কে? কে তাঁকে বিনোদনের ময়দানেও সাত গোল দিয়ে চলে গেলেন? সত্যি। মহেন্দ্র সিং ধোনি মাঠে থাকলে, আজও কাউকে আর লাগে না!
