shono
Advertisement
Acharya Prafulla Chandra Ray

যিনি উদ্যোগপতি, তিনিই স্বদেশপ্রমী বিজ্ঞানসাধক, আচার্যর প্রফুল্লদর্শন

সাহিত্য ও ইতিহাসে ছিল প্রবল ঝোঁক। নানা বিদেশি ভাষায় পারঙ্গম। অথচ মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পক্ষপাতী ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।
Published By: Kishore GhoshPosted: 08:32 PM Aug 02, 2026Updated: 08:40 PM Aug 02, 2026

উদ্যোগপতি। বাঙালিকে ব্যবসা করতে সদা উৎসাহিত করেছেন। সাহিত্য ও ইতিহাসে ছিল প্রবল ঝোঁক। নানা বিদেশি ভাষায় পারঙ্গম। অথচ মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পক্ষপাতী। বন্যাত্রাণে জমা পড়া ‘পাবলিক ফান্ড’ যাতে নয়ছয় না হয়, সেদিকেও ছিলেন খুঁতখুঁতে। তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। জন্মদিনে বিশেষ নিবন্ধ। লিখছেন সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

Advertisement

বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য। সবদিকেই ‘আচার্য’ প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ছিল অবাধ বিচরণ। বিজ্ঞানী হলেও ব্যবসার প্রতি তাঁর প্রবল ঝোঁক কারও অজানা নয়। ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল্‌স অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল্‌স লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠার (১৯০১) পাশাপাশি বেশ কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে। বাঙালিকে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করার কথা বারবার বলেছেন। আবার তিনি নিজেই বলেছিলেন– ‘আমি ভুল করে বিজ্ঞানী হয়েছি– মূলত সাহিত্য ইতিহাসের ছাত্র।’

তাঁর এমন আত্মোপলব্ধির নেপথ্যে শৈশব, ছাত্রজীবন, শিক্ষকজীবন এবং বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ডের সমীকরণ রয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের তাচ্ছিল্য, আর দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের অসহযোগিতা উপেক্ষা করেই ব্যবসায় নেমেছিলেন। ১৯০৯ সালে নিজ জন্মভূমিতে কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেন। ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস’-এর পাশাপাশি আচার্যর সহযোগিতা লাভ করেছিল আরও বেশ কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান– যেমন: বেঙ্গল পটারিজ, বেঙ্গল এনামেল, ক্যালকাটা সোপ ওয়ার্কস, ন্যাশনাল ট্যানারিজ মার্কেনন্টাইল মেরিন ইত্যাদি।

‘ব্যবসা করা’ মানে মুনাফা অর্জন করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করা– এই দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন না আচার্য। জাতির মনে ব্যবসাপ্রীতি ঢুকিয়ে তিনি স্বনির্ভর করতে চেয়েছিলেন বাঙালিকে। বিলিতি ওষুধের রমরমা বাজারে দেশি ওষুধের প্রচার চালিয়েছিলেন। বন্ধু ডাক্তার অমূল্যচরণ বসু থেকে শিষ্য রাজশেখর বসুকে নিয়ে যে-প্রতিষ্ঠানকে ‘বড়’ করে তুলেছিলেন, কখনওই তা বাঙালিকে অর্থলোলুপ করার জন্য নয়।

প্রফুল্লচন্দ্র গিলক্রাইস্ট বৃত্তি পেয়েছিলেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষার খরচ নিজেই চালাতে তা সহায়ক হয়। ওই বৃত্তি-পরীক্ষার প্রস্তুতিপর্বে ইংরেজি সাহিত্য ছাড়া বিশেষভাবে লাতিন, ফ্রেঞ্চ এবং জার্মান ভাষার অনুশীলন করেন।

বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময় অনেকেই আবেগের বশে বা হঠাৎ শখ করে ব্যবসায় নামেন। যথারীতি সেসব ব্যবসার গণেশ উল্টেও ছিল। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র অবশ্যই সে-দলে ছিলেন না। প্রতিযোগিতার নিয়মকানুন বুঝে এবং ‘বাজার’ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা করে ব্যবসার জগতে প্রবেশ করেছিলেন। ব্যবসায় টিকে থাকতে খরচ কমানোর প্রয়োজনীয়তা তিনি শুধু উপলব্ধিই করেননি, তাঁর অনাড়ম্বর জীবনযাত্রাও সে বার্তা বহন করে। বাঙালিকে স্বনির্ভর হওয়ার জন্য তিনি ব্যবসা করতে বলেছিলেন ঠিকই, তবে নিজে ব্যবসা করলেও সমান্তরালভাবে শিক্ষকতা এবং বিজ্ঞানচর্চাও করে গিয়েছিলেন।

তাঁর আবিষ্কৃত ‘মারকিউরাস নাইট্রাইট’ বিশ্বব্যাপী আলোড়নের সৃষ্টি করে। ১২টি যৌগিক লবণ এবং ৫টি থায়োএস্টার আবিষ্কার করেন। আবার, সাহিত্যের প্রতি প্রফুল্লচন্দ্রর অনুরাগ বুঝতে হলে তঁার বাল্যকাল ও পারিবারিক পরিবেশের দিকটি প্রাসঙ্গিকভাবে চলে আসে। বাবা হরিশচন্দ্রর পাঠাগারটিই ছিল প্রফুল্লচন্দ্রর সাহিত্যচর্চার সূতিকাগৃহ। সেই পাঠাগারে তদানীন্তন বাংলার সমস্ত অগ্রণী পত্র-পত্রিকার সমাহার ছিল। যা তিনি নিয়মিত পড়তেন এবং অধীত বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিয়ে লিপিবদ্ধ করতেন।

তখনই সমসাময়িক সাহিত্যের ধারার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে তাঁর। বাংলা ও ইংরেজিতে রচিত কাব্যগ্রন্থগুলির রসাস্বাদন ও পর্যালোচনা আচার্যর সাহিত্যচিন্তার স্তরকে তীক্ষ্ণ করেছিল। প্রফুল্লচন্দ্র গিলক্রাইস্ট বৃত্তি পেয়েছিলেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষার খরচ নিজেই চালাতে তা সহায়ক হয়। ওই বৃত্তি-পরীক্ষার প্রস্তুতিপর্বে ইংরেজি সাহিত্য ছাড়া বিশেষভাবে লাতিন, ফ্রেঞ্চ এবং জার্মান ভাষার অনুশীলন করেন। নতুন ভাষাশিক্ষার মাধ্যমে নতুন জ্ঞানের উন্মেষ হয়– এই পরিশীলিত ভাবনা ছাত্রজীবনেই তাঁর কঠোর সাধনার মধ্যে স্থান করে নেয়। এডিনবার্গে বিজ্ঞানচর্চা ছাড়াও প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে ওই ৩টি ভাষায় অনেক বই পড়তে হয়েছিল।

প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেশ কিছু বই প্রথমে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়, এবং সেগুলি সাধারণ পাঠক সমাজের কাছে আরও বেশি করে যাতে পৌঁছতে পারে সেজন্য পরবর্তী পর্যায়ে বাংলা ভাষায় প্রকাশ করা হয়।

বিষয়বস্তুর গভীরে গিয়ে জানার চেষ্টা করা প্রফুল্লচন্দ্রর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। রসায়ন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই পুরাতত্ত্ব অনুসন্ধানই ‘History of Hindu Chemistry’ লেখার প্রেরণা জুগিয়েছিল। বিজ্ঞানের ইতিহাস রচনায় প্রফুল্লচন্দ্র ছিলেন এ-দেশের পথিকৃৎ। আচার্যর লেখা পুস্তক-পুস্তিকাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘সরল প্রাণীবিদ্যা’, ‘বাঙালীর মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহার’, ‘অন্ন সমস্যা’, ‘India before and after the Mutiny’, ‘জাতীয় মুক্তির পথে অন্তরায়’, ‘জাতি গঠনে বাধা’, ‘History of Hindu Chemistry’, তৎসহ আত্মচরিত ‘Life of a Bengali Chemist’, ‘খাদ্যবিজ্ঞান’, ‘চায়ের প্রচার ও দেশের সর্বনাশ’, ‘অন্ন সমস্যায় বাঙালির পরাজয় ও তাহার প্রতিকার’, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমা ও শিল্প ও ব্যবসায়ে কৃতিত্ব লাভ’ ইত্যাদি। এছাড়া সমসাময়িক পত্রিকাগুলিতে প্রকাশিত হয় বহু প্রবন্ধ।

প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেশ কিছু বই প্রথমে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়, এবং সেগুলি সাধারণ পাঠক সমাজের কাছে আরও বেশি করে যাতে পৌঁছতে পারে সেজন্য পরবর্তী পর্যায়ে বাংলা ভাষায় প্রকাশ করা হয়। মাতৃভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞানশিক্ষার মুখ্য প্রবক্তাদের মধ্যে ‘আচার্য’ রায় ছিলেন অন্যতম। সহজ, সরল ভাষায় ‘প্রাণীবিদ্যা’ প্রণয়ন করে মাতৃভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞানচর্চায় ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহিত করেন। আবার তাঁর লেখা পুস্তক-পুস্তিকায় তদানীন্তন বাঙালির ক্রম অধঃপতনের যে সকরুণ চিত্র এবং তার প্রতিকারের গতিপথ যেভাবে উপস্থাপিত করেছিলেন– তা বাঙালি সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। পাশাপাশি তঁার লেখনীতে উঠে এসেছিল– বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচি, শিক্ষার ব্যর্থতা, বেকারত্ব চাকুরীজীবিদের দুর্দশা, হতাশা, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি অনীহা, বাবুগিরি ও বিলাসিতার প্রতি বাঙালির মোহ-সহ বঙ্গজীবনের নানা দিক। সমস্যাসংকুল ভারতবাসীকে কল্পনার সৌধ থেকে বাস্তব পটভূমিতে টেনে আনতে এসব রচনার মূল্য অনেক।

মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার কথা প্রফুল্লচন্দ্র আজীবন উল্লেখ করেছেন তাঁর বক্তৃতা ও লেখায়। সাহিত্যচর্চার একনিষ্ঠতার প্রতি সম্মান জানিয়ে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’ তাঁকে পরপর ৩ বার (১৯৩১-’৩৪) সভাপতি নির্বাচিত করে। ‘প্রবাসী’ বঙ্গসাহিত্য সম্মেলেনও বেশ কয়েকবার সভাপতি হতে দেখা গিয়েছে। সামাজিক নানা কাজেও প্রফুল্লচন্দ্রর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯২২ সালে, উত্তরবঙ্গের বন্যা হয়। বন্যাপীড়িতদের ত্রাণের জন্য সমিতি গঠিত হয়েছিল, যার সভাপতি ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং সম্পাদক হন সুভাষচন্দ্র বসু।

একদিন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্র চিন্মোহন সেহানবীশ বন্যাত্রাণের জন্য পরিচিতদের কাছ থেকে সংগৃহীত ৩৫ টাকা, এবং কিছু পুরনো জামাকাপড় নিয়ে হাজির হন বিজ্ঞান কলেজে। আচার্যর কাছে। তা পেয়ে প্রফুল্লচন্দ্র ছাত্র তথা ভলেন্টিয়ারদের নির্দেশ দেন, টাকা এবং জামাকাপড় নিয়ে রসিদ লিখে দিতে। তখন চিন্মোহন জানিয়েছিলেন, ৩৫ টাকার রসিদ দিলেই চলবে। তা শুনে ক্ষুব্ধ হন আচার্য এবং চিন্মোহনকে বোঝান, এ-টাকা তো মানুষের থেকে ৪ আনা ৮ আনা করে সংগৃহীত, অর্থাৎ এটি ‘পাবলিক ফান্ড’, তাই প্রত্যেকের নামে-নামে রসিদ কাটা জরুরি। তখন চিন্মোহন আধ ঘণ্টা ধরে কে, কত পয়সা দিয়েছেন– সেই তালিকা করে দেন ও রসিদ নেন। ‘পাবলিক ফান্ড’ নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় শিক্ষা! যদিও প্রফুল্লচন্দ্রর সেই ‘শিক্ষা’ বাঙালি নেয়নি বলেই এখন জনগণের টাকা নয়ছয় করার ঘটনা এত ঘটছে, আর অর্থ-সংক্রান্ত অস্বচ্ছতা বঙ্গজীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক সাংবাদিক
sidmukh12@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement