shono
Advertisement
Rabindranath Tagore

কবিগুরু উপলব্ধি করেছিলেন, এ ভূমের নিরন্তর নতুন জন্ম ঘটে

কলম ধরলেন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং।
Published By: Biswadip DeyPosted: 11:13 AM May 09, 2026Updated: 11:13 AM May 09, 2026

সাম্প্রতিক নির্বাচনী রায় নিছক ‘পরিবর্তন’ নয়। এ সেই সমস্ত শক্তির বিরুদ্ধে জনমতের বর্হিপ্রকাশ, যা বাংলাকে তার শিকড় ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। ‘কবিগুরু’ উপলব্ধি করেছিলেন, এই ভূমি কেবল পরিবর্তিত হয় না; এ ভূমের নিরন্তর নতুন জন্ম ঘটে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছেও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন কখনও ক্ষমতার লড়াই ছিল না। এটি ছিল এক পবিত্র প্রয়াস– হারানো গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক ‘যজ্ঞ’। ২৫ বৈশাখে বিশেষ প্রবন্ধ। কলম ধরলেন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং।

Advertisement

‘হে নূতন,/ দেখা দিক আর-বার, জন্মের প্রথম শুভক্ষণ॥’– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পঙ্‌ক্তির মধে‌্য নিহিত ছিল একটি আহ্বান– বাংলার চিরনবীন আত্মার উদ্দেশে প্রার্থনা। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে প্রতিবার এই গানে মুখরিত হয় তঁার অগণিত অনুরাগী, তঁাকে স্মরণ করে, তঁার জন্মের পুণ‌্যলগ্নে যে নবজাগরণ ও পুনর্নবীকরণের আনন্দ বহন করে, তা উদ্‌যাপন উপলক্ষে। কারণ, ‘কবিগুরু’ উপলব্ধি করেছিলেন, এই ভূমি কেবল পরিবর্তিত হয় না; এ ভূমের নিরন্তর নতুন জন্ম ঘটে।

‘কবিগুরু’ উপলব্ধি করেছিলেন, এই ভূমি কেবল পরিবর্তিত হয় না; এ ভূমের নিরন্তর নতুন জন্ম ঘটে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছেও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন কখনও ক্ষমতার লড়াই ছিল না।

কবিগুরুর ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীর এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে পশ্চিমবঙ্গের মাটি সাক্ষী রইল একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক পরিবর্তনের। ৪ মে, ভারতীয় জনতা পার্টি, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক জয়লাভ করেছে। সূচিত হল নবজাগরণ। কিন্তু বিজেপি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে এই নির্বাচন কখনও নিছক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ছিল না।

এ ছিল এই মহান ভূমির হারিয়ে যাওয়া গৌরব পুনরুদ্ধারের একটি সুযোগ– এমন এক অমোঘ আহ্বান, যা নির্বাচনী হিসাবনিকাশের ঊর্ধ্বে। আজ, তাই রাজনৈতিক বিতর্ক ও কোলাহল ক্ষণিকের জন‌্য সরিয়ে রেখে, সময় এসেছে আরও গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করার– বাংলা আদতে কী? এবং বাংলাকে ‘পুনরুদ্ধার’ করার অর্থই বা কী? বাংলার বর্তমানকে বুঝতে হলে, আমাদের অতীতে ফিরে যেতে হবে– দশক নয়, শতাব্দীপ্রাচীন অতীতে।

কবিগুরুর ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীর এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে পশ্চিমবঙ্গের মাটি সাক্ষী রইল একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক পরিবর্তনের। ৪ মে, ভারতীয় জনতা পার্টি, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক জয়লাভ করেছে।

বাংলা কেবল বৌদ্ধিক পরিশীলনের প্রতীক হয়ে ওঠার বহু আগে, সে ছিল এক পবিত্র ভূমি। পঞ্চদশ শতকে, গঙ্গার তীরে নবদ্বীপে, নিমাই নামে এক যুবক– যঁাকে বিশ্ব পরে চৈতন‌্য মহাপ্রভু নামে চিনবে– কীর্তন গাওয়া শুরু করেন। যে কীর্তন নিছক সংগীত নয়, তা ভক্তির আড়ালে এক সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাত। তিনি অস্পৃশ্যকে আলিঙ্গন করলেন, পণ্ডিতের সঙ্গে নৃত্যেও মাতলেন, এবং ঘোষণা করলেন যে, ঈশ্বরের নাম প্রত্যেকের জন্য– কোনও জন্মপরিচয়ের ভার নেই সেখানে। তঁার প্রবর্তন করা বৈষ্ণব ধর্ম হয়ে ওঠে বাংলা তথা ভারতাত্মার আধ্যাত্মিক স্থাপত্য, যা একদিকে আনন্দময় ও সমানভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক।

দুই শতাব্দী পর, সেই একই চেতনা জাগতিক রূপ পেল বাউল ধারায়– সেসব পথিক মরমিয়া সাধকের মধ্যে, যঁাদের না ছিল জাত, না ছিল ধর্মগ্রন্থ; তঁাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হল ‘মনের মানুষ’-এর গান। বাউল ধারার এক অন‌্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র লালন ফকির। এমন একজন মানুষ, যঁাকে কোনও একক ধর্ম ‘নিজের’ বলে দাবি করতে পারেনি, প্রত্যেক পরম্পরা-ধর্মবিশ্বাস তঁাকে আপন করে নিয়েছে। তিনি ‘হিন্দু’ না ‘মুসলমান’– তা নিশ্চিত করা যায়নি, প্রয়োজনও পড়েনি কোনও দিন। এই সমন্বয়ী প্রতিভাই ছিল প্রকৃত বাঙালিয়ানার পরিচায়ক– যা কেবল অনুভব করা যায়, সংজ্ঞায়িত করা যায় না।

বাংলা কেবল বৌদ্ধিক পরিশীলনের প্রতীক হয়ে ওঠার বহু আগে, সে ছিল এক পবিত্র ভূমি। পঞ্চদশ শতকে, গঙ্গার তীরে নবদ্বীপে, নিমাই নামে এক যুবক– যঁাকে বিশ্ব পরে চৈতন‌্য মহাপ্রভু নামে চিনবে– কীর্তন গাওয়া শুরু করেন।

পরবর্তী তিন শতকে বাংলা শুধু ভারতের নৈতিক জাগরণে অংশগ্রহণ করেনি; বরং তার নেতৃত্ব দিয়েছে। রাজা রামমোহন রায়– এমন এক সমাজের সাক্ষী ছিলেন, যা কুসংস্কার ও জড়তায় কলুষিত। তিনি অন্ধ ঐতিহ্যের কাছে আত্মসমর্পণ না করে, পরিত্যাগ করেন। সংস্কার করেন– সতীদাহ প্রথা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‌্যাসাগর সেই আলোকশিখাকে আরও দূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিশেষত নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা এনে দেন তিনি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপ‌াধ‌্যায় জাতিকে দিয়েছিলেন তঁার প্রথম কালজয়ী উপন্যাস, যার অন্তর্গত ছিল ‘বন্দে মাতরম্‌’ শব্দবন্ধ। এমন এক সংগ্রামী আহ্বান, যা এক শতাব্দী ধরে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় এবং এখনও প্রতিটি ভারতীয়ের কাছে পরম গৌরবের।

বাংলা ভারতকে দিয়েছে প্রথম মহিলা চিকিৎসক– কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ‌্যায়। যিনি নারীদের আত্মনির্ভরতা ও স্বাধীনতার পথে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। বাংলায় জন্ম নেন শ‌্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ‌্যায়– এক দৃঢ়চেতা জাতীয়তাবাদী, ভারতের ঐক্যের জন্য যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।

বাংলার মাটিতে যে অসংখ্য মনীষী ও মহাপুরুষ জন্ম নিয়েছেন, তঁাদের মধ্যে সম্ভবত স্বামী বিবেকানন্দ সবচেয়ে দীপ্তিমান, আলোকিত ও বিদ্যুৎপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। ১৮৯৩ সালের বিশ্বধর্ম মহাসভায় তঁার ঐতিহাসিক বক্তৃতার মাধ‌্যমে তিনি বিশ্বকে হিন্দুধর্মের মহিমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততার অবসানের আহ্বান জানিয়ে।

প্রত‌্যাবর্তনের পর দেশবাসীর কাছে আরও এক কঠিন সত্য তুলে ধরেন– দুর্বল আধ্যাত্মিকতা আবেগপ্রবণতাসম; ক্ষুধার্ত মানুষকে দর্শন শেখানো যায় না; দেবীকে কেবল মন্দিরে নয়, নারী, দরিদ্র এবং জাতির মধ্যেও পূজা করতে হবে। এই হল বাংলা। বাংলা চিরকাল এমনই। এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এই দর্শনেই বিশ্বাসী। অতীতে ফিরে গিয়ে পুরাতনী মনন পোষণের জন‌্য নয়, বা ভিনদেশি সত্তায় রূপান্তরিত হওয়ার জন্যও নয়– বরং বাংলার যে সুপ্ত সভ‌্যতা তা পুর্নজাগরণই তঁার একমাত্র ‘পাখির চোখ’। বাংলাকে নতুন করে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তিনি।

দীর্ঘ দিন ধরে বাংলার কিছু বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক মহল নিজেদের সভ্যতাগত উত্তরাধিকারকে একপ্রকার লজ্জার বিষয় করে তুলেছে– ঔপনিবেশিক মতাদর্শের প্রতি আগ্রহী হয়ে। এর ফল বহু দশকের স্থবির উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং কণ্ঠরোধ, যে বা যারা ধর্ম ও সংস্কৃতির হয়ে গলা তুলেছেন।

সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলকে নিছক একটি নির্বাচনী রায় নয়। এটি সেই সমস্ত শক্তির বিরুদ্ধে জনমতের বর্হিপ্রকাশ, যারা বাংলাকে তার শিকড় ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন কখনও ক্ষমতার লড়াই ছিল না। এটি ছিল এক পবিত্র প্রয়াস— হারানো গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক ‘যজ্ঞ’।
বেলুড় মঠের প্রতি তঁার গভীর অনুরাগ, স্বামী বিবেকানন্দর প্রতি তঁার শ্রদ্ধা, এবং সুশাসনকে ‘সেবা’– অর্থাৎ উপাসনার এক রূপ হিসাবে ব্যাখ্যা– এসব নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এ হল বাংলার হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার ও উজ্জ্বল ও সুরক্ষিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। এ সবই একজন ‘প্রধান সেবক’-এর ‘প্রধান ধর্ম’ পালনের উদাহরণ।

বাংলাকে পুনরুদ্ধার করার ‘অর্থ’ হল, চৈতন‌্য মহাপ্রভুর কীর্তনের ঘাটের পাশে বিশ্বমানের পরিকাঠামো নির্মাণ। এর ‘অর্থ’ বিদ‌্যাসাগরের স্বপ্নের বিদ্যালয়গুলির উন্নতিসাধন। এর ‘অর্থ’ সেই ভূমিতে উৎকর্ষের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা, যে-ভূমি শতাব্দীর পর শতাব্দী ভারতকে শিক্ষায় নেতৃত্ব দিয়েছে। এর ‘অর্থ’ পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী ভাই-বোনদের মর্যাদা নিশ্চিত করা। এর অর্থ পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ দিনের অবহেলা ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে তাদের আহ্বানে সাড়া দেওয়া।

‘হে নূতন’– হে নবীন সত্তা, আরও একবার নিজেকে প্রকাশ করার সময় আগত। এই প্রার্থনাকেই সামনে রেখে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিকনির্দেশনা এবং বাংলার প্রতিটি সন্তান-সন্ততির আশীর্বাদ নিয়ে বাংলার প্রথম বিজেপি সরকার এখন থেকে তার ‘সেবা’ সম্পাদন করবে। গত অর্ধশতকে অনেক সময় মনে হয়েছিল, বাংলার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি বুঝি অতীত। কিন্তু এখন বাংলা পুনর্জন্ম পেল– সমৃদ্ধি ও শান্তিতে ভরা এক নবজীবনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement