আর মাত্র ছ-সপ্তাহের অপেক্ষা। ধরায় পদার্পণ করবেন আদ্যাশক্তি মহামায়া। ঢাকের কাঠি, কাশফুল আর শিউলির গন্ধে মেতে উঠবে চারপাশ। তবে, আপামর ভক্তের প্রশ্ন, মা এবার কীসে আসছেন? ফিরবেন-ই বা কীসে? শাস্ত্রমতে, দুর্গতিনাশিনীর আগমন ও প্রস্থান কেবল তিথি উদযাপনের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে মানবজাতির আগামী এক বছরের শুভাশুভ ভাগ্যফল।
ছবি: সংগৃহীত
পঞ্জিকার হিসেব ও আগমন-নিগমন
শাস্ত্রবিধি মেনে সপ্তমী ও দশমীর বার দেখেই নির্ধারিত হয় দেবীর বাহন। চলতি বছরে পঞ্জিকার গণনায় বিশেষ যোগ তৈরি হয়েছে। শাস্ত্রীয় মতে, সপ্তমী শনিবার পড়ায় জগজ্জননীর ধরণীতে পদার্পণ ঘটছে ঘোটক অর্থাৎ ঘোড়ায় চেপে। আবার বিজয়া দশমী বুধবার হওয়ায় কৈলাসে দেবীর প্রত্যাবর্তন ঘটবে নৌকায়।
ঘোড়ায় আগমন কীসের প্রতীক?
ঘোড়াকে শাস্ত্রীয় পরিভাষায় বলা হয় 'তুরঙ্গম'। দেবীর ঘোটকে আগমন রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বার্তা দেয়। শাস্ত্রে বলা হয়েছে— "ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে"। এর অর্থ, ঘোটকে আরোহণ করলে ধরাতলে সামাজিক ও সামরিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। দেশ বা রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ক্ষমতার রদবদল কিংবা সামাজিক ভারসাম্যের বিনাশ ঘটার আশঙ্কা থাকে। এক কথায়, এই বাহন মর্ত্যে ছত্রভঙ্গ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
ছবি: সংগৃহীত
নৌকায় প্রস্থান কীসের প্রতীক?
দশমীতে দেবীর নৌকায় গমনের ফল আবার ভিন্ন। জ্যোতিষ ও শাস্ত্রের বচনে বলা হয়েছে— "শস্যবৃদ্ধিস্তথাজলম"। জলপথে দেবীর বিদায় মর্ত্যবাসীর জন্য মিশ্র ফল নিয়ে আসে। একদিকে যেমন ধরিত্রী সুজলা-সুফলা হয়ে ওঠে, শস্যের দারুণ ফলন হয় এবং ভক্তদের মনস্কামনা পূর্ণ হয়; অন্যদিকে তেমনই অতিবর্ষণ ও প্লাবনের ঝুঁকি থেকে যায়। প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বন্যার কারণে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়ার নয়।
ছবি: সংগৃহীত
অন্যান্য বাহনের শাস্ত্রীয় গুরুত্ব
গজ বা হাতি: শাস্ত্রজ্ঞদের মতে এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ বাহন। দেবীর গজে আগমন বা গমনে মর্ত্য ভরে ওঠে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও শস্যে ধনধান্য পুর্ণ হয় সংসার।
দোলা বা পালকি: দেবীর দোলায় যাতায়াত সবচেয়ে ভয়াবহ বার্তা বহন করে। বলা হয়— "দোলায়াং মকরং ভবেৎ"। এর ফলস্বরূপ মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিকম্প ও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
আশ্বিনের শিশিরভেজা ভোরে দেবীর আবাহনে যখন মর্ত্যলোক মুখরিত, তখন ঘোটক ও নৌকার এই বিপরীতমুখী যোগে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার আশঙ্কাই ফুটে উঠছে। তবুও মা উমার আগমনে অশান্ত মর্ত্য আবার শান্তিতে ভরে উঠুক— এই প্রার্থনাই প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ে।
