'ঠান্ডা যুদ্ধ'-র আবহে দ্বিমেরু বিশ্বে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল আমেরিকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তারা ক্রমেই শক্তিশালী হয়েছে। অন্যদিকে, ভূ-রাজনৈতিক কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দুর্বল হয়েছে রাশিয়া। চিন ধীরে ধীরে উঠে এলেও নীতিগত নানা কারণে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ।
ফলে, বিশ্বের নেতৃত্বে আমেরিকার আধিপত্য কার্যত প্রতিষ্ঠিত। এর সুযোগ নিয়ে গত চার-পাঁচ দশকে আমেরিকা নানা দেশে গোলমাল পাকিয়েছে, ক্ষমতার পালাবদলে ভূমিকা নিয়ে পুতুল সরকার বসিয়েছে। কিন্তু সরাসরি অন্য দেশের অধীনে থাকা ভূখণ্ড দখল করার মতো আগ্রাসন দেখায়নি। এটুকু চক্ষুলজ্জা অন্তত ছিল পূর্বতন মার্কিন প্রেসিডেন্টদের।
কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেটাও নেই। একবার কানাডাকে ৫১তম মার্কিন প্রদেশ রূপে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে মুখ পুড়িয়েছেন। তাতেও শিক্ষা হয়নি। এবার তাঁর নজরে গ্রিনল্যান্ড। যে-ভূখণ্ড বহু দিন ধরেই ডেনমার্কের অধীন। কিন্তু তার উপর নিয়ন্ত্রণ চান ট্রাম্প। রাশিয়ার উপর নজরদারি, আক্রমণ চালাতে হলে যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও গ্রিনল্যান্ড অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে। তাই বিশ্বশান্তির ধুয়ো তুলে তাঁর দাবি, গ্রিনল্যান্ডের উপর দাবি ছেড়ে তা আমেরিকার হাতে তুলে দিক ডেনমার্ক।
বলা বাহুল্য, ইউরোপের বহু দেশ এই দাবি মানতে নারাজ। সম্ভাব্য মার্কিন অভিযান ঠেকাতে তাই গ্রিনল্যান্ডে সেনা মোতায়েন করেছে ফ্রান্স, জার্মানি, ডেনমার্ক। তাতে বিস্তর চটেছেন ট্রাম্প। হুট করে তাই ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসের উপর ১০ শতাংশ শুল্ক বসিয়ে দিয়েছেন। ফেব্রুয়ারি থেকে তা কার্যকর হবে। সমঝোতা না করলে জুন থেকে তা বেড়ে হবে ২৫%।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ 'ন্যাটো'-র ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতি কোন পথে এগবে, তা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে। যদি বিভিন্ন দেশ বিনা বাক্যব্যয়ে ট্রাম্পের দাদাগিরি মেনে নেয়, তাহলে আলাদা। নচেৎ নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা অমূলক নয়। এবং রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা বিশ্বের অগ্রগতির পথেও অন্তরায়। এই ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদের স্বীয় স্বার্থসিদ্ধির ইচ্ছা, খামখেয়ালি পদক্ষেপ পৃথিবীতে সর্বনাশা পরিণাম ডেকে আনতে পারে।
হিটলারের পর যেন মানব সভ্যতার ইতিহাসে আর-একজন সর্বকালীন খলনায়ক আবির্ভূত হয়েছেন। যাঁর সাম্প্রতিক নানা সিদ্ধান্ত প্রমাণ করেছে- ক্ষমতাশালী হওয়াই শেষ নয়, ক্ষমতার সঠিক ব্যবহারেই লুকিয়ে আছে আসল সার্থকতা, যার রসায়ন এই ব্যক্তি জানেন না। মার্কিন ডলারের প্রতাপ অজানা নয়। কিন্তু বিশ্বের সব সমস্যার সমাধান শুল্ক বৃদ্ধি করে কি হতে পারে? নিকোলাস মাদুরোকে জব্দ করার সময় হাতিয়ার হয়েছিল মাদক, গ্রিনল্যান্ডের প্রশ্নে যারা বিরোধিতা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে বাড়ানো হল শুল্ক। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত তাঁর অতীতকে ছাপিয়ে যাচ্ছেন।
