'মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায়'- এই শব্দবন্ধ ব্যবহার বন্ধের নির্দেশে নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ফিরিয়ে দিলেন 'অনুপ্রেরণা' শব্দটির কৌলীন্য। এ উদ্যোগ সূক্ষ্ম, স্মার্ট।
ভারি মনোহর একটি বাংলা শব্দ- প্রায় বিকল্পহীন-'অনুপ্রেরণা'। কিন্তু শব্দটি সর্বত্র দেখতে দেখতে জীবনানন্দ দাশের 'আদিম দেবতারা' কবিতার একটি অমোঘ পঙ্ক্তি মনের মধ্যে গুলিয়ে উঠত: "ব্যবহৃত ব্যবহৃত হ'য়ে শুয়োরের মাংস হয়ে যায়?" আশ্চর্যের ব্যাপার, 'অনুপ্রেরণা', এমনকী 'প্রেরণা' শব্দটিও, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বঙ্গীয় শব্দকোষ'-এ নেই। যদিও আছে 'অনুপ্রাণন'- 'উজ্জীবন' অর্থে। পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বছরের পর বছর যে কোনও উদ্যোগের সঙ্গে ব্যবহৃত হতে হতে, এতটাই 'ক্লিশে' হয়ে গিয়েছিল 'অনুপ্রেরণা' শব্দটি, এতটাই জীর্ণিত অবনমন ঘটেছিল তার নিহিত ব্যঞ্জনার, যে, বাংলা ভাষাকে প্রার্থী হতে
হচ্ছিল 'প্রাণন' বা 'উৎসাহন'-এর মতো বিকল্পের কাছে।
বাংলা ভাষা ও বাঙালিকে এই বিড়ম্বনা থেকে মুক্ত করলেন বঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর প্রথম ভাষণের এই আত্মপ্রত্যয়ী অভয়দানে- সরকারি কোনও কর্মসূচিতে 'অনুপ্রেরণা' শব্দটি আর যেন ব্যবহৃত না হয়। 'মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায়'- এই শব্দবন্ধও আর লিখতে হবে না। ব্যক্তি অনুপ্রেরণায় নয়, কাজ করতে হবে মানুষের জন্য- মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই বার্তায় 'অনুপ্রেরণা' শব্দে যেন ফিরে এল নতুন সন্দীপন। ফিরে এল তার হৃত ব্যঞ্জনার প্রাণ ও প্রসার।
'অনুপ্রেরণা' শব্দটি উচ্চারিত হলে অনেক বাঙালির, অন্তত সেকেলে বাঙালির, মনে আসবে, রবীন্দ্রনাথের 'নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ' কবিতার শুরুর ক'টি লাইন: "আজি এ প্রভাতে রবির কর/ কেমনে পশিল প্রাণের 'পর... না জানি কেন রে এতদিন পরে/ জাগিয়া উঠিল প্রাণ।'
এই আকস্মিক অনুপ্রেরণা কেমন করে বিপুল প্রকাশবাসনায় পৌঁছে দিল তরুণ রবিকে, রবীন্দ্রনাথ জানালেন সে-কথা ওই কবিতাতেই 'আমি জগৎ প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া/ আকুল পাগল-পারা; অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ প্রতিশ্রুত হলেন, এই অনুপ্রেরণা বা হঠাৎ আলোর ঝলকানির অভিঘাতে, অনিবার্য উত্তরণে। 'অনুপ্রেরণা' শব্দটি সবসময় বাঙালির মনে নিয়ে আসে সৃজন ও উত্তরণের অনুষঙ্গ। 'অনুপ্রেরণা' আমাদের নিয়ে যায় কোনও মহৎ উদ্দেশ্যের দিকে। যখন আমরা এগিয়ে যাই কোনও স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে, কোনও আদর্শকে রূপায়িত করতে, যে প্রবল উজ্জীবন ও ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন হয় সেই পথে পা ফেলতে, তার উৎস 'অনুপ্রেরণা', যা ব্যাখ্যার অতীত। সুতরাং 'অনুপ্রেরণা' শব্দটি যত্রতত্র খরচ করা যায় না। আমরা শব্দটিকে বড় বেশি সস্তা করে ফেলেছিলাম। বহু বছর পরে অনুপ্রেরণা খুঁজে পেল হারানো কৌলীন্য, হৃত সৌজাত্য।
রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে পূর্বতনের ফেলে যাওয়া সব ছায়াচিহ্ন মুছে ফেলার প্রয়াসটিও ঘোরতর রাজনৈতিক মনোভাবকে প্রকাশ করে। মিলান কুন্দেরার উপন্যাসে গ্রুপ ফোটোগ্রাফ থেকে পূবর্তন ব্যক্তির উপস্থিতি হাপিস করার নাটকীয় কারিকুরি আমরা পড়েছি। এ শহর সে-নিয়মেই একদা নীল-সাদা হয়েছিল। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী একটি শব্দের ব্যবহার রোধ করে পূর্বতন রাজনৈতিক যুগকে অস্বীকার করলেন। এ উদ্যোগ সূক্ষ্ম, স্মার্ট।
