পশ্চিমবঙ্গে বহু জনপ্রিয় তারকা প্রার্থী পরাজিত হলেও, দক্ষিণ ভারতে সিনেমার নায়ক বারবার সফল রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিণত হয়েছেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন আবারও দেখাল, এই বৈপরীত্য শুধু নির্বাচনী অঙ্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক স্মৃতি, সাংস্কৃতিক কল্পনা এবং নাগরিকের আত্মপরিচয়। লিখছেন, সুব্রত হালদার।
পশ্চিমবঙ্গ-সহ পাঁচ রাজ্যের সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনাগুলি শুধু জেতা-হারার অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নেতৃত্ব সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। ভারতীয় রাজনীতিতে চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয় মুখের অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গেও নির্বাচনে তারকাদের উপস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির হয়ে লড়া তারকা প্রার্থীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল– এঁরা কেউ-ই ‘নতুন মুখ’ ছিলেন না। এর আগেও তারা নির্বাচনে লড়েছেন, দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন এবং সক্রিয় রাজনৈতিক উপস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।
ভোটের ফলাফলে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য চোখে পড়ে। পরাজিত দলের অধিকাংশ তারকা প্রার্থী হেরেছেন, আবার বিজয়ী দলের প্রায় সব তারকা প্রার্থী জিতেছেন। অর্থাৎ, কঠিন সময়ে তারকাখ্যাতি দলকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করতে পারেনি। অথচ, তামিলনাড়ুতে আমরা একেবারে উল্টো ছবি দেখি। সেখানে থলাপতি বিজয়ের মতো একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নিজের সফল চলচ্চিত্র-জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সেই দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন।
এই বৈপরীত্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। কীভাবে একই দেশের মধ্যে, একই ভোটব্যবস্থার অধীনে, তারকাখ্যাতি কোথাও সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক সম্পদ হয়ে থাকে, আবার কোথাও তা স্বয়ংসম্পূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের রাজনৈতিক ‘বৈধতা’ নির্মাণের প্রক্রিয়ার দিকে তাকাতে হয়। একজন ব্যক্তি বা সংগঠন মানুষের কাছে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে কীভাবে? আমরা ঠিক কীসের ভিত্তিতে কাউকে নেতা হিসাবে মেনে নিই?
তামিলনাড়ুতে আমরা একেবারে উল্টো ছবি দেখি। সেখানে থলাপতি বিজয়ের মতো একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নিজের সফল চলচ্চিত্র-জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সেই দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন।
এই বৈধতা অনেকাংশেই তৈরি হয় স্মৃতির ভিতর দিয়ে। জীবন্ত অভিজ্ঞতা, কাহিনি, প্রতীক, কল্পনা– এসবের সমন্বয়ে রাজনৈতিক স্মৃতি গড়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানে রাজনৈতিক স্মৃতি প্রধানত অভিজ্ঞতা-নির্ভর। আন্দোলন, সংগ্রাম, সংগঠনের বিস্তার এবং প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ– এসবের ভিতর দিয়ে রাজনৈতিক বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। ফলে স্মৃতি এখানে ব্যক্তিগত নয়; সমষ্টিগত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা নৈতিক মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। কে কোন আন্দোলনে ছিল, কোন ইস্যুতে কী অবস্থান নিয়েছিল– এসব প্রশ্ন কেবল তথ্য নয়; এগুলো রাজনৈতিক বিচারবোধের অংশ। অর্থাৎ স্মৃতি এখানে শুধু অতীতের সংরক্ষণ নয়, বরং অভিজ্ঞতার সঞ্চয়।
অন্যদিকে, দক্ষিণ ভারতে রাজনৈতিক স্মৃতি তৈরির আর-একটি স্তর কাজ করে। এখানেও স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা কেবল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হয় না; প্রতীক, কল্পনা এবং ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার মাধ্যমেও গড়ে ওঠে। এই নির্মিত স্মৃতি কোনও মিথ্যা বাস্তবতা নয়। বরং বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে তা সামাজিক সত্যে পরিণত হয়।
এই দুই ধরনের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি স্মৃতি ও প্রতীক-নির্ভর নির্মিত স্মৃতি, একে-অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত নয়। বরং তারা দেখায় যে, রাজনীতি একমাত্রিক নয়। কোথাও স্মৃতি অতীতের ধারাবাহিকতা ধরে রাখে, কোথাও তা সম্ভাব্য ভবিষ্যতের কল্পনাকে বর্তমানের অংশ করে তোলে। অবশ্য এই বিভাজনও একেবারে অনমনীয় নয়। পশ্চিমবঙ্গেও প্রতীক ও আবেগের ব্যবহার রয়েছে, আবার দক্ষিণ ভারতেও বাস্তব রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ফলে পার্থক্যটি মূলত প্রাধান্যের।
যদি রাজনীতি স্মৃতি-নির্ভর হয়, তাহলে প্রশ্নটি আর ‘কোন স্মৃতি সত্য’ এই জায়গায় আটকে থাকে না। বরং প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়– কোন স্মৃতি সামাজিকভাবে কার্যকর, কোন স্মৃতি মানুষকে সংগঠিত করতে পারে, এবং কোন স্মৃতি রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি হয়ে ওঠে। ‘তারকা-খ্যাতি’ কোথাও কাজ করে, কোথাও করে না– এর উত্তর তাই ব্যক্তির মধ্যে নয়; স্মৃতি নির্মাণের এই ভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। দক্ষিণ ভারতে সিনেমা কেবল বিনোদন নয়; এটি সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিনেমা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে নেতৃত্ব, ন্যায় এবং কর্তৃত্বের নির্দিষ্ট রূপ বারবার নির্মিত হয়। নায়ক সেখানে শুধু চরিত্র নন; তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, দুর্বলকে রক্ষা করা এবং সংকটমুক্তির প্রতীক।
‘তারকা-খ্যাতি’ কোথাও কাজ করে, কোথাও করে না– এর উত্তর তাই ব্যক্তির মধ্যে নয়; স্মৃতি নির্মাণের এই ভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
এই ‘প্রতীক’ একবার তৈরি হয়ে থেমে থাকে না। অসংখ্য ছবি, দৃশ্য এবং সংলাপের মাধ্যমে তা বারবার পুনরাবৃত্ত হয়। ফলে দর্শক শুধু গল্প দেখে না; তারা নেতৃত্বের একটি নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত হয়। ধীরে-ধীরে এই কাঠামো ব্যক্তিগত পছন্দের বাইরে গিয়ে সামাজিক কল্পনায় পরিণত হয়– ‘নেতা’ কেমন হওয়া উচিত? এই প্রশ্নের একটি প্রস্তুত উত্তর হিসাবে। এখানেই সিনেমার রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট হয়। সিনেমা সরাসরি শাসন করে না, কিন্তু শাসনের ধারণাকে গড়ে তোলে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয় না, কিন্তু কেমন নেতৃত্ব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, তার একটি নৈতিক কাঠামো নির্মাণ করে।
এ প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই এম. জি. রামচন্দ্রন, এন. টি. রামা রাও, জয়ললিতা, পবন কল্যাণ বা সাম্প্রতিক সময় বিজয়ের মতো তারকারা রাজনীতিতে সাফল্য পেয়েছেন। আবার, কমল হাসানের মতো ব্যক্তিত্ব ততটা সফল নন। এই অসফলতার সম্ভাব্য কারণ হয়তো বা তঁার হিন্দি সিনেমায় অভিনয় কিংবা নায়ক পরিচিতির তুলনায় অভিনেতা পরিচিতির প্রাধান্যও হতে পারে। সুতরাং এঁদের জনপ্রিয়তা শুধু পর্দার সাফল্যের ফল নয়; বরং দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পুনরাবৃত্তির ফল, যেখানে পর্দার প্রতীক ধীরে ধীরে বাস্তব রাজনৈতিক প্রত্যাশার সঙ্গে মিশে যায়। অতএব, সিনেমা কেবল সমাজের প্রতিফলন নয়; রাজনৈতিক কল্পনাও তৈরি করে। অভিজ্ঞতার বদলে প্রতীকের মাধ্যমে স্মৃতি নির্মাণ করে ও মানুষের রাজনৈতিক বিচারবোধকে প্রভাবিত করে। ফলে ‘তারকা’-র ইমেজ এখানে শুধু দৃশ্যমানতা নয়; সম্ভাব্য রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তি হয়ে ওঠে। অবশ্য এই প্রতীকী শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হতে গেলে বাস্তব প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়াটা জরুরি।
অভিজ্ঞতার বদলে প্রতীকের মাধ্যমে স্মৃতি নির্মাণ করে ও মানুষের রাজনৈতিক বিচারবোধকে প্রভাবিত করে। ফলে ‘তারকা’-র ইমেজ এখানে শুধু দৃশ্যমানতা নয়; সম্ভাব্য রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এ ‘প্রতীকী শক্তি’-কে সাংগঠনিক ভিত্তি দেয় ফ্যান ক্লাব সংস্কৃতি। এর মাধ্যমে সিনেমা এবং বাস্তব সামাজিক জীবনের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি হয়। ‘ফ্যান ক্লাব’-কে বলা যেতে পারে এক ধরনের প্রাক-রাজনৈতিক সংগঠন, যেখানে ব্যক্তিগত অনুরাগ ধীরে ধীরে সামাজিক সম্পর্কে রূপ নেয়। স্থানীয় স্তরে এই ক্লাবগুলি রক্তদান শিবির, ত্রাণ বিতরণ, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা দৈনন্দিন সমস্যায় সাহায্যের মতো কাজে অংশ নেয়। ফলে পর্দার নায়ক আর দূরের কেউ থাকেন না। তাঁর নাম, প্রতীক এবং ইমেজ প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
সিনেমায় তৈরি হওয়া নৈতিক প্রতীক ফ্যান ক্লাবের মাধ্যমে বাস্তব সম্পর্কের ভিতরে প্রবেশ করে। মানুষ শুধু নায়ককে দেখে না; তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত একটি সামাজিক নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে ওঠে। এই অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই আবেগ সামাজিক রূপ পায় এবং সেই সামাজিক রূপ সংগঠনের ভিত্তি তৈরি করে। ফলে কোনও তারকা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করলে তিনি শূন্য থেকে শুরু করেন না; তাঁর নেপথ্যে আগে থেকেই একটি বিস্তৃত সামাজিক নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সংগঠিত আবেগ কাজ করতে থাকে।
তবে ‘নেতা’ কীভাবে তৈরি হয়, তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল– নাগরিক কীভাবে তৈরি হয়। কারণ, রাজনীতি শুধু নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্র নয়; বরং এমন এক জায়গা, যেখানে মানুষ নিজেকে নাগরিক হিসাবে কল্পনা করতে শেখে। একটি সমাজ তার মানুষকে কীভাবে দেখতে শেখায়, তারা নিজেদের কীভাবে বোঝে, এবং সেই অনুযায়ী কী ধরনের নেতৃত্বের প্রত্যাশা করে– সেই প্রক্রিয়াও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ।
দক্ষিণ ভারতের প্রেক্ষাপটে নাগরিক নিজেকে অনেকাংশে এমন এক সত্তা হিসাবে কল্পনা করে, যে-সংকটের সময় একজন নৈতিক ও কার্যকর রক্ষাকর্তার উপর আস্থা রাখতে পারে। ফলে নেতা এখানে কেবল প্রশাসনিক দক্ষতার প্রতীক নন; তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার এবং জটিল বাস্তবতাকে সরল করে সমাধান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। নাগরিক এই কাঠামোর মধ্যে নিজেকে একা মনে করে না; তার পাশে একজন নায়ক আছেন বলে অনুভব করেন।
দক্ষিণ ভারতের প্রেক্ষাপটে নাগরিক নিজেকে অনেকাংশে এমন এক সত্তা হিসাবে কল্পনা করে, যে-সংকটের সময় একজন নৈতিক ও কার্যকর রক্ষাকর্তার উপর আস্থা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নাগরিক নিজেকে একটি চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে কল্পনা করে। সংগ্রাম, আন্দোলন ও সংগঠনের অভিজ্ঞতা তাকে শেখায় যে, রাজনীতি বাইরে থেকে প্রদত্ত কিছু নয়; অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই তার অর্থ তৈরি হয়। ফলে ‘নেতা’ এখানে রক্ষাকর্তা নন; বরং সহযোদ্ধা– একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উঠে আসা প্রতিনিধি।
এই দুই ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন-ভিন্ন প্রত্যাশা জন্ম নেয়। কোথাও নেতৃত্বের মধ্যে নৈতিক হস্তক্ষেপের ক্ষমতা খোঁজা হয়, কোথাও খোঁজা হয় ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। কোথাও আস্থা দ্রুত সংগঠিত হতে পারে, কারণ তা প্রতীকের মাধ্যমে আগেই তৈরি থাকে; আবার কোথাও আস্থা সময় নেয়, কারণ তা অভিজ্ঞতার ভিতরে গড়ে ওঠে। ফলে, তারকার প্রতি গ্রহণযোগ্যতা বা সন্দেহ কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিকের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। যদি নাগরিক নিজেকে সংগ্রামের অংশ হিসাবে কল্পনা করে, তাহলে সে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করবে– এই ব্যক্তি কোথা থেকে এল? তার রাজনৈতিক অবস্থান কী? অন্যদিকে, যদি নাগরিক নিজেকে এমন একজন ভাবে, যে একটি বৃহত্তর নৈতিক শক্তির উপর আস্থা রাখে, তাহলে সেই শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠা একজন তারকার প্রতি বিশ্বাস তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অতএব, আমরা কাকে নেতা হিসাবে গ্রহণ করি, তা বোঝার জন্য শুধু নেতার দিকে তাকালেই যথেষ্ট নয়; তাকাতে হয় সেই সমাজের দিকে, যেখানে নাগরিক নিজেকে কীভাবে গড়ে তোলে। কারণ শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বের রূপ নির্ধারণ করে নাগরিকের কল্পনা ও স্মৃতি– সে নিজেকে কী মনে করে, এবং সেই অনুযায়ী কেমন নেতৃত্বকে সম্ভব বলে ভাবতে পারে।
আলোচনার শেষে এসে ভরসা ও সন্দেহ: এই দুই অনুভূতিও নতুন অর্থ পেতে শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গে তারকার প্রতি যে দ্বিধা দেখা যায়– ‘তিনি কি সত্যিই রাজনীতি বোঝেন?’– তা নিছক অবিশ্বাস নয়। এটি এক ধরনের রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রকাশ, যেখানে বৈধতা অর্জন করতে হয় সময়, সংগ্রাম এবং সম্পর্কের ভিতর দিয়ে। ফলে সন্দেহ এখানে রাজনীতির দুর্বলতা নয়; বরং তার আত্মরক্ষার একটি পদ্ধতি।
পশ্চিমবঙ্গে তারকার প্রতি যে দ্বিধা দেখা যায়– ‘তিনি কি সত্যিই রাজনীতি বোঝেন?’
অন্যদিকে, দক্ষিণ ভারতে যে-‘ভরসা’ দেখা যায়, তাকে সরল আবেগ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই আস্থা দীর্ঘ সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার ফল– যেখানে প্রতীক, কল্পনা এবং সামাজিক অভ্যাস একসঙ্গে কাজ করে। এখানে বিশ্বাস আগে তৈরি হয়; অভিজ্ঞতা পরে তাকে স্থায়ী করে। ফলে, নেতৃত্বের বৈধতা শুধু অতীতের উপর দাঁড়িয়ে থাকে না, ভবিষ্যতের সম্ভাবনার উপরও দাঁড়িয়ে থাকে। তবে ভরসা যেমন রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তি তৈরি করতে পারে, তেমনই অতিরিক্ত ব্যক্তিনির্ভরতাও তৈরি করতে পারে। আবার সন্দেহ যেমন নৈতিক মানদণ্ড রক্ষা করে, তেমনই অতিরিক্ত সন্দেহ রাজনৈতিক অচলাবস্থার দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
এই দুই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। বাস্তবতা একরৈখিক নয়; এটি কখনও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, কখনও কল্পনার মাধ্যমে, এবং প্রায়শই এই দুয়ের মিশ্রণে নির্মিত হয়। ফলে কোনটা সত্যি– এই প্রশ্নের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল, কোনটা সামাজিকভাবে কার্যকর, কোনটা মানুষকে সংগঠিত করতে পারে, এবং কোনটা আস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তারকা রাজনীতির সাফল্য বা ব্যর্থতা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বৃহত্তর সামাজিক প্রক্রিয়ার লক্ষণ, যেখানে সমাজ নিজের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের নেতৃত্বকে সম্ভব করে তোলে। কোথাও সেই নেতৃত্ব ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বহন করে, কোথাও তা কল্পনার শক্তিকে সংগঠিত করে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই আমাদের নিজেদের দিকেই ফিরে আসে। আমরা কাকে ‘নেতা’ হিসাবে গ্রহণ করি– এ প্রশ্নের ভিতরেই লুকিয়ে থাকে আর-একটি গভীর প্রশ্ন: আমরা নিজেকে কীভাবে দেখি? আমরা কি নিজেকে এমন ‘নাগরিক’ রূপে কল্পনা করি, যারা সংগ্রামের ভিতরে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব তৈরি করে? না কি আমরা এমন এক বাস্তবতার প্রতি আকৃষ্ট হই, যেখানে একজন নায়ক আমাদের হয়ে হস্তক্ষেপ করবেন?
