অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। বৈভব সূর্যবংশী কি আগুন হতে চেয়েছিল?
অনূর্ধ্ব উনিশের বিশ্বকাপ ফাইনালে তার ব্যাটিং তাণ্ডব দেখতে দেখতে এই প্রশ্নটাই মনে জাগছিল প্রতিনিয়ত। আগুন? নাকি আগ্নেয়গিরির তপ্ত লাভা? যার ত্র্যহস্পর্শে পুড়ে ছাড়খার হয়ে যায় প্রতিপক্ষ। যে ভয়ংকর সুন্দরের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়- ‘কী দেখিলাম, জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না।’
কে বলবে বৈভব বছর ১৪-র ‘বালক’! যে বয়সে চোখ স্বপ্ন দেখে, যেতে থাকে কল্পবিশ্বে, সেই বয়সে দৃষ্টান্তের জয়ধ্বজা উড়িয়ে চলেছে বাঁ-হাতি বিস্ময়। বিস্ময়ই বটে। হারারে-তে ভারতের যুবরা ফের একবার বিশ্বজয় করল, তা কার্যত বৈভবের একক মুনশিয়ানায়। ৮০ বলে ১৭৫! ১৫টি বাউন্ডারি, ১৫টি ওভার বাউন্ডারি। অর্থাৎ, মাত্র ৩০ বলে ১৫০ রান! বিধ্বংসী বললেও কম বলা হয়। গ্যালারিতে জটায়ু থাকলে নিশ্চয় বলতেন- ‘হারারেতে হারাকিরি’! বিপক্ষ ইংল্যান্ডকে নিয়ে কার্যত তাই করেছে বৈভব।
৮০ বলে ১৭৫! ১৫টি বাউন্ডারি, ১৫টি ওভার বাউন্ডারি। অর্থাৎ, মাত্র ৩০ বলে ১৫০ রান! বিধ্বংসী বললেও কম বলা হয়। গ্যালারিতে জটায়ু থাকলে নিশ্চয় বলতেন- ‘হারারেতে হারাকিরি’!
এমন ব্যাটিং অবশ্য প্রথম নয়, অতীতেও করেছে বৈভব। আইপিএল তার সাক্ষী। সাক্ষী ঘরোয়া ক্রিকেটে, যুব স্তরের আন্তর্জাতিক আসর। কিন্তু ফাইনালে এমন রণং দেহী ব্যাটিং, সেটাও এক ভারতীয়ের ব্যাট থেকে, খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর এখানেই নিশ্চিন্তি ভারতীয় ক্রিকেটের। ভবিষ্যতের ব্যাটন সুরক্ষিত। সুরক্ষিত এমন এক বিস্ময় প্রতিভার হাতে, যার ক্রিকেট কেরিয়ারের অঢেল সময় পড়ে আছে। প্রতিভার বিচ্ছুরণ যত ঘটবে, সেই আলোয় আলোকিত হবে ভারতীয় ক্রিকেট। শ্রেষ্ঠত্বের মসনদে টিম ইন্ডিয়া ততই সাফল্যের ইমারত গড়বে।
এই স্বপ্ন আবেশ শচীন তেণ্ডুলকরকে ঘিরেও ছিল। শিয়াল কোটের গ্যালারি তার আগমনের মঞ্চে তুলে ধরেছিল বিদ্রুপের ব্যানার- ‘দুধ পিইতা বাচ্চা…’ সেই ‘নাদান’দের ঢোঁক গিলতে বাধ্য করিয়েছিলেন মাস্টার ব্লাস্টার। ক্রিকেট দেখেছিল এক বিস্ময় বালকের উত্থান। আজ সেই বিস্ময়ের নামান্তর বৈভব। তার ইন্দ্রজালে মোহাবিষ্ট ২২ গজ থেকে রাজপথ, গলিপথ। মধ্যবিত্তের খিড়কি, দুয়ার। দুরন্ত হ্যান্ডআই কো-অর্ডিনেশন, সঙ্গে পাওয়ার হিট। যা বছর চোদ্দ বালকের কাছ থেকে দেখতে পাওয়া বিরল দৃশ্য। সেই মুহূর্তের জন্য বারবার করে চলেছে বৈভব। তার ১৭৫ রানের বিধ্বংসী ইনিংস মনে করিয়ে দিয়েছে ‘৮৩-র বিশ্বজয়ী অধিনায়ক কপিল দেবের মহাকাব্যিক ১৭৫ কে। স্থান কাল পাত্র - মাহাত্ম্য বিচারে ভিন্ন প্রেক্ষাপট হলেও কপিলের সেই ১৭৫-এর পারে অমর অক্ষয় হয়ে থাকবে বৈভবের ১৭৫-ও। বিশ্বকাপজয়ী ভারত অধিনায়কের সেই ইনিংসের কোনও ক্লিপিংস নেই। ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমী জনতার সেই আফসোসে প্রলেপ পড়তে পারে সূর্যবংশীর সংহার দেখে।
স্থান কাল পাত্র - মাহাত্ম্য বিচারে ভিন্ন প্রেক্ষাপট হলেও কপিলের সেই ১৭৫-এর পারে অমর অক্ষয় হয়ে থাকবে বৈভবের ১৭৫-ও। বিশ্বকাপজয়ী ভারত অধিনায়কের সেই ইনিংসের কোনও ক্লিপিংস নেই। ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমী জনতার সেই আফসোসে প্রলেপ পড়তে পারে সূর্যবংশীর সংহার দেখে।
বৈভব শুধু নিজেকেই প্রতিষ্ঠা দিল, তা নয়। ভারতীয় ক্রিকেট মানচিত্রে তুলে আনল বিহারকেও। এই বিহার নীতীশ, লালু পাসোয়ানদের চিরচেনা গোবলয় রাজনীতির আঁতুড়ঘর নয়, এ বিহার একান্তই ক্রিকেটের। নব স্বপ্নের, নতুন ভোরের। বৈভব প্রতিষ্ঠা দিয়ে গেলেন আরও এক অমোঘ সত্যকে। কালের যাত্রার ধ্বনি ক্রিকেটেও চিরায়ত সত্য। পালাবদলের সেই অমোঘ নিয়মে শচীন, দ্রাবিড়রা এসেছেন, চলেও গেছেন। ক্রিকেট সায়াহ্নে আরও দুই নক্ষত্র - রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি।
বেলাশেষে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেন, এবার। বিশ্বক্রিকেটে বৈভব সূর্যবংশী আবির্ভূত হয়েছেন!
