ক্ষমতার অস্থায়ী, তাৎক্ষণিকের চাদরে মোড়া মনের বিলাস মাত্র। ক্ষমতা একদিন উবে যায়, রয়ে যায় কৃতকর্মের দৃষ্টান্ত। নমুনা: ডোনাল্ড ট্রাম্প।
‘ট্রুথ’ সোশ্যালে সম্প্রতি একটি বর্ণবিদ্বেষমূলক ভিডিও সম্প্রচারিত হয়েছে। যেখানে দু’টি বঁাদরকে দেখানো হয়েছে বারাক ও মিশেল ওবামার আদতে। উল্লেখ করা দরকার, ভিডিওটি ‘পোস্ট’ করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। শালীনতা ও সহবত বলে তবে কি আর কিছুই রইল না?
ব্যক্তিগত মান-সম্মান বোধের ঊর্ধ্বে রয়েছে ‘প্রেসিডেন্ট’ পদটির মর্যাদা ও ব্যাপ্তি। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাও কি ভুলেছেন? ‘বঁাদর’ রূপকল্পে খ্যাত বা অখ্যাত কোনও মানুষকেই দেখানো যায় না। এখানে আবার আক্রান্ত হয়েছে সেই মানুষটির ‘ইমেজ’ বা ভাবমূর্তি, যিনি মার্কিন মুলুকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আমেরিকার ৪৪তম প্রেসিডেন্ট রূপে তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত দায়িত্ব নির্বাহ করেছেন। সেই সুবাদে মিশেল ওবামাকে গণ্য করা হয় প্রাক্তন ‘ফার্স্ট লেডি’ বলে। অথচ নির্বিকার, নিরুদ্বিগ্ন, নিরুত্তাপ ট্রাম্প– ওবামা দম্পতিকে ‘বঁাদর’ বলে দাগিয়ে দিলেন। প্রেসিডেন্ট ‘পদ’টির ঐতিহ্য নিশ্চয় তিনি ভুলতে বসেছেন, নয়তো স্বয়ং প্রেসিডেন্ট হয়ে কী করে দেশের পূর্বতন প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে মন্দ কথা বলতে পারেন– এমন সন্দেহ প্রকাশ করেছেন স্বয়ং বারাক ওবামা!
ব্যক্তিগত মান-সম্মান বোধের ঊর্ধ্বে রয়েছে ‘প্রেসিডেন্ট’ পদটির মর্যাদা ও ব্যাপ্তি। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাও কি ভুলেছেন? ‘বঁাদর’ রূপকল্পে খ্যাত বা অখ্যাত কোনও মানুষকেই দেখানো যায় না।
রাজনীতির পরিসরে সুসংস্কারের চর্চা কি ক্রমশ কমছে? ক্ষমতার প্রতি মোহ, প্রভাব বিস্তারের ইচ্ছে এবং আস্ফালন কি প্রতিদিনের বাস্তব থেকে রাজনৈতিক চরিত্রদের আরও দূরে ঠেলে দেয়? নাহলে দলীয় মতাদর্শ প্রচার করতে গিয়ে কেমন করে তঁাদের এই বোধটি লুপ্ত হয় যে, আক্রমণের ভাষা রুচির মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
২০০০ সালে মুক্তি পেয়েছিল মহেশ মঞ্জেরেকরের ‘কুরুক্ষেত্র’ সিনেমা। মুখ্যমন্ত্রীর আদরে-আদরে বঁাদর হয়ে যাওয়া ছেলেটি ধর্ষণ করেছে একটি মেয়েকে। পুলিশ যখন তাকে গ্রেফতার করে, তখন কোথায় সে লজ্জিত হবে, উলটে চোটপাট করতে থাকে পুলিশেরই উপর। ইনভেস্টিগেটিং অফিসারকে বলে– ছেড়ে দে, নয়তো তোর গলায় কুকুরের বেল্ট পরিয়ে ঘোরাব। এসিপি পৃথ্বীরাজ সিং যখন অনবরত খারাপ ব্যবহার করে যাওয়া ধর্ষক ছেলেটিকে থামানোর জন্য চড় মারে, সে বলে, যতগুলি চড় মারবি, সবের হিসাব নেব! পুলিশ অবশ্য এই হুমকির মুখে দায়িত্ব থেকে সরে আসেনি। ধর্ষকের বিরুদ্ধে চার্জশিট তৈরি হয়। তখন রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ ঘটে মুখ্যমন্ত্রীর। পুলিশকে নির্দেশ দেয়, ছেলেকে ছেড়ে দিতে ও তৈরি করা চার্জশিট ছিঁড়ে ফেলতে। নয়তো ওসি-কে এমন দুর্গম জায়গায় ট্রান্সফার করা হবে যে বলার নয়!
আমেরিকার ৪৪তম প্রেসিডেন্ট রূপে তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত দায়িত্ব নির্বাহ করেছেন। সেই সুবাদে মিশেল ওবামাকে গণ্য করা হয় প্রাক্তন ‘ফার্স্ট লেডি’ বলে।
এই ধরনের রুক্ষ আচরণ, অশ্লীল ও উচ্চারণ-অযোগ্য ভাষা– যা সিনেমায় দেখানো হয়েছিল– ক্ষমতা থেকে উৎসারিত। যে-রাজনীতিকের কথা বলা হয়েছে, তার চরিত্রটি কাল্পনিক, কিন্তু এমন চরিত্রের দেখা মেলে না বাস্তবে, তাও কি আমরা বলে পারি? রাজনীতিকরা ভুলে যান– ক্ষমতার অস্থায়ী, একদিন উবে যায়, রয়ে যায় কৃতকর্মের দৃষ্টান্ত। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজত্ব একদিন শেষ হবে, কিন্তু মানুষ মনে রাখবে– তঁার মনোভঙ্গি এবং দৃষ্টিকোণ। ওবামা দম্পতির উদ্দেশে ছুড়ে দেওয়া তঁার এই ‘বঁাদর’ রূপকল্পও।
