সৎ উপার্জনে সংসার টিকিয়ে রাখাই যেখানে ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেখানে কিছু মানুষের হাতে অঢেল টাকা। এ কেমন বৈষম্য?
১৯২৬ সালে, অর্থাৎ ঠিক ১০০ বছর আগে, রবীন্দ্রনাথ আভাস পেয়েছিলেন আমাদের এই রাজ্য, বিশেষ করে এই নগর, কোথায় নেমে কী রূপে দাঁড়াবে। তিনি ওই বছরেই একটি ‘পালা’ প্রকাশ করে আমাদের রাজ্যের সেই আসন্ন রূপটি জানিয়েও যান: এখানকার শ্রমিকদল মাটির তলা থেকে সোনা তোলার কাজে নিযুক্ত। আমার পালায় একটি রাজা আছে। আধুনিক যুগে তার একটার বেশি মুণ্ড ও দুটোর বেশি হাত দিতে সাহস হল না। এই নগরের নাম যক্ষপুরী। সেখানে যক্ষের ধন মাটির নিচে পোঁতা আছে। এখানকার রাজা (কেউ কেউ রানিও পড়তে পারেন, তবে ব্র্যাকেটের এই বক্তব্য রবীন্দ্রনাথের নয়) পাতালে সুড়ঙ্গ খোদাই করে সেই ধন-হরণে নিযুক্ত।
রবীন্দ্রনাথ জানেন এই ধন সৎ পথের উপার্জন নয়। অনেক পাপ, অন্যায়, দুষ্কৃতির পথে উপার্জিত এই অপার ঐশ্বর্য। লিখলেন মাত্র কয়েকটি শব্দ, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বৈকুণ্ঠে, যক্ষের ভাণ্ডার পাতালে। অর্থাৎ এই ঐশ্বর্য অন্ধকারে লুকোনো। প্রকাশের গৌরব তার প্রাপ্য নয়। এবং এই অবিশ্বাস্য ও অন্যায় গুপ্ত ধনরত্নর প্রধান প্রাপক যে, সে থাকে রহস্যময় আড়ালে। কিছুতেই পৌঁছনো যায় না তার কাছে। রবীন্দ্রনাথের এই ‘পালা’ কোন শিক্ষিত বাঙালি পড়েনি? নাম– ‘রক্তকরবী’। এমন এক পরিবেশ ও পরিবহে সাধারণ সৎ খেটে-খাওয়া মানুষের লড়াই, তাদের অসহায় অনিশ্চয়তা, প্রাত্যহিক বেদনা এবং অস্তিত্বের সংকট রবীন্দ্রনাথ ফুটিয়ে তুলেছেন অন্ধকার সুড়ঙ্গে শ্রমিকদের কষ্টে, বিশু পাগলের গানে, নন্দিনী নামের এক তরুণীর বিদ্রোহে।
এই রাজ্যে অধিকাংশ মানুষের আয়ের থেকে ব্যয় বেশি। সাধারণ সংসারী কুলিয়ে উঠতে পারছে না। নুন আনতে পান্তা ফুরচ্ছে।
এই রাজ্যের মানুষ অধিকাংশই কষ্টকর এবং সৎ শ্রমের উপার্জনে কোনও রকমে খেয়েপরে বেঁচে আছে। এবং তাদের সততা এবং স্বাভাবিক ভালত্বকে তারা জিইয়ে রেখেছে চারধারে ক্রমাগত প্রকাশিত হতে থাকা এই অপরিসীম অসৎ ধনদৌলত, কালো টাকা, ঐশ্বর্যর বিপর্যয়ের মধ্যেও! কিন্তু এই শোচনীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার শেষ পরিণাম কোথায় নিয়ে যাবে আমাদের, ভাবলে গা শিউরে ওঠে। প্রতিদিন আরও জটিল হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বের সংকট।
এই রাজ্যে অধিকাংশ মানুষের আয়ের থেকে ব্যয় বেশি। সাধারণ সংসারী কুলিয়ে উঠতে পারছে না। নুন আনতে পান্তা ফুরচ্ছে। অথচ কিছু মানুষ, অনির্ণেয় প্রেরণায় অথবা প্রভাবে, প্রায় রাতারাতি হয়ে উঠছে, আয়ের কোনও প্রকাশযোগ্য উৎস ছাড়াই, অকল্পনীয় ধনী ও প্রভাবশালী! এবং এই অনস্বীকার্য বাস্তবকে কিছুতেই আমরা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছি না। সাধারণ মানুষ কোথায় পালিয়ে বাঁচবে? কিংবা কোথায় পাবে মুখ লুকোনোর জায়গা?
রবীন্দ্রনাথ যে যক্ষপুরীর ছবি এঁকেছিলেন, তা নিছক সাহিত্যিক কল্পনা ছিল না– ছিল ক্ষমতা, সম্পদ ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ।
রবীন্দ্রনাথ যে যক্ষপুরীর ছবি এঁকেছিলেন, তা নিছক সাহিত্যিক কল্পনা ছিল না– ছিল ক্ষমতা, সম্পদ ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ। সাম্প্রতিক সময়ে হতাশার মধ্যেও ভরসার জায়গা একটাই– এখনও এই রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ সৎ পরিশ্রমে বিশ্বাস করে, এখনও তারা অন্যায়কে অন্যায় বলেই মনে করে। সেই নৈতিক শক্তিই বাংলার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
