shono
Advertisement
Transgender

রাষ্ট্র ঠিক করবে কে রূপান্তরকামী? সংসদে পাশ বিল

২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক ‘নালসা’ (NALSA) রায় ‘ট্রান্সজেন্ডার’ মানুষদের নিজ লিঙ্গপরিচয় নিজেই নির্বাচন করার অধিকার দিয়েছিল। স্পষ্ট বলেছিল, লিঙ্গ পরিচয় কোনও মেডিক্যাল বোর্ড, সার্জারি বা জৈব পরীক্ষার মুখাপেক্ষী নয়; এটি ব্যক্তির নিজের অনুভব। এতে ব্যক্তিরই স্বায়ত্তশাসন থাকবে। পরীক্ষা যদি হয়, তবে শারীরিক না, তা মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা হবে। এই রায়কে বাস্তবায়িত করতে ২০১৯ সালে এসেছিল ‘ট্রান্সজেন্ডার সুরক্ষা আইন, ২০১৯’।
Published By: Subhodeep MullickPosted: 06:16 PM Mar 31, 2026Updated: 06:16 PM Mar 31, 2026

২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক 'নালসা' রায় 'ট্রান্সজেন্ডার' মানুষদের নিজ লিঙ্গপরিচয় নিজেই নির্বাচন করার অধিকার দিয়েছিল। বলেছিল, লিঙ্গ পরিচয় মেডিক্যাল বোর্ড, সার্জারি, বা জৈব পরীক্ষার মুখাপেক্ষী নয়; এটি ব্যক্তিগত অনুভব। ২০২৬ সালে সেই আইনের যে-সংশোধনী এল, তা যেন ভিন্ন পথে হাঁটছে। বলছে, লিঙ্গপরিচয় স্থির করবে চিকিৎসক বোর্ড আর জেলা কর্তৃপক্ষর শংসাপত্র। অর্থাৎ রাষ্ট্র। আজব তো?

Advertisement

সংসদে ‘ট্রান্সজেন্ডার অধিকার সুরক্ষা (সংশোধনী) আইন, ২০২৬’-এর যাত্রাটি, এখনকার বেশিরভাগ বিলের অ্যাক্টে পরিণত হওয়ার যাত্রার মতোই, ছিল পেশিসর্বস্ব ও সংক্ষিপ্ত। তর্ক বা আলোচনার অবকাশ দেওয়া হয়নি। ১৩ মার্চ, ২০২৬ বিল পেশ হল, ২৪ মার্চ লোকসভায় ও ২৫ মার্চ রাজ্যসভায় আইন পাশ হল। স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও সংসদে রূপান্তরকামীদের জীবন-মরণ নির্ধারক একটি বিল পাশ হল কোনও ট্রান্স সাংসদের অনুপস্থিতিতে।

আগে সামাজিকভাবে প্রভাবশালী বিলসমূহ সংসদের স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হত। বিরোধী দলগুলি এক্ষেত্রেও তেমন দাবি করেছিল। তা মানা হয়নি। উপরন্তু ‘জাতীয় ট্রান্সজেন্ডার কাউন্সিল’-এর সদস্য ও সম্প্রদায়ের অন্যান্য প্রতিনিধি দাবি করছেন যে, তাঁদের মতামতও নেওয়া হয়নি। সরকারের যুক্তি ছিল: ‘ট্রান্সজেন্ডার’ শব্দটির স্পষ্ট সংজ্ঞা প্রয়োজন, সরকারি সুবিধার ‘সঠিক উপভোক্তা’ চিহ্নিত করা প্রয়োজন, ‘জোর করে ট্রান্সমানুষে পরিণত করা’ আটকানো প্রয়োজন৷ উল্লেখ্য, যারা নিজের জন্মগত লিঙ্গ নিয়ে স্বচ্ছন্দ, তাদের ‘cis’/ ‘সিস’ মানুষ বলা হয়। এবং যাদের মনে হয়, তারা ভুল শরীরে আটকা পড়েছে, তারা ‘trans’/ ‘ট্রান্স’ মানুষ।

লক্ষণীয়, উক্ত আইনের নামে যদিও আছে ‘ট্রান্স’ মানুষদের সুরক্ষার কথা, কিন্তু তা তাদের কল্যাণের জন্য সৃষ্ট আইন, না কি ট্রান্সভীতি থেকে প্রণীত আইন, বোঝার উপায় নেই। আইনের ছত্রে ছত্রে আছে ‘ভুয়া ট্রান্স মানুষ’-এর আশঙ্কা, “লিঙ্গকর্তনের মাধ্যমে জোর করে ‘ট্রান্স’-এ পরিণত করা”-র ভয়। জোর করে কাউকে রূপান্তরকামীতে পরিণত করা যায় না, কারণ রূপান্তরেচ্ছা একটি বোধ। রূপান্তরকামী হওয়ার জন্য সার্জারির প্রয়োজন হয় না। ‘সেক্স রি-অ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি’-র অনেক আগেই, বা তা ব্যতিরেকে, কৈশোর থেকেই এদের মধ্যে এই বোধের উন্মেষ ঘটে যে, এদের মানসিক লিঙ্গ ও জৈবিক লিঙ্গ খাপ খাচ্ছে না। যদি কোনও ‘সিস’ মানুষের লিঙ্গ জোর করে ছেদন করা হয়, তবে তাকে আমরা কী বলব? স্বাভাবিক বুদ্ধি বলে, তাকে আমরা অত্যাচারিত ‘সিস’ মানুষ বলব, ‘ট্রান্স’ মানুষ নয়। এই অপরাধ যদি কারও উপর ঘটে, তাহলে ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ বা ‘বিএনএস’ অনুসারে যথেষ্ট শাস্তির ব্যবস্থা আছে, আলাদা আইনের প্রয়োজন ছিল না। যেভাবে ‘ট্রান্স’ মানুষ বলতেই ‘হিজড়ে’ ভাবার অজ্ঞতা আমরা সযত্নে লালন করি, তেমনই ‘সিস’ পুরুষ পুষে রাখে ‘জোর করে লিঙ্গ কর্তন’-এর ভয়, বিভীষিকা।

২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক ‘নালসা’ (NALSA) রায় ‘ট্রান্সজেন্ডার’ মানুষদের নিজ লিঙ্গপরিচয় নিজেই নির্বাচন করার অধিকার দিয়েছিল। স্পষ্ট বলেছিল, লিঙ্গ পরিচয় কোনও মেডিক্যাল বোর্ড, সার্জারি বা জৈব পরীক্ষার মুখাপেক্ষী নয়; এটি ব্যক্তির নিজের অনুভব। এতে ব্যক্তিরই স্বায়ত্তশাসন থাকবে। পরীক্ষা যদি হয়, তবে শারীরিক না, তা মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা হবে। এই রায়কে বাস্তবায়িত করতে ২০১৯ সালে এসেছিল ‘ট্রান্সজেন্ডার সুরক্ষা আইন, ২০১৯’। তারও খামতি ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে সেই আইনের যে-সংশোধনী এল, তাতে খামতি পূরণ হওয়া দূরস্থান, আরও পশ্চাদপসরণ সম্পন্ন হল যেন। তা ‘নালসা’ রায়ের থেকে ভিন্ন পথে হাঁটছে। কেননা, তা বলছে, লিঙ্গপরিচয় স্থির করবে চিকিৎসক বোর্ড আর জেলা কর্তৃপক্ষর শংসাপত্র। ‘নালসা’ রায় বলেছিল, লিঙ্গপরিচয়ের ব্যাপারে সংবিধানের ২১ ধারার সম্মানের ও গোপনীয়তার অধিকার মানতে হবে। ২০২৬ সালের বিল তাকে আনছে আমলাতান্ত্রিক ও ডাক্তারি নিয়ন্ত্রণের আওতায়। যে-আমলার থেকে শংসাপত্র আদায় করতে হবে, সেই আমলা কি ‘ট্রান্স’ মানুষদের বিষয়ে আদৌ অবগত? তিনি কি মর্যাদা ও গোপনীয়তা বজায় রাখবেন? সোজাকথায়, রাষ্ট্র এক রাষ্ট্র অনুমোদিত শরীরকেই ‘ট্রান্স’ মানুষের শরীর বলে চিহ্নিত করছে।

জৈবিক নিশ্চয়তাবাদের ভিত্তিতে ৫৬ বছর আগে ইংল্যান্ড পেয়েছিল ‘করবেট ভার্সাস করবেট’ রায়, যা ট্রান্স-নারীর স্ব-পরিচিতিকে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু একবিংশ শতকে তাকে প্রাচীন প্রমাদ হিসাবেই দেখা হয় সভ্যজগতে। চিকিৎসক জন্মলগ্নে যে ‘ছেলে’ বা ‘মেয়ে’ হিসাবে কাউকে চিহ্নিত করেন, তাকে বড়জোর ‘সেক্স অ্যাসাইন্ড অ্যাট বার্থ’ ‘বা জন্মলগ্নে ঘোষিত লিঙ্গ’ বলে এখন। ‘সেক্স’ বা জৈব লিঙ্গ এবং ‘জেন্ডার’ বা মনোসামাজিক লিঙ্গ যে-দু’টি আলাদা বিষয়, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে নারীবাদের একেবারে জন্মলগ্ন থেকে।

‘ট্রান্স’ মানুষের মাত্র চারটি গোষ্ঠীর উল্লেখ আইনে আছে– হিজড়া, কিন্নর, যোগতা, আরাবানি। ওই চারটি হল পেশা-গোষ্ঠী, চারটি গোষ্ঠীই দক্ষিণ এশিয়ায় নৃত্যগীত, শুভ অনুষ্ঠানে আশীর্বাদ দেওয়া ইত্যাদিতে যুক্ত, হিন্দু পুরাণ ও লোকগাথায় উল্লিখিত। হয়তো এ-কারণেই হিন্দুত্ববাদী সরকার তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। বিগত এক দশক ধরে কিন্নর আখড়ার সঙ্গে বিজেপির যোগাযোগ ও কিন্নরদের গেরুয়াকরণও প্রণিধানযোগ্য। যদিও প্রাচীন সাহিত্যে এই গোষ্ঠীগুলির স্বাভাবিকত্বই উদ্‌যাপিত হয়েছে, এবং যদিও তা ছিল সেই সময়ের নিরিখে যুগোপযোগী, কিন্তু সরকারের জানা-বোঝা হাজার হাজার বছর পূর্বের সেই সময়েই আটকে গিয়েছে। এই গোষ্ঠীগুলি ছাড়া সরকারের সংকীর্ণ ভাবনায় ও সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে শুধু শারীরিকভাবে যারা ইন্টারসেক্স, অর্থাৎ পুরুষ বা নারীর চেয়ে অন্যরকম জননাঙ্গ নিয়ে জন্মেছে, কেবলমাত্র তাদের।

‘ট্রান্স’ মানুষের মাত্র চারটি গোষ্ঠীর উল্লেখ আইনে আছে– হিজড়া, কিন্নর, যোগতা, আরাবানি। ওই চারটি হল পেশা-গোষ্ঠী, চারটি গোষ্ঠীই দক্ষিণ এশিয়ায় নৃত্যগীত, শুভ অনুষ্ঠানে আশীর্বাদ দেওয়া ইত্যাদিতে যুক্ত, হিন্দু পুরাণ ও লোকগাথায় উল্লিখিত।

কিন্তু এই পেশা-গোষ্ঠীর বাইরেও বহু ‘ট্রান্স’ মানুষ আছে। ‘ট্রান্স’ মানুষ ডাক্তার, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী বা চাষি, শ্রমিক, ভিখারি হতে পারে। তাদের বিলের আওতায় আনা হল/ হবে না, যদি না তারা মেডিকাল সার্টিফিকেট জোগাড় করে। ‘ট্রান্স’ মানুষদের এক অংশ হল ‘ট্রান্স’ পুরুষ, যারা জন্মসূত্রে নারীলিঙ্গ পেয়েছিল, কিন্তু মনে জেনেছে যে তারা পুরুষ। তাদের ধর্ষণ করে আত্মীয়পুরুষ, ‘শোধরানো’-র জন্য। এর সমাধান নতুন আইনে স্বভাবতই নেই। মেডিক‌্যাল সার্টিফিকেট যদি আবশ্যিক হয়, তবে বাড়বে সেক্স রি-অ্যাসাইনমেন্ট সার্জারির প্রবণতা। তা নিরাপদ? নিরাপদ হলেও তা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত নয়। এমনকী, ডাক্তারেরও অধিকার নেই কোনও চিকিৎসা পদ্ধতিতে অংশ নিতে কাউকে বাধ্য করার। এ-কথা অনস্বীকার্য যে, অস্ত্রোপচারে লাভ পুঁজিবাদেরও। সামাজিক অবহেলা না থাকলে, প্রেমাস্পদ মন-শরীরসুদ্ধ ভালবাসলে, হয়তো অনেক ট্রান্স মানুষ ‘ছেলে’ বা ‘মেয়ে’-র খোপে পড়ার জন্য আকুল হয়ে সার্জারি করাত না৷ যারা আর্থিক বা অন্য কারণে সার্জারি করাবে না, তাদের ‘স্বীকৃতি’ দেওয়া ও না-দেওয়ার ক্ষমতা থাকল রাষ্ট্রের হাতে। রাজ্য সরকারগুলির ভূমিকাও খুব প্রশংসনীয় নয়। ‘নালসা’ রায়ে সব সরকারি কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাক্ষেত্রে ১% সিট সংরক্ষণের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কর্নাটক ছাড়া দেশে আর কোথাও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

লিঙ্গ পরিচয়কে দুই বা তিন ভাগে আসলে ভাঙা যায় না। অনেকে নিজেদের ‘নন-বাইনারি’ বলে, কারণ ‘ছেলে’ বা ‘মেয়ে’ কোনও খোপে পড়তে চায় না। এর সঙ্গে যৌনতাবোধ (হোমো, হেটেরো, বাই, প্যান) জুড়লে আরও নানা পারমুটেশন-কম্বিনেশন তৈরি হয়। সবটা মিলে ‘জেন্ডার ফ্লুয়িডিটি’ বা ‘লিঙ্গ তারল্য’-র ধারণা। এর কোনও কিছুই অ-স্বাভাবিক, অ-প্রাকৃতিক নয়। বড়জোর ‘সিস’-‘হেটেরো’ সম্পর্ক বংশবিস্তারের সুবিধের কারণে অভিযোজনে বেশি নির্বাচিত। কিন্তু মানব সমাজ শুধুই অভিযোজনের নিয়ম মেনে চলে না, সেখানে স্বাধিকারের মূল্য থাকে। শক্তিশালী সেখানে দুর্বলকে ছিঁড়ে খেলে আইনত দণ্ডিত হয়। ট্রান্স-সিস,
হোমো-হেটেরো নির্বিশেষে প্রত্যেকেই সেখানে সমানাধিকার পাবে, এটা কাঙ্ক্ষিত। সেই স্বাভাবিক মানবাধিকার সারা পৃথিবী জুড়েই খর্ব হচ্ছে দক্ষিণপন্থার প্রকোপে। নতুনভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প তড়িঘড়ি ট্রান্সবিরোধী কিছু নীতি গ্রহণ করেছিলেন। অন্য দেশেতেও, বিশেষ করে যেখানে দক্ষিণপন্থী সরকার ক্ষমতাসীন, (যেমন ভারত) এই ট্রান্স-বিরূপতার প্রভাব পড়ছে।

এই খাঁড়া আবার নেমে এসেছে এমন সময়, যখন ট্রান্স মানুষরা ‘এসআইআর’-এ জর্জরিত। রূপান্তরকামী সম্প্রদায় এসআইআর-এ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়গুলির মধ্যে পড়ে। এহেন সাঁড়াশি আক্রমণের চাপে যখন ভারতের রূপান্তরকামী সমাজ, তখন ‘সিস’ মানুষ কীভাবে সমমর্মী নাগরিক ভূমিকা পালন করে, সেটাই এখন দেখার।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক মানবাধিকার কর্মী

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement