'গিগ' শ্রমিকদের ঘড়ি ধরে পৌঁছনোর ব্যাপারে তাড়া দেওয়া যাবে না। মহাসড়ক মন্ত্রালয়ের এই নির্দেশ মানছে কোথায় সাধারণ উপভোক্তা মহল!
'জলদি মত মচাও, আরামসে আও'। এই ধুনটি প্রতিবার কর্ণগোচর হয়, যখন অ্যাপ পরিষেবামূলক 'কুইক কমার্স' বিকিকিনির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে হয়। এটি সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রালয়ের ক্যাম্পেন। এখানে অমিতাভ বচ্চনের কণ্ঠে ভেসে আসে সাবধানবাণী। যে 'ডেলিভারি পার্টনার' দায়িত্ব পেয়েছেন দ্রুত, সময় ধরে, কোনও সামগ্রী গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার, তাঁকে যেন আমরা তাড়া না দিই। তাঁকে যেন 'জলদি' আসার বাধ্যবাধকতায় না জড়িয়ে ফেলি। কারণ যে-প্রযুক্তি 'কইক কমার্স প্ল্যাটফর্ম'-কে জনপ্রিয় করেছে, সেই প্রযুক্তিই আমাদের দেখিয়ে দেয়, কতক্ষণ সময় লাগতে পারে। ডেলিভারি পার্টনার সময়ে আসছেন, না কি দেরি করে ফেলেছেন। অ্যাপভিত্তিক যেসব পরিবহণ সংস্থা রাতবিরেত থেকে কাকভোর- আমাদের নাগরিক জীবনের অষ্টপ্রহরের সঙ্গী, তাঁদের ক্ষেত্রেও এহেন সতর্কতা প্রযোজ্য হয়। দ্রুত আসার জন্য তাড়া দেওয়া হয় তাঁদেরও। সামান্য দেরি হলে তিরস্কার জোটে অহরহ। কিন্তু যে-মন শিখতে চায় না, সেই মনকে কীই-বা শেখানো যায়।
সম্প্রতি একজন অ্যাপনির্ভর সরবরাহ ('কুইক কমার্স') কর্মীর মৃত্যু ঘটেছে লরির ধাক্কায়। তাঁর কাছে বারবার ফোন তাগাদা দেওয়া হয়েছিল তাড়াতাড়ি পৌঁছনোর জন্য। এমনকী, শেষবার যখন ফোন আসে, তখন এই সরবরাহ কর্মী দুর্ঘটনা কবলে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ অফিসার সেই ফোনটি ধরেন।
অ্যাপভিত্তিক যেসব পরিবহণ সংস্থা রাতবিরেত থেকে কাকভোর- আমাদের নাগরিক জীবনের অষ্টপ্রহরের সঙ্গী, তাঁদের ক্ষেত্রেও এহেন সতর্কতা প্রযোজ্য হয়। দ্রুত আসার জন্য তাড়া দেওয়া হয় তাঁদেরও।
অস্থায়ী তবে মজুরিনির্ভর কর্মীদের ইংরেজিতে 'গিগ' বলা হয়। 'গিগ' শব্দটিকে এ অর্থে প্রথম লেখায় তুলে এনেছিলেন 'বিট' প্রজন্মের সাহিত্যিক জ্যাক কেরুয়াক। একদা সংগীত জগতের অস্থায়ী পারফরমারদের বোঝাতে এটির প্রয়োগ ঘটত। কালক্রমে, কুইক কমার্স এবং অ্যাপভিত্তিক পরিবহণ সংস্থার সঙ্গে জড়িত কর্মীদের 'গিগ লেবার' বলা হতে থাকে। অসংগঠিত অর্থনীতির অংশ এঁরা। এঁদের মজুরি রয়েছে। কাজের স্থায়িত্ব নেই। পরিশ্রম হাড়ভাঙা। পেশায় রয়েছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উপভোক্তার থেকে পাওয়া অসংবেদনশীল ব্যবহার।
পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের মোট কর্মশক্তির প্রায় ২ শতাংশের বেশি মানুষ গিগ সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত। ইকোনমিক সার্ভে (২০২৫-'২৬) বলছে, এ দেশে গিগ শ্রমিকের সংখ্যা আনুমানিক ১ কোটি ২০ লক্ষ। ২০২০-২১ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৭৭ লক্ষ। অর্থাৎ, গত ৪ বছরে 'গিগ' শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে ৫৫ শতাংশ। ২০২৯-৩০ নাগাদ পৌঁছতে পারে ২ কোটি ৩৫ লক্ষে। তখন এই জনশক্তি আমাাদের দেশের অ-কৃষি কর্মশক্তির প্রায় ৬.৭ শতাংশ দখল করে নেবে।
উত্তরোত্তর সংখ্যাবৃদ্ধি স্থায়ী কর্মশক্তির স্থবিরতা ও চাকরিহীনতার কথা যেন ইঙ্গিতে বলে দেয়। এই বিপুল সংখ্যক 'গিগ' কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের 'কোড অন সোশ্যাল সিকিউরিটি, ২০২০'-র অধীনে নতুন শ্রম কোড কার্যকর করা হয়েছে। বিমা-সহ স্বাস্থ্য ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু জনমানসে এঁদের পেশাচিত্রটি বদল এখনও ঘটেনি। সামান্য তাড়া একটি জীবনকে বিপন্ন করতে পারে, সে-বোধ কই!
