shono
Advertisement
Bengal's intellectuals

‘বাবু’দিগের প্রতি হিতোপদেশ

উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ্বে তৎকালীন বাঙালি সমাজে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ‌্যায় বাবুদিগের দশটি ‘অবতার’ খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। স্বাভাবিক কারণেই বুদ্ধিজীবী ও কালচারাল মার্কসবাদী অবতারকে তিনি তালিকার বাহিরে রাখিয়াছিলেন।
Published By: Suhrid DasPosted: 01:26 PM May 16, 2026Updated: 01:26 PM May 16, 2026

‘বাবু’গণ উচ্চ প্রাদেশিকাতার সুরে মাতিয়া রাখিয়াছিলেন একাধিক দৈনিকের সম্পাদকীয়। গাজা-নিকারাগুয়া নিয়ে প্রতিবাদ করিলেও বাংলাদেশে বাংলাভাষী হিন্দু সম্প্রদায়ের কথা বলা হইতে বিরত রহিলেন। চিকিৎসক-কন‌্যার গণধর্ষণ ও মৃত্যুতে তাঁর মাতা প্রতিবাদী হইলে তাঁকে ‘অপর’ করিয়া অপমান করিলেন। ভূমি-নিকটস্থ বাস্তব হইতে এ বাবু-বিবিগণের যোজন খানেক দূরত্ব অতঃকিম্‌ ফিরিয়া আসিল বুমেরাং হইয়া। লিখলেন জিষ্ণু বসু। 

Advertisement

উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ্বে তৎকালীন বাঙালি সমাজে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ‌্যায় বাবুদিগের দশটি ‘অবতার’ খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। স্বাভাবিক কারণেই বুদ্ধিজীবী ও কালচারাল মার্কসবাদী অবতারকে তিনি তালিকার বাহিরে রাখিয়াছিলেন। কিন্তু অধুনা এই দুই ‘অবতার’-ই বাবুরা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সময় এই রাজ্যে জনমত নির্মাণের কার্য করিয়া থাকেন। তাহাদের মূল অবস্থান কলিকাতা হইলেও শিলিগুড়ি বা বর্ধমান আদি শহরেও তাহাদিগকে সতত দেখা যায়। বাবুরাই বলিয়া থাকেন, জনগণ শ্রবণ করে। গ্রাম বা শহরের অর্বাচীন জনসাধারণ কী বলে বা ভাবে, তাহা শুনিবার বা বুঝিবার আগ্রহ বাবুদিগের বিশেষ থাকে না।

বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শিল্পী, সাহিত্যিক বা অধ্যাপক আছেন। ওপার বাংলার ‘ঝিঁঝিগান’ নামক এক শিল্পী গোষ্ঠী তাহাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধি অর্ধ-তৃতীয় গিগাবাইট অর্থাৎ আড়াই জিবি-র অধিক নহে বলিয়া সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছে। ওই বাতুলেরা শ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবীদিগকে ‘সরকারি গাছ ধইর‍্যা বাঁচে, যেমন বাঁচে পরজীবী’ ইত্যাদিপ্রভৃতি কটুবাক্য বর্ষণও করিয়াছে। এপার বাংলায় অবশ্য ওই বাবু-বিবি সমুদায়ের কোনওরূপ অসম্মান হয় নাই। তাহাদিগকে নৈবেদ্য থালায় সর্বোচ্চে মোদকের ন্যায় স্থান দেওয়া হইয়াছিল।

বাবুরা বলিলেন, পশ্চিমবঙ্গের বাহির তথা ভারতের অন্যান্য প্রদেশ হইতে যাহারা এই রাজ্যে আসিয়াছেন, তাহারা প্রত্যেকেই বাঙালি-বিরোধী। ইহা শুনিয়া পল্লিগ্রামস্থ প্রজাগণ প্রমাদ গুনিল। গ্রামে কোনওরূপ কর্মসংস্থান নাই, তাহাদের সন্তানেরা বৎসরের সাত মাহিনা অন্য রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে অতিবাহিত করে। পাঞ্জাব বা দক্ষিণ ভারতে এরূপ বিচ্ছিন্নতাবাদী মন্তব্য করিলে বঙ্গদেশে তাহার নিন্দাসূচক বিশেষণ করা হইয়া থাকে। এই রাজ্যে সমধিক প্রাদেশিকতা সসম্মানে স্বনামধন্য দৈনিক পত্রিকাসমূহের উত্তর সম্পাদকীয় বিভাগে প্রকাশিত হইল। শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষ তঁাদের প্রিয় পত্রিকায় কালচারাল মার্কসবাদী অবতারে অবতীর্ণ বাবুর লেখা পাঠ করিল। 

বাবুরা বলিলেন, পশ্চিমবঙ্গের বাহির তথা ভারতের অন্যান্য প্রদেশ হইতে যাহারা এই রাজ্যে আসিয়াছেন, তাহারা প্রত্যেকেই বাঙালি-বিরোধী। ইহা শুনিয়া পল্লিগ্রামস্থ প্রজাগণ প্রমাদ গুনিল। গ্রামে কোনওরূপ কর্মসংস্থান নাই, তাহাদের সন্তানেরা বৎসরের সাত মাহিনা অন্য রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে অতিবাহিত করে।

সামান্য ভ্রুকুটি করিয়া শান্ত হইয়া গেল, মৌনব্রত অবলম্বন করিল। কলিকাতার স্বনামধন্য শিক্ষাসংস্থার বিদ্বান বুদ্ধিজীবী বলিলেন, ‘ধোকলা না কাতলা?’ কলিকাতার সাধারণ ব্রাত‌্যজন অদ‌্য আচারে-ব্যবহারে গর্বিত ভারতীয়। তাহারা ধোকলা-চাটনি সহযোগে প্রাতঃরাশ সারিল। অতঃপর বহু দিবসের পরে নিজ-ভোট নিজে প্রদান করিয়া দুপুরে কাতলা মাছের কালিয়া সহিত সামান্য অন্ন গ্রহণ করিল। তাহার পর নিজ উদ্যোগে এলাকায় একশত শতাংশ ভোটদান নিশ্চিত করিল।

পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের উপর লাগাতার অত্যাচার এই বঙ্গের মানুষ দশকের পর দশক ধরিয়া দেখিয়াছেন। কলকাতার বাবুরা প্যালেস্তাইনের গাজা ভূখণ্ডের জন্য শহর অচল করিয়াছেন, নিকারাগুয়ার জন্য খাদ্যাদি প্রেরণ করিয়াছেন, কিন্তু বাংলাদেশে বাংলাভাষী হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য একটিও প্রতিবাদ সভা করেন নাই, একটিও কবিতা লিখেন নাই, কোনও উপন্যাস বা প্রবন্ধে তাহাদের ‘কষ্ট’ বিধৃত করেন নাই। ভারত সরকারের ‘নিবিড় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’-এর মাধ্যমে বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুরাই সর্বাপেক্ষা অধিক উপকৃত হইবেন। তাহাদের সহিত কখনওই একজন সাধারণ অনুপ্রবেশকারীর তুলনা করা যায় না।

কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবসায়ীদের আয়োজিত সভায় সভাকবি বাবুরা ‘ক‌্যাক‌্যা ছিছি’, ‘কাকা ছিছি’ বলিয়া নৃত্য করিলেন। বাবু-বিবিগণ ‘আমরা অন্য কোথাও যাব না’ বলিয়া নাটক করিলেন। এসবের মধ‌্য দিয়া বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুর ন্যায্য অধিকার প্রদানের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হইল।

কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবসায়ীদের আয়োজিত সভায় সভাকবি বাবুরা ‘ক‌্যাক‌্যা ছিছি’, ‘কাকা ছিছি’ বলিয়া নৃত্য করিলেন। বাবু-বিবিগণ ‘আমরা অন্য কোথাও যাব না’ বলিয়া নাটক করিলেন। এসবের মধ‌্য দিয়া বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুর ন্যায্য অধিকার প্রদানের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হইল। বনগ্রামবাসী নমশূদ্র সম্প্রদায়ের এক দরিদ্র উদ্বাস্তু বাবুদের এরূপ নিষ্ঠুরতা দূরদর্শনের পর্দায় দেখিয়া নত শির হইয়া এক বিন্দু অশ্রু বিসর্জন করিল। অতঃপর নীরব হইয়া গেল।এই রাজ্যে কর্মসংস্থান নাই, যোগ্য শিক্ষিত যুবক-যুবতী পথিমধ্যে অনশনব্রত করিয়া প্রাণ দিতেছেন, আসন্নপ্রসবা মূর্ছা যাইতেছেন, অনুন্নত কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ মহর্ষি মান্ধাতার সময়কালীন, প্রতি বৎসর আলু চাষির আত্মহত্যা– এই সকল ‘তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা’ কখনও বাবুদিগের হৃদয়কে বিচলিত করিতে পারে নাই। তাহারা রানি স্তুতি করিয়াছে, জীবনানন্দকে উদ্ধৃত করিয়া বলিয়াছে, যে তাহাকে (রানিকে) পাইয়া পৃথিবী ধন্য হইয়াছে। ইতরজনেরা মন দিয়া সব শুনিয়াছে, মন প্রস্তুত করিয়াছে, আর মুখে কুলুপ অঁাটিয়াছে।

এক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ শাস্ত্রাদি ব্যাখ্যা করিয়া বলিলেন যে, বিজেপি নামক ম্লেচ্ছ দল যদি বঙ্গদেশে শাসন ভার গ্রহণ করে, তাহা হইলে ঘোর অনাচার হইবে। সকলে বলিল ওই রাজনৈতিক দল তো ভারতবর্ষের একবিংশতি রাজ্যে সুচারুরূপে শাসন পরিচালন করিতেছে। ব্রাহ্মণ কহিলেন, পশ্চিমবঙ্গে তাহারা অস্পৃশ্য। ফলতা, সন্দেশখালি, মগরাহাটের মতো বহু স্থানে মানুষ বিগত বছরগুলিতে নিরীহ রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু দেখিয়াছেন। তাই ফলতার পল্লিগ্রামস্থ পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় এক গৃহবধূ এসব শ্রবণ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, ওই ব্রাহ্মণ বাবুর ছায়াও যদি কখনও তাহার অঙ্গনে সমাপতিত হয়, তাহা হইতে গঙ্গোদক সহযোগে তা ধৌত করিয়া গোময় দ্বারা তাহা লেপন করিয়া, স্থান করিয়া তিনি জলগ্রহণ করিবেন। সেই অন্ত‌্যজ গৃহবধূও নীরবে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। 

এক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ শাস্ত্রাদি ব্যাখ্যা করিয়া বলিলেন যে, বিজেপি নামক ম্লেচ্ছ দল যদি বঙ্গদেশে শাসন ভার গ্রহণ করে, তাহা হইলে ঘোর অনাচার হইবে। সকলে বলিল ওই রাজনৈতিক দল তো ভারতবর্ষের একবিংশতি রাজ্যে সুচারুরূপে শাসন পরিচালন করিতেছে।

বিগত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে মানুষের প্রাণনাশ হইয়াছিল। আক্রান্ত নারী-পুরুষের ক্রন্দনরোল আকাশ-বাতাসকে আর্দ্র করিয়া তুলিয়াছিল। সেই শব্দ লুকাইবার জন্য উচ্চৈঃস্বরে ধ্বনিবর্ধক যন্ত্রে ‘খেলা হবে’ দিবারাত্রি বাজানো হইয়াছিল। বাবুরা সেই ক্ষণে নবগঠিত সরকারের চারিদিকে মক্ষীর মতো আবর্তন করিতেছিলেন। সমগ্র রাজ্য জুড়িয়া মানুষের হাহাকার বাবুদের কর্ণকুহ্বরে প্রবেশ করে নাই। এই ক্ষণে পুনরায় যখন বাবুরা পত্রপত্রিকা, আলাপচারিতায়, সমাজ মাধ্যমে বলিলেন, ‘খেলা হবে’, সাধারণ মানুষ আর তাহাদের জীবন লইয়া বাবুদের দ্যুতক্রীড়া করিতে সম্মত হয় নাই, তাহারা বুঝিয়াছে ইহা তাহাদিগের অস্তিত্বের সংকট।

মধ‌্যবিত্ত গৃহের কন্যা বহু সাধনায় চিকিৎসক হইয়াছিল। প্রতিবাদী সেই কন্যার দেহ ছিন্নভিন্ন করিয়াছিল ঘাতকের দল। প্রতিবাদে প্রতিস্পর্ধায় মুখরিত হইয়াছিল জনতা। তিনি বিদ্বজ্জনদিগকে সঙ্গে লইয়া আদেশ দিলেন, ‘উৎসবে ফিরুন’। অনেক বাবুরা উৎসবে ফিরিলেন, বহু বিবি মোমবাতি ফেলিয়া পমেটম হাতে নিলেন। কিন্তু মায়ের মন কি ভুলিতে পারে? সেই বেদনা শতগুণ বিবর্ধিত হইয়া কেবলই হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করিতে থাকে। অভয়ার মা বলিলেন, ‘আমি লড়িব’। মার্কসবাদী বাবু-বিবিরা ‘মার, মার’ করিয়া উঠিলেন। এসব প্রতিবাদ, রাত্রিজাগরণ ইত্যাদিতে ‘লেফ্‌ট লিবারাল’ তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের একাধিপত্য। তুমি কুলশীলহীন, অর্বাচীন মা, তোমার স্পর্ধা হয় কী করিয়া! তুমি বড়জোর আমাদের কাছে কতটা ঋণী তা জনে জনে বৃন্দগান গাইতে পারো মাত্র! রানির চেরিগণ পথে মায়ের উপর ঝঁাপাইয়া পড়িল। 

বাবুরা কহিলেন, যথাযথ শিক্ষা হইয়াছে। কিন্তু আক্ষরিকভাবে নিরক্ষর এক সবজিবিক্রেতা মায়ের পদস্পর্শ করিলেন, বাবুদের গৃহের এক পরিচারিকা আসিয়া শীর্ণার সন্তাপক্লিষ্ট হাতটি নিজের বক্ষে চাপিয়া ধরিয়া কহিলেন, ‘আমরা সাথে আছি, মা রে’।

বাবুরা কহিলেন, যথাযথ শিক্ষা হইয়াছে। কিন্তু আক্ষরিকভাবে নিরক্ষর এক সবজিবিক্রেতা মায়ের পদস্পর্শ করিলেন, বাবুদের গৃহের এক পরিচারিকা আসিয়া শীর্ণার সন্তাপক্লিষ্ট হাতটি নিজের বক্ষে চাপিয়া ধরিয়া কহিলেন, ‘আমরা সাথে আছি, মা রে’। এই রাজ্যের কোনও শিক্ষিত মানুষ, গুণীজন, বা শিল্পীকে আঘাত করা এই অর্বাচীন প্রতিবেদকের উদ্দেশ্য নহে। কেবলমাত্র ‘বাবু’-জন্মের নির্বাহ বিলাসীদিগের জন্যই এই বর্ণনা। ‘যিনি বিপরীতার্থ করিবেন, তঁাহার এই মহাভারত শ্রবণ নিষ্ফল হইবে। তিনি গোজন্ম গ্রহণ করিয়া বাবুদিগের ভক্ষ্য হইবেন।’ পঙ্‌ক্তি দু’টি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনা হইতে উদ্ধৃত। এই জাতি সর্বতোভাবে সাহিত্যসম্রাটের কাছে ঋণী।

সেই সিন্ধুতে এক বিন্দু বৃদ্ধি পাইলে ক্ষতি কি? হুগলি নদীতে সুপবন বহিতেছে দেখিয়া পাল তুলিয়া দিও, তাহাতে সগর্বে লিখিয়া দাও ‘বন্দে মাতরম্‌’। ভারত মায়ের এই জয়ধ্বনিতে বঙ্গজননীও আনন্দে বিহ্বল হইয়া উঠিবেন।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement