shono
Advertisement
Tarique Rahman

গণতন্ত্রে ফেরা! উন্নত ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে পারবেন তারেক রহমান?

তারেককে এমন এক চ‌্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, যা তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান অথবা মা খালেদা জিয়াকে কখনও হতে হয়নি।
Published By: Biswadip DeyPosted: 03:55 PM Feb 17, 2026Updated: 05:34 PM Feb 17, 2026

যে-ধর্মনিরপেক্ষ, উন্নত ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তারেক রহমান, সেই স্বপ্নপূরণের মসৃণ রাস্তা বাংলাদেশের জনতাই করে দিয়েছে। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবের মতো নির্বাচন বাংলাদেশ আগে কখনও দেখেনি। তবে তারেকের কথা ও কাজের সাযুজ‌্য কতটা– তা বোঝা যাবে আগামীতে। 

Advertisement

তাঁর স্বপ্নপূরণের সুযোগ খুব দ্রুতই পেয়ে গেলেন তারেক রহমান (Tarique Rahman)। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষ করে ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে তিনি মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের কায়দায় বলেছিলেন– ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম।’ ঢাকায় পৌঁছনোর মাত্র দেড় মাসেই একদম ক্ষমতার চূড়ায়। এর মধ্যে পদ্মা দিয়ে খুব বেশি জল প্রবাহিত হয়নি। ফলে তারেকের ঘাড়ে এখন স্বপ্ন সাকার করে দেখানোর প্রবল চাপ থাকবে। মানুষ এত দ্রুত তারেকের মন্তব্যটি ভুলে যাবে না। উপরন্তু, এত বিশাল জয়ের মুখও বিএনপি অতীতে দেখেনি। তাছাড়া, তারেককে এমন এক চ‌্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, যা তঁার বাবা জিয়াউর রহমান অথবা মা খালেদা জিয়াকে কখনও হতে হয়নি।

সমাজমাধ্যম যে বহুক্ষেত্রে প্রবল বিভ্রান্তি ও মিথ্যা ধারণা ছড়ায়, তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল বাংলাদেশের নির্বাচন। গোড়া থেকে সমাজমাধ‌্যমে প্রচার ছিল ভোট বানচাল হয়ে যাবে। অাওয়ামি লিগকে বাইরে রেখে বাংলাদেশে ভোট হতে পারে না বলেও প্রচার ছিল। ভোটের দিন বড় ধরনের সন্ত্রাসের গুজব তো ছিলই। বাস্তবে যা ঘটল, তাতে এইরকম শান্তিপূর্ণ ও উৎসবের মতো নির্বাচন বাংলাদেশ অাগে কবে দেখেছে, তা নিজেরাই মনে করতে পারছেন না বলে এখন অনেকে সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিচ্ছেন।

যেসব আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে ভোট দেখতে গিয়েছিলেন, তঁাদের বয়ানও সামনে আসছে। ভারত থেকে যাওয়া পর্যবেক্ষক অধ্যাপিকা শ্রীরাধা দত্তর সাক্ষাৎকার শুনছিলাম, তিনি বলছিলেন যে, যথেষ্ট আতঙ্ক নিয়ে ঢাকায় পৌঁছেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সর্বত্র ভোটকেন্দ্রের বাইরে উৎসবের মেজাজ ছাড়া অন্য কিছু প্রত্যক্ষ করেননি। রাস্তায় দেখেছেন নিরাপত্তাবাহিনীর চরম তৎপরতা। দেখেছেন, ভোটকেন্দ্রে বহু মহিলা শিশু সন্তানদের নিয়ে হাজির হয়েছে। ভোট দেওয়ার পর অনেকে ফুর্তির মেজাজে রাস্তায় দঁাড়িয়ে অাইসক্রিমও খাচ্ছে। বিক্ষিপ্ত অশান্তির ঘটনা কিছু ঘটেছে। কিন্তু সেসব শ্রীরাধার মতো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও বিশেষ আমল দিচ্ছেন না।

বাংলাদেশের এইরকম শান্তিপূর্ণ পথে ফের গণতন্ত্রের রাস্তায় ফেরা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার পক্ষেই আশাব্যঞ্জক। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে পর-পর জনবিক্ষোভে শাসক বদলের ঘটনা ঘটেছিল। এই তিন দেশের ক্ষেত্রেই সমাজমাধ্যমে লাগাতার তথাকথিত গণ-অভ্যুথানের যে ছবিগুলো ছড়ায়, তা খুবই উদ্বেগজনক ও বিরক্তিকর ছিল। উদ্বেগ তৈরি করেছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েই। একটি প্রজন্মের মূল্যবোধের অবক্ষয় যথেষ্ট বিরক্তিরও উদ্রেক করে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কায় ও বাংলাদেশে যেভাবে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ বা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে জনতার লুটপাট চলেছে, তা সত্যিই কোনও সভ‌্য দেশে চলতে পারে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টা কয়েক দিনে থেমে যায়নি।

গত ১৮ মাস ধরে সমাজমাধ্যমে নানারকম কুৎসিত ঘৃণা প্রদর্শন চলেছে। বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের মূর্তি ও বাড়ি বেশ কিছুদিন ধরে ভাঙা চলেছে। সাধারণ আওয়ামি কর্মী ও সংখ্যালঘুদের উপর অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এখনও প্রক্রিয়াটা পুরো বন্ধ হয়েছে বলা যায় না। এতটা অনাচার গ্রহণ করা যে কোনও সুস্থ মস্তিষ্কের কাছেই পীড়াদায়ক। তবে সুষ্ঠুভাবে ভোটপর্ব মেটা এবং নির্বাচনের ফল দেখে বোঝা যাচ্ছে, সমাজমাধ‌্যমের ছবির সঙ্গে বাস্তব অবস্থার অনেকটাই ফারাক রয়েছে।

বস্তুত, বাংলাদেশের ভোটের ফল উপমহাদেশে একটি স্বস্তির সুপবন বইয়ে দিয়েছে। ঢাকায় যেমন রয়েছে নির্বাচিত সরকার ফেরার এবং ‘মুক্তিযুদ্ধ’-র চেতনার পক্ষে সংখ‌্যাগরিষ্ঠ মানুষের দঁাড়ানোর অঙ্গীকারের স্বস্তি। তেমন কট্টর ভারতবিরোধী মৌলবাদী শক্তির পরাজয়ে স্বস্তি বোধ করছে নয়াদিল্লি। মুহাম্মদ ইউনূসের তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে অাওয়ামী লীগকে ‘নিষিদ্ধ’ করে ভোট থেকে সরিয়ে রেখেছিল, তাতে মনে হচ্ছিল নারীবিদ্বেষী মৌলবাদী শক্তি এবং রাজাকারদের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতাটা চলে যাওয়াই হয়তো ভবিতব‌্য। ইউনূস চাইলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অন্তত সেটা হতে দেয়নি। ভোটের অাগে বাইনারিটা হয়ে গিয়েছিল, অাপনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, না কি বিরুদ্ধে? বিএনপি ৪৯.৪৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এটাকে তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে চেতনার ভোট বলেই ধরে নিতে হবে।

অাগেই উল্লেখ করেছি– উদ্ভূত পরিস্থিতি এখন বিএনপি ও তারেকের কাছে খুবই চ‌্যালেঞ্জের। কারণ, এই প্রথম পরিস্থিতি এমন তৈরি হয়েছে যে, বিএনপি সম্পূর্ণ জামাতের বিরুদ্ধ অবস্থানে গিয়ে দঁাড়াতে বাধ‌্য হয়েছে। সিকি শতাব্দীর বিএনপি ও জামাতের অানুষ্ঠানিক জোট এবার ভেঙে গিয়েছে। মনে রাখতে হবে, জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই বিএনপির রাজনীতির অবিচ্ছেদ‌্য অঙ্গ হয়ে থেকেছে ইসলামপন্থী বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। যেটা ‘বঙ্গবন্ধু’ মুজিবুর রহমানের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিপন্থী। জন্মলগ্ন থেকেই বিএনপির দোসর থেকেছে জামাতের মতো শক্তি। খালেদা জিয়ার অামলে বিএনপি ও জামাতের প্রত‌্যক্ষ অঁাতঁাত হয়েছে। অাওয়ামী লীগের শূন‌্যস্থান পূরণ করতে গিয়ে তারেক এই প্রথম ধর্মনিরপেক্ষতার স্লোগান সামনে রেখে জামাতের বিরুদ্ধে দঁাড়িয়ে ভোট করেছেন। আপাতত জামাতের চ‌্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করেই তারেককে এগতে হবে। যেটা জিয়াউর রহমান বা খালেদা জিয়াকে করতে হয়নি।

একই সঙ্গে অবশ‌্য তারেকের কাজটা সহজও। কারণ বাংলাদেশের মানুষের রায় এবার নির্ণায়ক। তারা এবার যেভাবে জামাতের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট রায় দিয়েছে, তা অতীতে ঘটেনি। ফলে মানুষের সমর্থন থাকবে তারেকের সঙ্গে। হেরে গিয়ে কিছুটা দমে গিয়েছে জামাত ও তাদের মিত্রশক্তি হাসিনা বিরোধী অভ্যুত্থানের ‘নায়ক’ ছাত্ররা। 

তারেক বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে যে-স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, তার অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ, উন্নত ও অাধুনিক বাংলাদেশ গড়া। সেই স্বপ্নপূরণের মসৃণ রাস্তা করে দিয়েছে বাংলাদেশের জনতা। তসলিমা নাসরিন সমাজমাধ‌্যমে তঁার পোস্টে লিখেছেন, ১৭ বছর বিলেতে থেকে তারেকের দৃষ্টিভঙ্গির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। জয়ের পর ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে তারেকের সাংবাদিক বৈঠকেও বোঝা গিয়েছে, কথাবার্তায় তঁার এই সংযম দক্ষিণ এশিয়ার গড়পড়তা রাজনীতিবিদদের মতো নয়। তঁার কথা ও কাজের সাযুজ‌্য কতটা– তা অাগামী দিনে বোঝা যাবে। বাংলাদেশে সৌহার্দ্যপূর্ণ, অাধুনিক ও উন্নয়নকামী সরকার যে ভারতের পক্ষে সবসময়ই কাঙ্ক্ষিত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement