একটি মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকে আর-একটি মানুষ। কখন যে সে বেরিয়ে আসবে, কেউ জানে না। বেদবর্ধন সাহনি যেমন একটি ট্রিপে গিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করল, তার মধ্যে লুকিয়ে আছে একজন 'ডন'- যে-ডনকে কত না দেশের পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে! প্রথমে অমিতাভ বচ্চন এবং পরে শাহরুখ খানের কল্যাণে যে-ডনের সঙ্গে আমরা সুপরিচিত। বেদবর্ধন যখন ডনের ভূমিকায়, সেই সময় 'মোনা ডার্লিং' হয়ে আত্মপ্রকাশ করে 'মহেশ্বরী'। সেও কি জানত না তার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অন্য একজন মানুষ! এই দু'জনের সখ্য হয়।
অল্প অল্প ভালবাসাও কি? মহেশ্বরী মুগ্ধ হয় এটি আবিষ্কার করে যে, তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অন্য একজনকে সে বের করে আনল এমন গল্পের আবহে। ডন, পুলিশ, রোমাঞ্চ ও 'কাল্ট' হয়ে যাওয়া সিনেমার অংশ তাহলে সেও। বেদবর্ধনের কাছে অবশ্য এমন 'খেলা' নতুন নয়। সে গল্পের পোকা। গল্পের দুনিয়া, সেখানকার বানানো জগৎ, কল্পনা ও না-ঘটা বাস্তবের মিশেল তাকে উজ্জীবিত করে বরাবর। কিন্তু সমস্যা হল, চলিত ধারার চলন।
বেদবর্ধন সাহনিকে আমরা পেয়েছিলাম 'তামাশা' (২০১৫) সিনেমায়। পরিচালক ছিলেন ইমতিয়াজ আলি।
বেদের বাবা তাকে 'ইঞ্জিনিয়র' বানাতে চায়। বেদের মাথায় পাঠ্যপুস্তকের লেখাপড়া মাথায় ঢোকে না। তার ইচ্ছা করে এসব ছেড়েছুড়ে দিয়ে পালিয়ে যেতে। পালানোর উপায় নেই যে! প্রথার চাকরি, প্রথার জীবন, প্রথামাফিক হাসি ও সামাজিকতার প্রদর্শন তার পোষায় না। সে গল্পবলিয়ে হতে চায়। বা, সত্যিই যে কী চায়, নিজেই তা জানে না। যে-মহেশ্বরী ছুটি কাটাতে গিয়ে বেদের আশ্চর্য ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের টানে মজেছিল, সেও বেদের এই মাপা হাসি ও নিক্তিমাপা সৌজন্যে বিরক্ত হয়। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত বেদ বুঝে উঠতে পারে না কী করবে। ছোটবেলার সেই পুরনো গল্পের দুনিয়া ফিরে যেতে ইচ্ছা করে তার। কিন্তু সেখানে ফেরার রাস্তা জানা নেই। সবচেয়ে বড় কথা, সেসব গল্পের তো সে শ্রোতা মাত্র। কথক নয়। এসব গল্প তার কল্পনার ফসল নয়।
এই বেদবর্ধন সাহনিকে আমরা পেয়েছিলাম 'তামাশা' (২০১৫) সিনেমায়। পরিচালক ছিলেন ইমতিয়াজ আলি। চেনা ছকের বিন্যাস থেকে বেরিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার গল্প শুনিয়েছিলেন তিনি বেদবর্ধনের মাধ্যমে। পড়ার বইয়ের বাইরের ভুবনকে খননের কথা বলেছিলেন। সম্প্রতি স্কুলে স্কুলে একই মডেলে 'রিডিং কর্নার' তৈরির কথা ভেবেছে স্কুলশিক্ষা দপ্তর। যা 'জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০'-র অনুসারী। শিশুদের কল্পনা ও কৌতূহল, সৃজনভাবনা ও চিন্তাস্তরের উন্নয়ন, তৎসহ ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পড়ার বইয়ের পাশাপাশি বিশ্বকোষ, শিল্পকলা, সাহিত্য, অভিধান ও জীবনী পড়ানোর দিকে জোর দিতেই এই 'রিডিং কর্নার'।
মনে পড়ে যেতে পারে, সত্যজিৎ রায়ের 'অপরাজিত'। যেখানে অপুর গ্রামের স্কুলের প্রধানশিক্ষক তার হাতে নানা বিষয়ের বই তুলে দিয়ে বলছেন, আগ্রহ ও কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করার কথা। অর্থাৎ 'রিডিং কর্নার'-এর অনুভব এ রাজ্যে ছিলই। নতুন নয় তা।
তবে পাঠ্যসূচিতে পরিকল্পনার সঙ্গে তা আনার জন্য সরকারের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।
