এক যে ছিল সময়। প্রতিটি রূপকথার শুরুতে একজন রাজার কথা বলা হয়। বাস্তব পৃথিবীতে সময়ের চেয়ে বড় রাজা আর কে আছে! উত্তম দাসের প্রয়াণ যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দিল। বিশ্বায়ন-পূর্ব আদ্যিকালের পৃথিবীর এক কৌতুকসম্রাট। ভানু-জহর তো বটেই, নবদ্বীপ-শ্যাম লাহাদের সঙ্গেও তুলনা চলে না তাঁর। তবু তিনি ছিলেন। এবং নিজের জ্বালা 'হাসির হেডলাইট'-এ উজ্জ্বল হয়েই ছিলেন। বৃহস্পতিবাসরীয় সকাল থেকে সোশাল মিডিয়ায় ফিরে ফিরে আসছে তাঁর নাম। খোদ 'ইন্ডাস্ট্রি' প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন 'উত্তম দাস ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি মঞ্চে উঠলেই যেন জাদু সৃষ্টি করতেন'। তবু আজকের প্রজন্ম কি চেনে পুরনো পৃথিবীর এক দুরন্ত এন্টারটেনারকে?
সমীক্ষা করে দেখতে পারেন। অধিকাংশই ঘাড় নাড়বে ডান থেকে বাঁয়ে, বাঁ থেকে ডানদিকে। সময় বড় বলবান। সে সবকিছুকেই এনট্রপির ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চায়। তবু বালির উপরে দাগ থেকে যায়। 'উত্তম হাসি'ও থেকে যাবে। কিন্তু আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর সামগ্রিক হাস্যকৌতুকের কেরিয়ারকে কোন নিক্তিতে মাপব আমরা? উত্তম দাস কেবল একজন শিল্পী মাত্র নন। ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে তিনি গত সহস্রাব্দের শেষভাগের সময়কে ধরতে চাওয়ার এক বালিঘড়িও বটে।
সময় বড় বলবান। সে সবকিছুকেই এনট্রপির ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চায়। তবু বালির উপরে দাগ থেকে যায়। 'উত্তম হাসি'ও থেকে যাবে। কিন্তু আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর সামগ্রিক হাস্যকৌতুকের কেরিয়ারকে কোন নিক্তিতে মাপব আমরা?
মনে রাখতে হবে, সেই যুগটা। আটের দশকের শেষদিক। একটা ভাঙা, ক্ষয়াটে সময়। সদ্য বিপ্লবের ডানা মুচড়ে যাওয়া সময় পেরিয়ে এক স্থবিরতার দিকে হাঁটছে বাঙালি। বিশ্বায়নের ঢেউয়ে উথাল পাতাল হওয়া তখনও বাকি। নব্বই থেকে উদার অর্থনীতির শুরুয়াৎ হলেও তার প্রভাব পুরোপুরি অনুভূত হতে লেগে যাবে আরও কয়েকটা বছর। এই সময়কালে 'উত্তম হাসি'র ক্যাসেট বাজতে থাকবে পুজোর প্যান্ডেল থেকে উৎসব বাড়ি- সর্বত্রই। কেবল ক্যাসেট অবশ্য নয়। পাড়ায় পাড়ায় জলসাতেও তাঁর অনিবার্য উপস্থিতি। পরবর্তী সময়ে সাকিল আনসারিও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর সঙ্গে উত্তমের টক্করের কাহিনিও সেই সময়ে শোনা যেত। কিন্তু সাকিল ছিলেন কেবলই একজন উপস্থাপক। ক্যাসেট ছিল না তাঁর। তাই তাঁকে বিচার করতে হবে অন্য আতসকাচে। উত্তমের হাস্যরহস্যপূর্ণ ইমেজটিকে বুঝতে হবে অন্যভাবে।
বাংলা স্ট্যান্ড আপ কমিটি তখনও সুদূরে। সেই 'প্রাগৈতিহাসিক' সময়ে উত্তম দাস মঞ্চে উঠলে হইহই করে উঠত চারপাশ। ইউটিউবে সার্চ করে দেখছিলাম তাঁর ভিডিও। মঞ্চে উত্তমের একেকটি কৌতুকে হেসে উঠছে জনতা। মনে পড়ল ছোটবেলায় ক্যাসেটে তাঁর বলা নানা জোকসের কথা। ঠিক কেমন ছিল সেই সব হাস্যরসাত্মক পরিবেশন? আজ ভাবতে গেলে বুঝি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৌতুকের বুদ্ধিদীপ্ত শানিত ছটা নয়, উত্তম দাসের ছিল নিজস্ব 'সিগনেচার'। দু-একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। একজন টিকিট চেকার উঠেছেন ট্রেনে। এক মদ্যপের থেকে ভাড়া চাইলে তিনি সব পোশাক খুলে বলেন, ''হাফ প্যান্ট হাফ টিকিট। নো প্যান্ট নো টিকিট।'' আরেকটি জোকসে একজন মাতাল বারবার টিকিট কাউন্টারে গিয়ে জানতে চান, বিভিন্ন ট্রেনের সময়। শেষে কাউন্টারের ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে জানতে চান কোথায় যেতে চান তিনি। জবাবে মাতাল ভদ্রলোক বলে ওঠেন, ''কোত্থাও না। লাইনের এপার থেকে ওপারে যাব।'' মিমিক্রিও করতেন উত্তম। ধর্মেন্দ্রর 'চুনচুনকে মারুঙ্গা'র জবাবে উৎপল দত্তের কণ্ঠস্বরে উত্তম বলেন, ''তোমার যখন জন্ম হয়েছিল, চুনের উপরে হয়েছিল নাকি?''
এমনই নানা জোকস। কোনও কোনওটা আরও ঝাঁজালো। 'দাদুর লাল টম্যাটো' জাতীয়। আজকের পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের ছিঁটেফোঁটাও নেই এই সব জোকসে। সেই কারণেই টিকে গিয়েছে বন্ধুদের অশ্লীল আড্ডায়। উত্তম দাসের কোনও কোনও জোকস আজও বেনামে ঘুরে বেড়ায় এদিক সেদিক। তাঁর কৃতিত্ব সেখানেই। উত্তম দাসের জোকস একধরনের কাউন্টার কালচার। এমন এক প্রতি-সংস্কৃতি, যার কোন বাধ্যবাধকতা নেই মূলধারার সাংস্কৃতিক আচার মেনে চলার। মনে পড়ে গোপাল ভাঁড়কে। সন্তানের পিতা হওয়ার সঙ্গে মলত্যাগের আরামের তুলনা করেছিলেন যিনি। ছেঁড়া পোশাক পরে অর্থাৎ ভদ্রতার বেশভূষা ত্যাগ করে বাজারে হেঁটেছিলেন, যাতে কেউ হাতে ধরা ইলিশের দাম না জিজ্ঞেস করে! সেই কাউন্টার কালচারেরই এক বহু দূরবর্তী সময়ের উত্তরপথিক উত্তম দাস। গোপাল ভাঁড় নামে কেউ ছিল কিনা আদৌ, তা নিয়ে বিস্তর তর্ক রয়েছে। কিন্তু উত্তম দাস রক্তমাংসের এক চরিত্র হয়ে আমাদের মধ্যেই ছিলেন। অনেকেরই স্মৃতিতে উজ্জ্বল তাঁর পারফরম্যান্স নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতা। আর ডিজিটাল এই পৃথিবীতে ভেসে রইল তাঁর কণ্ঠস্বর।
তারকা শিল্পী কখন আসবে বোঝা যাচ্ছে না। উত্তম দাস জনতাকে বশে আনতে বলে চললেন জোকসের পর জোকস। অননুকরণীয় মেজাজে। বহু জোকস হয়তো আজ মনে হবে কাতুকুতু দেওয়া, কিন্তু সময়ের খিদে মেটাতে সেই সময়ে যার আবেদন ছিল অব্যর্থ। শোনা যায়, খড়দহের নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে ছিলেন। সেখান থেকে এক রূপকথার উত্থান। সেযুগে ক্যাসেটের দোকানে তাঁর ক্যাসেট থাকবে না, ভাবা যেত না। পাড়ার প্যান্ডেলে একবারও 'আয়নায় দাগ লেগেছে' বাজবে না, ভাবা যেত না। এখানেই উত্তমের সাফল্য। সমসময়ের বহু কিছুর সঙ্গে তিনি মিশিয়ে দিয়েছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত রসিকতার মেজাজ। এই সততাই তাঁকে সময়ের ভেলায় তুলে দিয়েছে। কেবল টিভি, সিডির জমানায় ক্রমশ ব্রাত্য হয়ে যান উত্তম দাস। অন্তত শহরাঞ্চলে। কিন্তু তিনি যে রয়ে গিয়েছেন, তা আবারও বোঝা গেল বৃহস্পতিবার। তাঁর মৃত্যুসংবাদে বিচলিত হলেন চলচ্চিত্র জগতের খ্যাতনামারাও। উত্তম তাই থেকে যাবেন। নিজস্ব 'সিগনেচারে' নিজের সময়কে তিনি লিখে রেখে গিয়েছেন ভাবীকালের জন্য।
