shono
Advertisement
Raghu Rai

'ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ ভারত', রঘু রাইয়ের ক্যামেরায় 'চিত্রার্পিত' ভাষ্য

দীর্ঘদেহী আলোকচিত্রী, কাঁধে ক্যামেরা, বহুক্ষেত্রে একাধিক ক্যামেরা, একের-পর-এক ছবি তুলে চলেছেন। কীসের ছবি? সেই তালিকা দীর্ঘ, তবে ছোট করে তো উপরের অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে। ‘ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ ভারত’। এই যে আশ্চর্য দো-তারাটি আসমুদ্রহিমাচল ধ্বনিত– ‘ইন্ডিয়া’ এবং ‘ভারত’– তাদের ঠিক মাঝখানে একটি হাইফেন।
Published By: Kishore GhoshPosted: 03:46 PM Apr 30, 2026Updated: 05:02 PM Apr 30, 2026

দীর্ঘদেহী আলোকচিত্রী, কাঁধে ক্যামেরা, বহুক্ষেত্রে একাধিক ক্যামেরা, একের-পর-এক ছবি তুলে চলেছেন। কীসের ছবি? ‘ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ ভারত’। এই কথাটায় ‘ইন্ডিয়া’ এবং ‘ভারত’-এর মাঝখানে একটি অলক্ষ্য হাইফেন বিদ্যমান। রঘু রাই (Raghu Rai) মধ্যবর্তী ওই হাইফেনের উপরেই ক্যামেরা হাতে দণ্ডায়মান। লিখছেন শোভন তরফদার

Advertisement

‘চিত্রার্পিত’ বিশেষণটি, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ জানাচ্ছে, ‘রঘুবংশ’ মহাকাব্যে হাজির। কালিদাস-বিরচিত এই শব্দের অর্থটিও চমৎকার– ‘চিত্রলিখিত, চিত্রস্থ’। সংক্ষিপ্ত এই নিবন্ধের বিনীত প্রস্তাবনা, এই ‘চিত্রার্পিত’ শব্দেই ধরা ফেলা যায় রঘুনাথ রায়চৌধুরী ওরফে ‘রঘু রাই’-এর অনন্য আঙুলছাপ। চিত্র-সাংবাদিক হিসাবে যেভাবে তিনি ‘ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ ভারত’-কে চিত্রে অর্পণ করেছিলেন, সমকাল তথা উত্তরকাল তার সামনে অভিভূত এবং এখন তাঁর প্রয়াণের পরে নতজানু। এই কথায় অতিশায়ী ভাবোচ্ছ্বাস নেই, সত্যের স্বীকৃতি আছে মাত্র।

দীর্ঘদেহী আলোকচিত্রী, কাঁধে ক্যামেরা, বহুক্ষেত্রে একাধিক ক্যামেরা, একের-পর-এক ছবি তুলে চলেছেন। কীসের ছবি? সেই তালিকা দীর্ঘ, তবে ছোট করে তো উপরের অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে। ‘ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ ভারত’। এই যে আশ্চর্য দো-তারাটি আসমুদ্রহিমাচল ধ্বনিত– ‘ইন্ডিয়া’ এবং ‘ভারত’– তাদের ঠিক মাঝখানে একটি হাইফেন। সচরাচর দেখা যায় না, ফলে সেটি যে বিদ্যমান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাও খেয়াল থাকে না। অথচ, রঘু রাই আজীবন সেই মধ্যবর্তী হাইফেনটির উপরেই ক্যামেরা হাতে দণ্ডায়মান।

এহ বাহ্য। রঘু রাই জানতেন যে, ‘ইন্ডিয়া’ এবং ‘ভারত’-এর মধ্যে সেই আপাত-অদৃশ্য হাইফেনটির অর্থ একাধিক। এক) ‘ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ ভারত’। দুই) ‘ইন্ডিয়া দ্যাট ইজ নট ভারত’। তিন) আগের দু’টির মিশ্রণে ধূসর কোনও অঞ্চল। অর্থাৎ, কোথাও সমীকরণ, কোথাও অসমীকরণ, কোথাও আবার তাদের যোগাযোগে অনচ্ছ এক দশা। ১৯৭০ সালে পালাম বিমানবন্দরের যে-ছবিটি তুলেছিলেন তিনি, এই সূত্রে সেটি উল্লেখ্য। চৌপায়তে বসে হুঁকো
হাতে দুই গ্রামবাসীর আড্ডা, তারই একটি পায়াতে দড়ি-বাঁধা এক বাছুর, অদূরে লাঙল-বলদ সহকারে জমি চষা চলছে, আর ঠিক সেই জমিনের লাগোয়া বিমানবন্দরের আকাশে (তৎকালীন) ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের একটি বিমান, কয়েক মুহূর্ত পরেই যা রানওয়েতে অবতরণ করবে, ফলে বিশালভাবে পরিদৃশ্যমান সেই আকাশপাখির আকৃতি।

এভাবে স্থান ও কালের বিবিধ বিন্দুকে একটি ফ্রেমের মধ্যে বুনে দেয় আশ্চর্য এই ছবি। আঁচ মেলে, একটি দেশের মধ্যেই ‘ইন্ডিয়া’ আছে, ‘ভারত’-ও আছে, আরও আছে এই দুয়ের মধ্যে নানাবিধ আবছায়া তল্লাট, সাধারণত যাদের খোঁজই রাখা হয় না। চিত্র-সাংবাদিক রূপে রঘু রাই বরাবর বিশ্বাস করেছেন, এই খোঁজটুকু রাখা জরুরি। ছবির মাধ্যমে তিনি যেন বলছেন, হেঁটে দেখতে শিখুন! স্থান এবং কালের ভিতরে যে অজস্র খাঁজ-ভাঁজ, তাদের অস্বীকার করলে যে চিত্র-সাংবাদিকতার মৌলিক একটি শর্তই লঙ্ঘিত হয়, রঘু রাই তা বারংবার দেখাতে চেয়েছেন। ফলে, একমাত্রিক নিগড়ে তিনি বাঁধা পড়তে নারাজ। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বহু-বাচনিক, যা তাঁর ছবিকে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে দেয়।

এই পর্যন্ত এসে খটকা লাগতে পারে, কেন ‘মোমেন্টস’ শব্দটি ব্যবহার করলেন তিনি? সাদা চোখে দেখলে মনে হতেই পারে, যাঁর ছবি তোলা হচ্ছে, সেই ব্যক্তির একটিমাত্র মুহূর্তই তো আলোকচিত্রে ফ্রেমবন্দি, তাহলে আর বহুবচনে ‘মোমেন্টস’ বলার অর্থ কী?

প্রয়াণের পরে একাধিকবার শোনা গেল, রঘু রাইয়ের ক্যামেরা ভারতাত্মাকে ধারণ করেছে। অতি সত্যকথা। শ্রুতিশোভনও বটে। প্রশ্ন হল, তিনি দশকের-পর-দশক সেই ভারতাত্মার সন্ধান যেভাবে করলেন, সেই ধাঁচ ও ধরনগুলিকে তলিয়ে দেখা হল কি? শুধুমাত্র ছবিগুলির দিকে তাকিয়ে অকুণ্ঠ বাহবা দিলে কিন্তু তাঁর স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান জ্ঞাপন হবে না। বড়জোর তাতে পর্যটকের দ্রুতগামী নজর থেকে স্বদেশের দিকে চোখ ফেলা যাবে মাত্র, রঘু রাইয়ের যে ক্যামেরা-চোখ তাঁকে ভারত-পথিক করে তুলেছিল, সেই দর্শন-ভঙ্গিমাটির কোনও খোঁজ মিলবে না।

এই ক্যামেরা-চোখের সূত্রেই উল্লেখ্য, আলোকচিত্রী রোহিত চাওলাকে একবার তিনি বলেছিলেন, ‘I am partial to the wide angle, because even when I photograph a person,
I want the atmosphere, the surrounding, the simultaneity of moments.’– কথাটি তলিয়ে দেখার মতো। ‘ওয়াইড অ্যাঙ্গল লেন্‌স’-এর প্রতি নিজস্ব পক্ষপাতের যুক্তি হিসাবে রঘু রাইয়ের বক্তব্য, যখন নির্দিষ্ট কোনও একটি ব্যক্তির ছবি তোলা হচ্ছে, তখনও কিন্তু ছবিটি নিছকই সেই ব্যক্তির আলোকচিত্র নয়, বরং সেই পরিসরে ধরা পড়ছে ওই মানুষটির পরিপার্শ্ব এবং বিভিন্ন মুহূর্তের সন্নিপাত।

এই পর্যন্ত এসে খটকা লাগতে পারে, কেন ‘মোমেন্টস’ শব্দটি ব্যবহার করলেন তিনি? সাদা চোখে দেখলে মনে হতেই পারে, যাঁর ছবি তোলা হচ্ছে, সেই ব্যক্তির একটিমাত্র মুহূর্তই তো আলোকচিত্রে ফ্রেমবন্দি, তাহলে আর বহুবচনে ‘মোমেন্টস’ বলার অর্থ কী? বস্তুত, এই বহুবচনেই নিহিত রঘু রাইয়ের অনন্যতার ঠিকানা। তিনি ‘মোমেন্টস’ বলছেন, কারণ, ছবির মধ্যে সত্যিই তো বিভিন্ন মুহূর্তের সমাহার! ছবির যিনি ‘সাবজেক্ট’, অর্থাৎ এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সেই ব্যক্তি যেমন হাজির, তেমনই সেই ‘সাবজেক্ট’-এর চারপাশে ছড়ানো বিভিন্ন মানুষ এবং বস্তুর সংস্থাপনকেও নিবিষ্ট হয়ে খেয়াল করল ক্যামেরা। পরিণামে, ‘সাবজেক্ট’-এর একটি মুহূর্ত যেমন ধরা পড়ল, তেমনই তাঁর চারপাশে যা যা আছে এবং যে বা যঁারা আছেন, সেসব বস্তু এবং জনমানুষও থেকে গেল ছবিতে।

এ পর্যন্ত রঘু রাইয়ের ছবির ভাবগত কাঠামোটুকু নিয়েই সামান্য কিছু আলোচনা হল। এর পাশাপাশি থাকে ছবির দৃশ্যসংস্থান অর্থাৎ কম্পোজিশন-সংক্রান্ত আলোচনা, যদিও তা এই একমুঠো লেখার বিষয় নয়।

ধরা যাক, বারাণসীর ঘাটে গঙ্গাবক্ষে যখন পণ্ডিত রবিশঙ্করের ছবি তোলা হচ্ছে, তখন পণ্ডিতজির নৌকার পাশে আরও নানা নৌকা, তাতে নানা লোকজন। রঘু রাই যখন শাটার টিপলেন, তখন সেই সুরসাধকের একটি নিমেষ তো ধরা দিলই, একই সঙ্গে সেসব নৌকা এবং লোকজনেরও নিজস্ব এক-একটি মুহূর্ত আশ্চর্য দৃশ্য-সংলাপ রচনা করল ছবির ‘সাবজেক্ট’ অর্থাৎ পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে। এসব নিয়েই রঘু রাই কথিত ‘সাইমালটিনিইটি অফ মোমেন্টস’!

‘পাত্র’টি ধরা দিলেন সংশ্লিষ্ট ‘স্থান’ এবং ‘কাল’-সমেত। একজন সার্থক চিত্র-সাংবাদিক এর বেশি আর কী-ই-বা করতে পারেন? অতঃপর, ‘চিত্রার্পিত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ দু’টির দিকে একবার ফিরে তাকানো যাক– ‘চিত্রলিখিত’ ও ‘চিত্রস্থ’। একটু আগেই দেখা গিয়েছে, রঘু রাই
যখন কোনও ব্যক্তিকে ‘চিত্রস্থ’ করছেন, তখন বহুক্ষেত্রেই তাঁর পরিপার্শ্বও একই সঙ্গে ‘চিত্রস্থ’, কারণ তাই আলোকচিত্রীর অভিপ্রায়– তা সে নিজের বাড়িতে উস্তাদ আলি আকবর খানই হন, বা ‘মাদার হাউস’-এর নিভৃতির মধ্যে মাদার টেরিজা। এভাবেই ‘চিত্রলিখিত’ হয় সেই ব্যক্তির বৃত্তান্ত।

সেই মানুষটি ‘চিত্রার্পিত’ হন, নিজস্ব স্থানাঙ্ক এবং কালাঙ্ক-সমেত। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর মতো করে, ছবি লিখতেন। সত্যি বললে রঘু রাইও ‘চিত্র’-লেখক, যদিও তাঁর কাজের ধাঁচ, মাধ্যম এবং তাৎপর্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাংবাদিকরা ‘কপি’ লেখেন। কিংবদন্তি চিত্র-সাংবাদিকটি ‘ছবি’ লিখতেন। প্রবাদমতে, একটি সার্থক ছবি নাকি সহস্র শব্দের সমান! রঘু রাইয়ের ক্ষেত্রে শব্দসংখ্যা ঠিক কত সহস্র হওয়া উচিত, সেই বিচারের ভার মহামতি পাঠকদের উপরেই ছেড়ে দেওয়া ভাল।

এ পর্যন্ত রঘু রাইয়ের ছবির ভাবগত কাঠামোটুকু নিয়েই সামান্য কিছু আলোচনা হল। এর পাশাপাশি থাকে ছবির দৃশ্যসংস্থান অর্থাৎ কম্পোজিশন-সংক্রান্ত আলোচনা, যদিও তা এই একমুঠো লেখার বিষয় নয়। একেবারে শেষকথাটি আদতে অশেষ, কারণ তা ভবিষ্যতে নিবদ্ধ। রঘু রাই তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিমায় স্বদেশকে চিত্রার্পিত করে গিয়েছেন। সেই কাজটির মাধ্যমে তিনি ভারতের প্রতি দৃষ্টিপাত-সংক্রান্ত কিছু বার্তা রেখে গিয়েছেন চিত্র-সাংবাদিকতায় তাঁর উত্তরসাধকদের প্রতি। সদাসর্বদা তাঁকেই মান্য করতে হবে, এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। প্রতিটি প্রজন্মই তার নিজস্ব পথ কেটে নেয়। কিন্তু, রঘু রাই যেসব দৃশ্য, যে-যে ভঙ্গিমায় দেখাতে চেয়েছেন, এক-একটি ছবির জন্য তিনি যে-পরিমাণ শ্রমস্বীকার করেছেন, যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তার বিশ্লেষণ জরুরি। শুধুমাত্র তা হলেই রঘুবংশ বিস্তৃতি লাভ করবে কালক্রমে।
অন্যথায়, মালা জমে জমে পাহাড় হয়, ফুল জমতে জমতে পাথর।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
sovan.eisamay@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement