shono
Advertisement
Skeleton

মৃত দিদির কঙ্কাল নিয়ে ব্যাঙ্কে নিরক্ষর ভাই! ইতিহাসের এ এক বিরাট পরিহাস

প্রচুর কাজের গেরোয় আচ্ছন্ন ব্যাঙ্ক বা সমতুল প্রতিষ্ঠান বোঝে না প্রান্তিক মানুষের এই সংকট।
Published By: Biswadip DeyPosted: 12:42 PM Apr 30, 2026Updated: 12:42 PM Apr 30, 2026

মৃত দিদির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের টাকা পেতে কবর খুঁড়ে দিদির কঙ্কাল তুলে ব্যাঙ্কে নিরক্ষর ভাই। এই ঐতিহাসিক ঠাট্টার কী জবাব দেবে সভ্যতা! নিরক্ষর মানুষের কাছে কাগুজে জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটিয়ে কী লাভ?

Advertisement

‘আরণ্যক’ উপন্যাসে ‘বিরাট’ এক ঐতিহাসিক ঠাট্টার কথা শুনিয়েছিলেন লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সত্যচরণ, এস্টেটের হয়ে অর্থসংগ্রহে বেরিয়ে জানতে পেরেছিল যে, এই তল্লাটের আদিম জনজাতির সম্রাট জীবিত। মুরগি, ফলমূল এসব ‘ভেট’ নিয়ে গিয়েছিল তার সঙ্গে দেখা করতে। দোবরু পান্না বীরবর্দি– সেই সম্রাটের নাম। কিন্তু দেখা হওয়ার পরে সত্যচরণ অবাক হয়। রাজা, বা অবিসংবাদী সম্রাট বলে যাকে ভেবেছিল সে, আসলে একজন বৃদ্ধ সঁাওতাল। দরিদ্র, জরাভারে দীর্ণ। কিন্তু জাগতিক সম্পদে রিক্ত হলেও সেই বৃদ্ধ সঁাওতাল নিজের জাত্যভিমান, কুলাহংকার হারায়নি।

কথায়-কথায় সে জানিয়ে দেয় সত্যচরণকে– একদা এই পুরো এলাকা তাদের শাসনে চলত। ক্রমে সত্যচরণের সঙ্গে আলাপ হয় বীরবর্দির পরিবারের অন্য সদস্যদের। আলাপ হয়, একটি স্বাস্থ্যোজ্জ্বল কিশোরীর সঙ্গে, যে কিনা রাজকন্যা, তার নাম ভানুমতী। ভেট পেয়ে রাজা দোবরু খুশি হয়। এবং তার পুর্বপুরুষদের সমাধিক্ষেত্র দেখতে যাওয়ার আহ্বান জানায়।

কৌতূহল নিয়ে সত্যচরণ সেখানে যায়, কিন্তু হতাশ হয়ে প্রত্যক্ষ করে, কবরস্থান রূপে যা তাকে দেখানো হচ্ছে– সেটি একটি প্রাকৃতিক গুহার সন্নিকটে থাকা বড় চত্বর, সেখানে নানা মাপের পাথর পেঁাতা রয়েছে এক-একটি সমাধিকে চিহ্নিত করতে। আতিশয্য নেই, রোশনাই নেই, বিজ্ঞাপন বা প্রচার নেই, নেই রাজপরিবারসুলভ ঠাটবাট। অথচ এই নিয়েই রাজা দোবরু পান্না তৃপ্ত।

ওড়িশায় জনজাতি সম্প্রদায়ের একজন ব্যক্তি জিতু মুন্ডা বারবার ব্যাঙ্কের কাছে আবেদন করেও দিদির অ্যাকাউন্টের প্রাপ্য টাকা না পেয়ে, শেষে কবর খুঁড়ে, নিজের দিদির কঙ্কাল তুলে, ব্যাঙ্কে হাজির হন।

কিন্তু সত্যচরণ যখন অন্যভাবে চিন্তা করতে শুরু করে, বুঝতে পারে, কোথায় ঐতিহাসিক ভুল ও চরম ঠাট্টা বিভীষিকার মতো জেগে আছে। সভ্যতার সংজ্ঞা, রাজাভিজাত্য, উচ্চ-নীচ বোধের যে-শিক্ষা ভারতীয়দের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে, তা পাশ্চাত্যের মানদণ্ডে তৈরি। তা ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার পরিণতি। সেই আলোকে সত্যচরণও ভাবছে– রাজা দোবরু পান্না আসলে হৃতগৌরব বৃদ্ধ সঁাওতাল। যুদ্ধে এই জনজাতি পরাজিত হয়েছিল। সম্ভ্রম হারিয়েছিল। আর, ইতিহাস তো লেখা হয় বিজয়ীর দৃষ্টিকোণ থেকে, পরাভূত যে হয়েছে, তার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। ফলে সভ্যতা ও শিক্ষার যে-ইতিহাস আর্যগর্বী জনসমাজ লিখেছে, সেখানে তা-ই মান্য, যা বিজয়ীর মনে ধরেছে। পরাজিতের সমাজ ও ব্যবস্থা মান্যতা পায়নি।

সম্প্রতি, ওড়িশায় জনজাতি সম্প্রদায়ের একজন ব্যক্তি জিতু মুন্ডা বারবার ব্যাঙ্কের কাছে আবেদন করেও দিদির অ্যাকাউন্টের প্রাপ্য টাকা না পেয়ে, শেষে কবর খুঁড়ে, নিজের দিদির কঙ্কাল তুলে, ব্যাঙ্কে হাজির হন। জিতু নিরক্ষর। আইনি ওয়ারিশ ব্যবস্থা সম্পর্কে তঁার সম্যক জ্ঞান নেই। এদিকে, দিদির অ্যাকাউন্টের টাকা তুলতে হলে অ্যাকাউন্ট হোল্ডারকে স্বয়ং যেতে হবে। দিদি ‘মৃত’ বলে উপায়হীন হয়ে দিদির দেহাবশেষ নিয়ে জিতু ব্যাঙ্কে চলে যান। এও কি ইতিহাসের বিরাট পরিহাস নয়? নিরক্ষর মানুষের কাছে কাগুজে জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটিয়ে কী লাভ? তঁার সমস্যা সমাধান করতে হলে, পশ্চিমি ধঁাচায় প্রাপ্ত পরিচালন ব্যবস্থার বাইরে বেরতে হবে। প্রচুর কাজের গেরোয় আচ্ছন্ন ব্যাঙ্ক বা সমতুল প্রতিষ্ঠান তা বোঝে?

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement
toolbarHome ই পেপার toolbarup মহানগর toolbarvideo শোনো toolbarshorts রোববার