ব্রিটিশ-অধিকৃত ভারতের বাজায়ে সেই সময়ে যেসব গায়ে মাখার সাবান প্রচলিত ছিল সেগুলি তৈরির মূল উপাদান ছিল পশুর চর্বি। গরু, মহিষ ও শুয়োরের চর্বিজাত এই সাবানগুলিকে ভারতে বলা হত 'লার্ড সাবান'। কলমে অনুভা নাথ
'নিমওয়ালা মার্গো, রূপ-রাং কে দিয়ে অমৃত'
অথবা
'প্রিটি আগলি, ভিটি ওড
কথা হচ্ছিল বহু বছর ধরে ভারতীয় সমাজ তথ্য ভারতীয় জীবনের অঙ্গ এক ও অদ্বিতীয় সাবান 'মার্গো'-কে নিয়ে। দূরদর্শন বা খবরের কাগজের পাতায় সগৌরবে স্থান করে নেওয়া এই সাবানের ইতিহাস অনন্য। আমার নবতিপর পিসিমা তাঁর গোধূলির মতো নিভে যাওয়া কোঁচকানো চামড়া আমাকে দেখিয়ে গর্ব মেশানো গলায় বললেন, 'তোরা আধুনিকা, এই সাবানের মর্ম কী বুঝবি। আমার গায়ের জৌলুসের সবটুকুই এই মার্গোর অবদান।' সত্যিই তাই- বাঙালির উত্থানের সঙ্গে, তার আত্মগরিমার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে মার্গো সাবান। নিম-কে ইংরেজিতে বলা হয় 'নিম ট্রি', এছাড়াও এটিকে 'মারগোলা' নামে ডাকা হয়। 'মারগোস্যা' শব্দ থেকেই 'মার্গো' নামের উৎপত্তি।
ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতে ১৮৫৭ সালে সিপাই বিদ্রোহের কারণ আমরা সকলেই জানি। এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে চর্বি ব্যবহারের বিরুদ্ধে তৎকালীন ভারতীয় সেনারা বিদ্রোহ ঘোষনা করেন। এই বিদ্রোহই আমাদের দেশে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বৃহৎ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বীজ বপন করেছিল। পরে ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সমস্ত বাংলা রুখে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময়ই ব্রিটিশদের তৈরি বিদেশি পণ্য বর্জন ও নিজের দেশে তৈরি স্বদেশি পণ্য ব্যবহারের সূচনা। ১৯১৬ সালে এক মেধাবী বাঙালি ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে দেশমাতৃকার জন্য সম্পূর্ণ দেশজ রসায়ন ও রসদ দিয়ে তৈরি করলেন দেশের সাবান। খগেনচন্দ্র দাশ। রাব্য ছিলেন সেই সময়ের বিখ্যত ব্যারিস্টার ও বিচারক আর মা এক নিবেদিতপ্রাণ গান্ধীবাদী। নারী আত্মরক্ষা সমিতির সভানেত্রী।
রসায়নবিদ খগেনচন্দ্র দাশ তাঁর ক্যালকাটা কেমিক্যাল কোম্পানিতে চর্বিহীন সাবান 'মার্গো' তৈরি করলেন- যা ভারতে ব্রিটিশ পরিচালিত ও অধিকৃত একছত্র পণ্যের বাজারে আলোড়ন ফেলে দেয়। প্রতিটি রাস্তায়, গলিতে মানুষ ঝুড়ি মাথায় মার্গো সাবান বেচতে শুরু করে দিল! স্বদেশি সাবান বিক্রির মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি ও মনোবলকে মজবুত করে তুললেন।
এই বঙ্গসন্তান কলকাতায় পড়াশোনাশেষে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন। মায়ের দেখানো পথে স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্রিটিশবিরোগী কার্যকলাপ শুরু করেন। এবং অচিরেই ব্রিটিশ সরকারের কুনজরে পড়ে যান। শেষ পর্যন্ত তাঁর বাবা তাঁকে রিটেনে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠাতে চাইলে তিনি ব্রিটিশদের কাছে পড়বেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। তবে উচ্চশিক্ষার আদেশটি শিরোন্যরষ করেন। তা অর্জনের জন্য 'ইন্ডিয়ান সোসাইটি ফর দ্য অয়ডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্টিফিক ইন্ডাস্ট্রি' থেকে বৃষ্টি নিয়ে আমেরিকান জাহাজে করে ক্যালিফোর্নিয়া উদ্দেশে যাত্রা করেন। পরবর্তী সময়ে, ১৯১০ সালে স্ট্যান্ডফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে রসায়নে স্নাতক হয়েছিলেন। তিনি-ই ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে পাস করা প্রথম ভারতীয়। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে এই ধীমান বাঙালি পুরুষটিই দেশ ও দশের মুখ উজ্জ্বল করবেন, হবেন যুগান্তকারী মাগো সাবানের প্রতিষ্ঠাতা।
খগেনচন্দ্র তাঁর কলকাতার ৩৫ নং পস্তিতিয়া রোডের বিখ্যাত ক্যালকাটা কেমিক্যাল কোম্পানিতে চর্বিহীন সাবান মাগো তৈরি করালেন- যা ভারতে ব্রিটিশ পরিচালিত ও অধিকৃত একছর পণ্যের বাজারে আলোড়ন ফেলে দিল। সেই সময় প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি গুলিতে মানুষ ঝুড়ি মাথায় করে এই মার্গো সাবান বেচতে শুরু করে দিল।
ব্রিটিশ-অধিকৃত ভারতের বাজায়ে সেই সময়ে যেসব গায়ে মাখার সাবান প্রচলিত ছিল সেগুলি তৈরির মূল উপাদান ছিল পশুর চর্বি। গরু, মহিষ ও শুয়োরের চর্বিজাত এই সাবানগুলিকে ভারতে বলা হত 'লার্ড সাবান'। খগেনচন্দ্র তাঁর কলকাতার ৩৫ নং পস্তিতিয়া রোডের বিখ্যাত ক্যালকাটা কেমিক্যাল কোম্পানিতে চর্বিহীন সাবান মাগো তৈরি করালেন- যা ভারতে ব্রিটিশ পরিচালিত ও অধিকৃত একছর পণ্যের বাজারে আলোড়ন ফেলে দিল। সেই সময় প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি গুলিতে মানুষ ঝুড়ি মাথায় করে এই মার্গো সাবান বেচতে শুরু করে দিল। স্বদেশি সাবান বিক্রির মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতি ও মনোবলকে করে তুললেন মজবুত। একটিও গুলি না চালিয়ে, চিৎকার না করে খগেনচন্দ্র দাশ ব্রিটিশদের কানে কানে 'ইনকিলাব' ঘোষণা করে দিলেন।
মার্গোর সঙ্গে এখন বাঙালি পরিবার তো বটেই, আ-ভারত পরিচিত। ভেষজ সাবানটি মূলত চর্মরোগ প্রতিরোধ এবং ত্বকের যত্নে ব্যবহৃত হয়। বিশুদ্ধ নিমের তেল ও নির্যাস হল এর প্রধান উপাদান। অন্যান্য উপাদানের মধ্যে রয়েছে সোডিয়াম পামমেট ও সোডিয়াম পাম কারনেলেট। আছে গ্লিসারিন ও ভিটামিন ই, যা ত্বককে কোমল ও আর্দ্র রাখে। এছাড়াও রয়েছে ট্যাঙ্ক, সুগন্ধি, সোডিয়াম ক্লোরাইড, লরিদিক অ্যাসিড, ডিসোডিয়াম ইডিটিএ, প্রিজারভেটিভও জল অন্যতম। সাবানটির গাঢ় সবুজ রং ও আড়ম্বরহীন ভেষজ গন্ধ স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময় থেকেই এটিকে অনন্য করে রেখেছে।
কথিত, একটা সময়ে নাকি মার্গোর র্যান্ড ভ্যালু ছুঁয়ে ফেলেছিল ৭৫ কোটি টাকা। এই দেশ পেয়েছিল এক স্বদেশি সাবান আর বিপ্লবী খগেনচন্দ্র দাশ পেয়েছিলেন তাঁর জীবনের অর্থ হৃদয়ের তৃপ্তি। প্রবল আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন এই মানুষটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফেরার পর শুধুমাত্র খাদির পোশাক পরতেন। এমনকী, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও তিনি ছিলেন কট্টর ব্রিটিশবিরোধী। কলকাতায় পড়তে আসা বহু তরুণকে বৃত্তি দিতেন। তাদের পরাধীন চাকরি না করে নিজের উদ্যোগে ব্যবসা করার পরামর্শ দিতেন।
১৯৫৩ সালে ৭০ বছর বয়সে খ্যাতনামা বাঙালি উদ্যোগপতির মৃত্যু হয়। ভারও অনেক পরে বাংলায় মাগো সাবানের প্রস্তুতকারক বিখ্যাত ক্যালকাটা কেমিক্যাল কোম্পানি এই সাবান তৈরির স্বত্ব হস্তান্তর করে 'হেস্কল ইন্ডিয়া'-কে। ২০২১ সালে এই স্বত্ব কিনে নেয়। 'জ্যোতি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড'। ১১০ বছরের সুদীর্ঘ সময় অতিক্রম করার পরও মাগো সাবান নিজের অবিকল সৌরভ ও সৌন্দর্য নিয়ে বাঙালি, বাংলা তথা সারা ভারতে কাছে তার গৌরবময় ইতিহাসের জন্য রয়ে গিয়েছে অবিস্মরণীয় ও কালজয়ী।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
