'কথাসরিৎসাগর'। একাদশ শতকে ভারতীয় কিংবদন্তি, রূপকথা ও লোকবচনের এই সংকলনটি প্রস্তুত করেছিলেন কাশ্মীরের অধিবাসী সোমদেব। ১২৪টি অধ্যায়বিশিষ্ট 'কথাসরিৎসাগর' ১৮টি গ্রন্থে বিভক্ত। এর ১২তম গ্রন্থটি 'বেতাল পঞ্চবিংশতি' নামে পরিচিত। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ জি. টি. মার্শালের অনুরোধে বাংলায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর অনুবাদ সম্পন্ন করেন ১৮৪৭ সালে। মহারাজ বিক্রমাদিত্যর সঙ্গে মনুষ্যসম চেতনাবিশিষ্ট অথ্য অলৌকিক ক্ষমতাময় বেতালের কথোপকথন এই বইটির আখ্যান গঠন করেছে। নৈতিক মানদন্ড, আচরণবিদ্যা, বাস্তবের অনুধ্যান ও যুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রতিটি গল্পেই বিদ্যমান। বেতালকে ধরে নিয়ে যেতে চান রাজা। পথের মধ্যে বেতাল প্রতিবার একটি করে গল্প শোনায় এবং কূট প্রশ্ন করে। ভুল বললে বিক্রমাদিত্যর প্রাণসংশয়, আর ঠিক বললে বেতাল আবার ফিরে যাবে আগের স্থানে, অর্থাৎ রাজার শ্রম-বিনিয়োগ বৃথা হবে। এমন বিচিত্র শর্তের মধ্য দিয়েই রাতের আধারে এই ২৫টি গল্প নির্মিত হতে থাকে।
প্রথম আখ্যানেই একজন নিরপরাধ রাজদুহিতার নির্বাসন প্রসঙ্গে বেতাল জিজ্ঞেস করেছিল বিক্রমাদিত্যকে যে, 'রাজা ও মন্ত্রিপুত্র- উভয়ের মধ্যে কোন ব্যক্তি, নিরপরাধে রাজনন্দিনীর নির্বাচন-জন্য দুরদৃষ্টভাগী হইবেন।' বিক্রমাদিত্য বলেন, 'রাজা'। এর কারণ, অজ্ঞাতকুলশীলের কথায় বিশ্বাস করে, প্রমাণ না খুঁজে ও বিচারবোধ বিসর্জন দিয়ে, তিনি আপন মেয়েকে নির্বাসন দিয়েছিলেন। কাজেই তিনি রাজধর্মচ্যুত হয়েছেন, এর দরুন 'পাণস্পর্শ হইতে পারে'। সমগ্র আখয়নটি আমরা এখানে বিবৃত করার লোভ সংবরণ করলাম, বরং এই কথাটির আলোচনা জরুরি যে, 'রাজধর্ম শব্দটি নেহাত ঠুনকো নয়। কোনও তথ্য কানে শুনলেই হবে না, কোনও তথ্য হাতে এসে উপনীত হওয়াই যথেষ্ট নয়, প্রতিটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপলব্ধিকে প্রমাণের কষ্টিপাথরে ফেলে ব্যবচ্ছেদ করতে হবে।
রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী 'সকলের মুখ্যমন্ত্রী' হয়ে 'রাজধর্মী পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আর, এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্যে সজাগ রাখতে হবে নিরপেক্ষতা। রাজধর্ম পালনে যিনি নিয়োজিত, তাঁকে পক্ষপাত দেখালে চলবে না। তাঁকে একঝোঁকা হলে হবে না। নিজ-বিশ্বাস, প্রাতিষ্ঠানিক দায়, সংঘ বা দলীয় পরিচয়পত্র ছাপিয়ে রাজধর্ম-পালনকারীকে হতে হবে আগুনের মতো নির্মম, শুদ্ধ। আগুন বিপজ্জনকও। কেননা, আগুনে অসাবধানে হাত দিলে হাত পুড়তে বাধা। রাজধর্ম-পালনকারীকে হতে হবে ভোরের শিশিরের মতো নম্র, নমনীয়। যুধিষ্ঠির, তখনও রাজা হননি, জল খেতে গিয়ে এক যক্ষের একগাদা কূটিল প্রশ্নের সদুত্তর দিয়ে যখন আশ্বাস পেলেন, ইতোমধ্যে মৃত মর ভাইয়ের মধ্যে থেকে যে কোনও একজনকে বাঁচাতে পারেন সহদেবের নাম নিয়েছিলেন। কারণ, অন্তরের রাজধর্ম-চেতনা। কুন্তীর এক সন্তান তিনি, জীবিত। সহদেব বেঁচে থাকলে, মাদ্রিরও এক সন্তান জীবিত থাকবে।
এখানে প্রতিফলিত হয়েছে মনের সংবেদনশীলতা। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী 'সকলের মুখ্যমন্ত্রী' হয়ে 'রাজধর্মী পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পরিশ্রুত অভিজ্ঞতার অপেক্ষায় আমরা।
