অসমে শীঘ্রই বিধানসভা নির্বাচন। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই রাজ্যটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে বহু ক্ষেত্রে পিছিয়ে। মাথাপিছু আয় কম, শিল্প ও উৎপাদন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার দেশের গড়ের তুলনায় কম, স্বাস্থ্যসূচকও যারপরনাই উদ্বেগের। এমন পরিস্থিতিতে নেতৃত্বকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হয়– তারা কি নাগরিকের জীবন-মান উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সম্প্রসারণের জন্য কাজ করবে, না কি ভোটবাণিজ্যের জন্য ভয় ও বিভাজনের পথ বেছে নেবে?
কারণ, রাজনীতি শুধুমাত্র ক্ষমতা দখলের জন্য নয়; একটি দায়বদ্ধতাও। এক পক্ষের নেতৃত্ব বেছে নিতে পারে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথ– যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আয়ের সমতা প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিশ্চিত হয়। আর অন্যদিকে, নেতারা ভয় ও বিভাজনের কৌশলকে ভোটে জেতার ‘হাতিয়ার’ হিসাবে ব্যবহার করে। যা সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতর সৃষ্টি করে। তার ফল হয় সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়া এবং প্রশাসনিক কাজে বাধা।
অসমের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছেন।
তিনি বাংলাভাষী মুসলিম সম্প্রদায়কে ‘লক্ষ্য’ করে উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করছেন শুধু নয়, তাদের রাজ্যের ‘জনবিন্যাসগত হুমকি’ হিসাবে বারবার তুলে ধরছেন।
বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এটি শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং সাম্প্রদায়িক উগ্র মেরুকরণেরই ধারাবাহিকতা। ফাইল চিত্র।
কোনও রাখঢাক না রেখেই। তিনি বাংলাভাষী মুসলিম সম্প্রদায়কে ‘লক্ষ্য’ করে উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করছেন শুধু নয়, তাদের রাজ্যের ‘জনবিন্যাসগত হুমকি’ হিসাবে বারবার তুলে ধরছেন। তিনি এমন সব মন্তব্য করছেন, যাতে ওই সম্প্রদায়কে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে ফেলে দেওয়া যায়। নাগরিকদের বলা হয়েছে মুসলিম রিকশাচালকদের কম পারিশ্রমিক দিতে, যাতে তারা অসম ছাড়ে। ‘ফার্টিলাইজার জিহাদ’, বন্যার দায় চাপানো– সবই রাজনৈতিক লাভের জন্য তৈরি। এরপরেও মাত্রা ছাড়িয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে মেরে ফেলার ভিডিও প্রকাশ করেন হিমন্ত। সেখানে দেখা যাচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রী একটি অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রে নিশানা করছেন। তাঁর নিশানায় ‘এআই’ দিয়ে তৈরি ছবি। টার্গেট দুই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। তাদের পরপর গুলি চালাচ্ছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী। সেই গুলিতে ঝাঁজরা দুই ব্যক্তি।
বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এটি শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং সাম্প্রদায়িক উগ্র মেরুকরণেরই ধারাবাহিকতা। যা সংবিধান এবং আইন– উভয়েরই সীমারেখা ছাড়িয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, অসমের মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ‘ব্যক্তিগত মতামত’ বলে অগ্রাহ্য করা যাবে না, সেটি রাষ্ট্রক্ষমতার ‘বচন’। নির্বাচন-পূর্ব উসকানিমূলক বক্তব্যকে হালকাভাবে দেখা মানে সংবিধান ও নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে উপেক্ষা করা। এই নির্বাচন রাজ্য এবং দেশের সাংবিধানিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পরীক্ষা। অসমের মানুষের প্রত্যাশা, রাজ্য নেতৃত্ব নাগরিকের কল্যাণ, সামাজিক সাম্য এবং ন্যায় নিশ্চিত করতে কাজ করবে। তাই রাজনৈতিক নেতাদের উচিত ভোট জেতার আগে সমাজের ভিত্তি, সংবিধান এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
