দুধ থেকে দই হতে যেমন খানিক সময় লাগে, তেমনই সময় লাগে আবেগ জমতে ও গাঢ় হতে। ভোট ও ভোটপরবর্তী রজনীতির চর্চা পেরিয়ে এবার বাঙালি আস্তে আস্তে বিশ্বকাপ ফুটবলের মায়াজালে জড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বকাপের গ্রুপ স্তরের খেলা এখনও শেষ হয়নি। খেলুড়ে দেশের সংখ্যাও এবার অনেক বেশি। কাজেই সব খেলা সমানভাবে ফলো করা বা দেখা সম্ভব নয়। তদুপরি এবারে ম্যাচের সময়সূচি গোলার্ধ ভেদে একটু প্রতিকূল। বাঙালির পছন্দসই সময়ে বহু খেলা পড়েনি। কিন্তু গ্রুপ স্তর পেরিয়ে যখন প্রতিযোগিতা প্রবেশ করবে 'নকআউট' স্তরে, এবং সেখানে জিতলে না-পারলে যখন বিদায়ঘণ্টি অনিবার্য তখন থেকে প্রতিটি ম্যাচকে ট্রাক করা তুলনায় সহজসাধ্য হয়ে উঠবে।
পছন্দের দলের জন্য, নবাগত দলের জন্য, 'ডার্ক হর্স' আখ্যাত দলের জন্য বাঙালির উদ্বেগ ও উদ্বেলতা অতএব বাড়বে। এরপর এই প্রতিযোগিতা যত হয়ে উঠবে আরও নির্দিষ্টভাবে ফাইনাল-মুখী, বাঙালির উত্তেজনা ও ফুটবল জ্ঞানকে সেই সময় যেন আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। যে ফুটবল খেলেনি কখনও, সেও এমনভাবে সাজাবে তার বক্তব্য--- বোঝার উপায় থাকবে না--- তার হাতেকলমে ফুটবল খেলার অভিজ্ঞতা-ই নেই।
এ-প্রবণতাকে বাঙালিয়ানার অহং বলব, না কি অবিমৃষ্যকারী বৈশিষ্ট্য, সে নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু বাঙালির ভাবলোক যেমন গম্ভীর চিন্তায় আলোড়িত হয়, তেমনই আমোদিত হয় নির্ভার আড্ডার প্রবাহে। এই আড্ডায়, এই তর্কে বাঙালি নতুন করে উদ্বোধিত হয়। কর্মক্ষমতার নিরিখে বাঙালির এই স্বভাবকে বিশ্লেষণ করলে হবে না। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় 'ধন্যি মেয়ে' মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭১ সালে। ফুটবলপ্রাণ এক বাঙালির আবেগ ও উৎসাহ এই সিনেমার মুখ্য বিষয়। জাগরণে ফুটবল, শয়নে ফুটবল, স্বপনে ফুটবল সেই ব্যক্তির। নিজের দলকে সে পাঠিয়ে দেয় দূরে টুর্নামেন্ট খেলতে।
পেনাল্টি কিক ফুটবল খেলার নিয়ামবলির মধ্যেই পড়ে। প্রাপ্য পেনাল্টি কেন কেউ বাইরে মারবে? পেনাল্টি তো অর্জন। কিন্তু বাঙালি যেন ফিল্ড গোল করাকে শ্রেয় বলে মনে করে।
সিনেমার গল্পে ক্রমে নান্য ধরনের সর পড়ে। নয়তো সিনেমার গল্প তো শুধু ফুটবল কেন্দ্র গড়াতে পারে না। তবে ফুটবল বাদ দিয়ে এই সিনেমার কোনও ঘটনা বা চরিত্রকে আলাদা করে উল্লেখও করা যায় না। প্রায় প্রবাদ হয়ে যাওয়া একাধিক সংলাপ এই সিনেমা থেকে উঠে এসে বাঙালির ফুটবল সংস্কৃতিতে মিশে গিয়েছে। তার একটি যেমন: পেনাল্টিতে গোল না করা। ওই ব্যক্তি পেনাল্টি কিক ইচ্ছাকৃতভাবে বাইরে মারার নিদান দেয় ভাইকে। এখানে ফুটবলের শৌর্য ও সৌন্দর্যকে অন্যভাবে পরিমাপ করতে চাওয়া হয়েছে যেন। বিশ্ব ফুটবলের অভিযাত্রার সঙ্গে তা মানানসই নয়।
পেনাল্টি কিক ফুটবল খেলার নিয়ামবলির মধ্যেই পড়ে। প্রাপ্য পেনাল্টি কেন কেউ বাইরে মারবে? পেনাল্টি তো অর্জন। কিন্তু বাঙালি যেন ফিল্ড গোল করাকে শ্রেয় বলে মনে করে। পেনাল্টিতে গোল দেওয়ার মধ্যে পৌরুষের সার্থকতা খুঁজে পায় না। এই যে জেতের বিপরীতে হাঁটা, এটি নেহাতই আবেগসঞ্জাত। ফুটবল বিজ্ঞানের সিলেবাসে তা পড়ে না। কিন্তু বাঙালির ফুটবলমানসে তা অক্ষয় অধিকারে আসীন। ফুটবলকে তাই তো বাঙালি মনে করে। সব খেলার সেরা।
