সাহিত্য-শিল্প-দর্শনে অবচেতনের বিকলনে মৃত্যু এবং জল নিরন্তর পারস্পরিকতায় গড়ে তুলেছে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। কেন জলের কাছে গেলে মানুষ মনের গভীরে অনেক সময় শুনতে পায় মরণের কুহকি ডাক?
অথচ উল্টোটাও সত্য। জল ছাড়া প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। এই মহাবিশ্বে পৃথিবী ছাড়া আর কি কোথাও আছে জল? যদি থাকে তা হলে কোনও না কোনও রূপে প্রাণ আছে। জলের মধ্যেই তো পৃথিবীতে প্রথম দেখা দিয়ে ছিল প্রাণের স্পন্দন! প্রাণের বিবর্তনের বিষয়ে ডারউইনের বিস্ফোরক গবেষণা আমাদের নিয়ে যায় পৃথিবীর প্রাণহীন স্থল থেকে প্রাণময় জলে। জলেই পৃথিবীর প্রথম প্রাণস্পন্দন! কিন্তু তবু মানুষ জলকে কিছুতেই ছাড়িয়ে নিতে পারে না মৃত্যুভাবনা থেকে।
কেন মানুষের মনে, স্বপ্নে, অবচেতনে 'মৃত্যু' এবং 'জল' যুগে যুগে এমন ওতপ্রোত? বিষয়টি বিখ্যাত মনোবিদ কার্ল ইয়ুংকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। এবং দীর্ঘ গবেষণার পরে তিনি লিখেছেন, মানুষের গহন মনে সমুদ্র ক্রমশ হয়ে উঠেছে 'কালেকটিভ আনকনশাস'-এর সিম্বল, সামগ্রিক অবচেতনের প্রতীক, যেখানে এক কুহকি তারল্যে একাকার প্রাণ ও মৃত্যু। জলে ডুব দিলে আমরা ক্ষণিকের জন্য নিজেকে হারাই। লুপ্ত হয় প্রতি ডুবে আত্মপরিচয় ও অহং। এবং এই ক্ষণিক লুপ্তির জাদুটান মানুষ ভালবাসে। ইয়ংয়ের ভাষায়, এটাই 'ইগোডিসিলুশন': নিজের পরিচয়কে ক্ষণিক লুপ্তির তারল্যে ভাসিয়ে দেওয়া।
বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক ভার্জিনিয়া উল্ফ তাঁর 'আ স্কেচ অফ দ্য পাস্ট' প্রবন্ধে আলোচনা করেছেন মৃত্যুর নরম 'সিডাকটিভ ফোর্স' বা সম্মোহক শক্তি নিয়ে। এবং সেই সম্মোহনের সঙ্গে তুলনা করেছেন অতল জলের মোহন আকর্ষণের। তাঁর 'দ্য ওয়েল্স' উপন্যাসেও বারবার জল এবং মৃত্যুভাবনা একাকার। এবং শেষ পর্যন্ত নদীর মধ্যে হেঁটে চলে গিয়ে আত্ম বিসর্জন দিলেন ভার্জিনিয়া উল্ফ।
কেন মানুষের মনে, স্বপ্নে, অবচেতনে 'মৃত্যু' এবং 'জল' যুগে যুগে এমন ওতপ্রোত? বিষয়টি বিখ্যাত মনোবিদ কার্ল ইয়ুংকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে।
ব্রিটিশ কবি শেলিও বারবার ভেবেছেন সমুদ্রে মৃত্যুর কথা: 'দ্য সি উড লিফ্ট মি ইন ইটস ওয়েল্স অ্যান্ড লেট মি ডাই'। শেলি সমুদ্রে ডুবেই মারা গেলেন। একদিন জল তাঁকে গ্রাস করবে, এই রোম্যান্টিক স্বপ্ন তাঁর সফল হয়েছিল। অবাক লাগে যখন ভাবি দস্তয়েভস্কির নেভা নদী আর কালিদাসের রেবা নদী কী গভীরভাবে মিশে আছে মানব-মানবীর বিরহ ও বিচ্ছেদ, বিষাদ ও মৃত্যুভাবনার সঙ্গে। শেক্সপিয়রের অফিলিয়ার আত্মহত্যা এক স্বর্গীয় সরোবরের জলেই, মনে পড়তে পারে জল আর মৃত্যু নিয়ে আলোচনায়।
অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর একটি লেখায় লিখেছেন তাঁর আসন্ন মৃত্যু প্রসঙ্গে: তিনি পা পিছলে পড়ে গেলেন জলে। উঠেও এলেন। কিন্তু নিজে উঠে আসতে পারলেন না। অন্যেরা তুলল তাঁর দেহ। এই মৃত্যুর পরে তাঁর বেশ লাগছে।
