তিন বছরের মায়া ও তার দাদা বেইলিকে, তাদের ডিভোর্সি বাবা-মা, ট্রেনে বসিয়ে রওনা করে দিল এক সকালবেলায়, তাদের দিদার বাড়ির উদ্দেশে। দিদা একটি দোকান চালায় প্রতিবন্ধী মামাকে নিয়ে। ছোট্ট মায়া বড় হতে থাকে মা-বাবার অমানবিকতায়, ভুগতে থাকে আত্মবিশ্বাসহীনতায়। ক্রুদ্ধ হয় ‘সাদা’ চামড়ার মানুষের বর্ণবিদ্বেষী মনোভাবে, ও দিদিমার অসহায় আপসে।
মায়ার যখন সাত, তার মা, তাদের দুই ভাই-বোনকে নিয়ে আসে নিজের কাছে। মাত্র ৮ বছর বয়সে, তার মায়ের ছেলে-বন্ধু মায়াকে ধর্ষণ করে, পরে সেই ধর্ষক খুন হয়। এই অভিজ্ঞতা মায়াকে নীরব করে দেয়। সংশয় আর অপরাধবোধের খাঁচায় বন্দি হয় মায়া।
এরই মাঝে মায়া সঙ্গ পায় মিসেস ফ্লাওয়ারের, মায়ার সামনে উন্মোচিত হয় সাহিত্য জগতের আলো। বইকে সে ‘বন্ধু’ রূপে পায় সারা জীবনের মতো। কিন্তু ঘৃণার অনুভূতি মায়াকে ছাড়ে না। তার চিকিৎসা শহরের একমাত্র দাঁতের ডাক্তার করে না, শুধুমাত্র মায়ার গায়ের রং ‘কালো’ বলে।
মায়ার ‘Caged Bird’ লেখার ৯১ বছর আগে। মায়ার মতো থেঁতলানো শৈশব রবীন্দ্রনাথের নয় অবশ্যই। তিনি সুপুরুষ, শিক্ষিত, অভিজাত। কিন্তু রবীন্দ্র-শৈশবও একার্থে খাঁচায় বন্দি ছিল না কি?
মাঝে কিছু দিন নিজের বাবার কাছে থাকতে যায় মায়া। বাবার বান্ধবী তার গায়ে হাত তোলে। মায়া এবার ঘরের মায়া ছাড়ে। গৃহহীন রাস্তার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে থাকতে শুরু করে। হাই স্কুলে এন্ট্রান্স পরীক্ষার আগেই চাকরি শুরু করে রাস্তার ছোট্ট প্যাসেঞ্জার গাড়ির কন্ডাক্টর রূপে। হয়ে ওঠে সান ফ্রান্সিসকোর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গী মহিলা কন্ডাক্টর। মায়া এরপর গর্ভবতী হল। প্রেমিক ছেড়ে চলে গেল তাকে। বেইলির পরামর্শে গর্ভবতী অবস্থার কথা স্কুলে না জানিয়ে মায়া পরীক্ষা দেয় এবং পাশ করে।
উথালপাথাল কিশোরী মায়া কখন যেন ‘মা মেরি’ হয়ে ওঠে। পুত্রসন্তান প্রসব করে। খাঁচার পাখি মায়া এবার গান গেয়ে ওঠে। সেই গান ছড়িয়ে পড়ে মায়ের কর্মে– কখনও নর্তকী রূপে, কখনও লেখিকা রূপে, কখনও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও প্রশাসক রূপে। পাশাপাশি, চলে সফল ফিল্ম নির্দেশনা। মার্টিন লুথার কিংয়ের অনুপ্রেরণায় মায়া হয়ে ওঠে আমেরিকায় ‘কালো মেয়ে’-দের নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনের মুখ– মায়া অ্যাঞ্জেলু (১৯২৮-২০১৪)। কিন্তু মায়ার চোখ ঝলসানো সাফল্যও তার শৈশবের খাঁচা-বন্দি জীবনের স্মৃতিকে মুছতে পারে না।
১৯৮৩ সালে, ৫৫ বছর বয়সে, ‘Caged Bird’ কবিতায় (‘শেকার, হোয়াই ডোন্ট ইউ সিং?’ কাব্যগ্রন্থ) মায়া লিখছেন– ‘The caged bird sings/ with a fearful trill/ of things unknown/ but longed for still/ and his tune is heard/ on the distant hill/for the caged bird/ sings of freedom.’
এই কৃষ্ণকলি মায়ার মতো, রবি ঠাকুরও আশ্চর্যভাবে লিখেছেন ‘দুই পাখি’-র মতো কবিতা, ১৮৯২ সালে, যখন তাঁর ৩১ বছর বয়স। লিখছেন– ‘খাঁচার পাখি’ ও ‘বনের পাখি’-র কথা। মায়ার ‘Caged Bird’ লেখার ৯১ বছর আগে। মায়ার মতো থেঁতলানো শৈশব রবীন্দ্রনাথের নয় অবশ্যই। তিনি সুপুরুষ, শিক্ষিত, অভিজাত। কিন্তু রবীন্দ্র-শৈশবও একার্থে খাঁচায় বন্দি ছিল না কি?
রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত জীবন অতীব সুখের এমন বোধ করি বলা চলে না, অবিশ্রান্ত মৃত্যুর মিছিল থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছেন, ক্রমশ আরও আঁকড়ে ধরেছেন উপনিষদের সান্নিধ্য।
‘জীবনস্মৃতি’-তে লিখছেন–বাল্যবেলার বন্দিদশার কথা, বাইরের আকাশ ও প্রকৃতিকে জানালা দিয়ে দেখার কথা, মা-বাবার নৈকট্য ছাড়া গৃহভৃত্যদের তত্ত্বাবধানে বাল্যকাল কাটানো। মায়ার মতো রবীন্দ্রনাথও ভুলতে পারেননি শৈশবে খাঁচা-বদ্ধ হওয়ার আখ্যান। ‘দুই পাখি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ আশাবাদী নন, মায়ার মতো। তিনি শেষ করেন ‘খাঁচার পাখি’-র হতাশা দিয়ে: ‘হায়,/ মোর শকতি নাহি উড়িবার।’
রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত জীবন অতীব সুখের এমন বোধ করি বলা চলে না, অবিশ্রান্ত মৃত্যুর মিছিল থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছেন, ক্রমশ আরও আঁকড়ে ধরেছেন উপনিষদের সান্নিধ্য। ‘গুরুদেব’ উপাধি ছেড়ে হতে উঠতে চেয়েছেন কবি, গানের মানুষ। দেশ, ধর্ম, জাতির সীমাবদ্ধতা তাঁকেও কুরে কুরে খেয়েছে।
মায়া অ্যাঞ্জেলু ও রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই সময়ের স্রষ্টা। শ্রেণি, জাতি, লিঙ্গ ও ভাষা– সবই তাঁদের আলাদা। কিন্তু তাঁদের জীবনের প্রারম্ভের দিনগুলিতে বদ্ধ হয়ে থাকার অভিজ্ঞতা দু’জনকেই একইরকমভাবে ভাবিয়েছে। তাঁরা আমাদের শিখিয়েছেন, আমরা যেন প্রত্যেকে ভাবি: ‘And still I rise’। ‘জীবন যেন দিই আহুতি মুক্তি-আশে’।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ফ্যাশন টেকনোলজি
goutam.saha@nift.ac.in
