ভাষার ‘শ্লীল’-‘অশ্লীল’ থাকতে পারে সামাজিক রুচির বিচারে, কিন্তু ‘শুদ্ধ’-‘অশুদ্ধ’ নেই, অন্তত মুখের নিজের ভাষায়। ভোটপ্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী যে ‘শুদ্ধ’ বাংলার অস্তিত্ব সংকটে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন, তার বৈজ্ঞানিক নিরিখটি ঝাপসা থেকে গেল। এক শ্রেণির ‘অনুপ্রবেশকারী’ নিয়েও তিনি চিন্তিত। ‘অনুপ্রবেশকারী’ মানে কি শুধু বাংলাদেশি মুসলমান? লিখছেন পবিত্র সরকার।
মানুষের সভ্যতা অনেক দিন আগেই একটা ছোট্ট সমীকরণ তৈরি করেছে অভিধানে, সাধারণ বাংলা অভিধানে, তা ঠিক এভাবে লেখা না-থাকলেও অনেকেই সেটা মানে। সেই সমীকরণ হল, ‘অনধিকার চর্চা = মূর্খতা’। যে যা জানে না, বা, যেটা যার জানার এলাকা নয়, যেটা বলতে অল্পবিস্তর বিশেষজ্ঞের অভ্যাস লাগে, সেটা বলতে যে-সে এগিয়ে আসে, আর-এক শ্রেণির লোকের কাছে হাসির খোরাক হয়।
না, প্রত্যেকে ‘যে-সে’ লোক নয়, তাঁদের মধ্যে দেশের প্রধানরাও আছেন। বিশেষ করে মন্ত্রী-সান্ত্রীরা হইহই করে আছেন। অন্য সময় না হোক, নির্বাচনের আগে আগে তাঁদের, যাকে রকের ভাষায় আমরা ‘এনথু’ বলি, তা পালাজ্বরের মতো বেড়ে যায়, এবং তাঁদের মুখ থেকে অন্তহীন অসার আর ভ্রান্ত জ্ঞান নির্গত হতে থাকে। তাতে তাঁদের নির্জ্ঞান ভক্তের দল হয়তো মুগ্ধ হয়, কিন্তু আমরা কিছু লোক স্তম্ভিত হয়ে থাকি এই সাবলীল অজ্ঞতার উচ্চারণ দেখে।
কথাটা হচ্ছে ‘ভাষা’ নিয়ে। আমরা তার অল্পস্বল্প দোকানদারি করি বলে বিনীতভাবে জানি যে, তা সকলের সম্পত্তি, কিন্তু সকলের চর্চা আর জ্ঞানের বিষয় সহজে হয় না। ‘কথা’ আমরা সবাই বলি, কেউ ধীরে কেউ তেড়ে, কেউ মৃদুস্বরে কেউ চেঁচিয়ে, কেউ অন্তরঙ্গ, কেউ নাটকীয় স্বরে, কিন্তু ‘ভাষা নিয়ে’ কথা বলতে গেলে একটুআধটু অধিকারচর্চা লাগে, জিনিসটার আগাপাশতলা ভিতর-বাহির বুঝতে হয়, না হলে, ওই রকের ভাষায় বলি, ‘মাল ক্যাচ’ হওয়ার সম্ভাবনা।
কিন্তু নির্বাচনের মুখে রাজনীতিকরা কি সেটা শোনেন? ফলে তাঁরা ভুল জায়গায় পা ফেলেন আর আমাদের মতো ছেঁদো লোককে সুযোগ করে দেন, তাঁদের দিকে গুলতি ছোড়ার। আশা করি এ গুলতি তাঁদের লাগবে না। গোলিয়াথদের ভয় করবেন তাঁরা, তাহলে তাঁদের ডেভিড-জন্মই বৃথা।
২
এবার এসব ভ্যানতাড়া ছেড়ে আসল কথায় আসি। আমাদের ‘মান্নীয়’ প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদিজিনে সম্প্রতি বাংলা ভাষার বিশুদ্ধি নিয়ে খুব দুর্ভাবনায় পড়েছেন আর নানা জায়গায় তা বলেও বেড়াচ্ছেন। এই নির্বাচনের আগে গত ১০-১২ বছরে তাঁকে বাংলা ভাষা নিয়ে এমন আশঙ্কিত বলে মনে হয়নি। একবার তিনি বাংলায় ‘ইস্তাহার’ কথাটির ব্যবহার দেখে কম্পিত হয়েছেন, এ কথা না জেনে যে তাঁর গুরু, যাঁকে তিনি আদর করে ‘বঙ্কিমচন্দ্রদা’ বলেন, তিনিই ১৮৯২ নাগাদ সংস্কৃত ‘বিজ্ঞাপন’ কথাটার জায়গায় ‘ইশতিহার’ কথাটা ব্যবহার করতে সুপারিশ করে গিয়েছেন লেখায়। আবার এই সেদিন (১৬ এপ্রিল, ’২৬) তারিখে পশ্চিম মেদিনীপুরে শালবনিতে এক বক্তৃতায় বাংলা ভাষা বিকৃতভাবে বলা হচ্ছে বলে বিপুল আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী, এবং বিজেপির বুথ সভাপতি না কাকে ‘শুদ্ধ’ বাংলা রেকর্ড করে প্রত্যেককে শোনানোর দায়িত্ব দিয়েছেন। আর বাংলা ভাষা ‘বিকৃত’ হওয়ার দায় তিনি ঠেলেছেন অনির্দিষ্ট ‘অনুপ্রবেশকারী’দের ঘাড়ে, যাদের চিহ্নিত করার জন্য তঁার সরকার পাগল হয়ে ময়দানে নেমেছে, এসআইআর, সিএএ কত কী কলকব্জা বানিয়ে। সেই জালে বহু শতাব্দীর জন্মগত ভারতীয় নাগরিকও ছটফট করছে।
আমাদের ‘মান্নীয়’ প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদিজিনে সম্প্রতি বাংলা ভাষার বিশুদ্ধি নিয়ে খুব দুর্ভাবনায় পড়েছেন আর নানা জায়গায় তা বলেও বেড়াচ্ছেন। এই নির্বাচনের আগে গত ১০-১২ বছরে তাঁকে বাংলা ভাষা নিয়ে এমন আশঙ্কিত বলে মনে হয়নি।
এখন প্রশ্ন হল, ‘শুদ্ধ’ বাংলা বলতে মোদিজি কী ঠিক বোঝেন? নিশ্চয়ই আরও অনেক বাঙালির মতো যাকে আমরা ‘মান্য চলিত’ (বাংলাদেশে ‘প্রমিত’) বাংলা বলি, তা-ই বোঝেন? বাঙালি ‘লেখাপড়া-জানা’ লোকেরা ভদ্র আর আনুষ্ঠানিক কথাবার্তায় যেটা বলে, দু’-বাংলাতেই? যা রেডিও টেলিভিশনে বলা হয়, ক্লাসঘরে শিক্ষক যেটা বলার আর ছাত্রদের যেটা শেখানোর চেষ্টা করেন? যার একটা লেখার রূপ আছে, যাতে বই আর এখন খবরের কাগজ ছাপা হয়?
এই ‘Standard Colloquial Bangla’ কি ‘শুদ্ধ বাংলা’?
আজ্ঞে না, প্রধানমন্ত্রীজি, ভাষাবিজ্ঞান মোটেই তা বলে না। বরং বলে, এটা বাংলা ভাষার অসংখ্য রূপের মধ্যে একটি রূপ, যা সবাই বললে বা পড়ালেখা করা লোকেরা লিখলে সমস্ত প্রান্তের বাঙালিদের বুঝতে সুবিধে হয়। এটি উনিশ শতক থেকে কলকাতার আশপাশের গঙ্গাপাড়ের বাংলাগুলির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, কিন্তু গড়ে উঠেছে কলকাতায়, রাজধানীতে, কারণ এখানেই বাংলার নানা অঞ্চলের লোকেরা এসে আস্তানা নিয়েছিল। পরস্পরের সঙ্গে কথাবার্তা আর যোগাযোগ সহজ করার জন্য তারা এই ভাষাটাকে গড়েপিটে গ্রহণ করেছিল। যে ভৌগোলিক অঞ্চলের লোক কলকাতায় বেশি ছিল, তাদের ভাষার উপর ভিত্তি করে। কিন্তু অন্য জায়গার জিনিসও ঢুকিয়েছে। যেমন ‘খেলুম’, ‘গেলুম’-কে উৎখাত করে পুব বাংলার ‘খেলাম, গেলাম’। ঘরে তারা বলেছে নিজেদের অঞ্চলের ভাষা; কিন্তু বাইরে, লেখাপড়ায়, সাহিত্যে, আইনে, সরকারি প্রচারে– ক্রমে এই ‘মান্য’ বা ‘প্রমিত’ বাংলা ছড়িয়ে গিয়েছে– এটা সবচেয়ে বিস্তৃত আর পরাক্রমশালী বাংলা হয়ে উঠেছে। অন্য অঞ্চলের বাঙালিরা অনেকে ঘরের ভাষা ছেড়ে এখন এই ভাষা ধরেছে, আবার কেউ দুটোই পাশাপাশি রক্ষা করেছে, দুই বাংলাতেই। এই ‘মান্য’ বাংলাকে ‘শুদ্ধ’ বাংলা বলার কোনও মানে হয় না, তা হলে অন্য বাংলাগুলিকে ‘অশুদ্ধ’ বলে জাতে নামিয়ে দিতে হয়। বিজ্ঞান সে-ব্যবস্থা অনুমোদন করে না।
৩
‘অন্য’ বাংলা মানে? সেগুলি ঘরের বাংলা, যে-বাংলা আমরা জন্মের পর ঘরে প্রথম শিখি। আসল প্রথম ভাষা আমাদের। পুরুলিয়ার বাংলা, মেদিনীপুরের বাংলা, হাওড়ার বাংলা থেকে খুলনা-বরিশাল চট্টগ্রামের বাংলা, যা আমরা অনেকেই বুঝতেও পারি না। আবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে কোচবিহার পর্যন্ত নানা বাংলা। কিংবা তারও মধ্যে অনেক ভিন্ন ভিন্ন বাংলা, যেগুলিকে আমরা ‘ডায়ালেক্ট’ বা ‘উপভাষা’ বলি। তার সঙ্গে মিশে যায় সমাজে আমি
যে-শ্রেণিতে বাস করি তার বৈশিষ্ট্য, আমি নারী না পুরুষ, শ্রমিক না অধ্যাপক তার বৈশিষ্ট্য। সেটাও একটা বাংলা হয়ে ওঠে। এগুলি কি অবৈধ বাংলা, ওই মান্য বাংলাটাই বৈধ বা শুদ্ধ বাংলা? একেবারেই নয়।
সব বাংলা, যেখানে যা বলা হয়, বিজ্ঞানের মতে সমান ‘শুদ্ধ’ বা ‘বৈধ’। শুধু মান্য বা প্রমিতটা অনেক ব্যাপকভাবে বাঙালিদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করা হয়, এই যা তফাত। মোদিবাবু যে শালবনি অঞ্চলে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, সেখানকার, এবং ব্যাপকভাবে অখণ্ড মেদিনীপুরের মানুষ এক সময় ‘শ’ বলতে পারত না। একটু দক্ষিণে গেলে তিনি শুনতেন, ‘কোথা যাউঠু বাপু?’ মানে, কোথায় যাচ্ছ বাপু? তা, আমাদের মতে, সেগুলিও শুদ্ধ বাংলা, যেমন ঢাকার
‘এক্কই চরে দাত কয়খানা ফালাইয়া দিমু’ বা সিলেটের ‘বালা নি?’ (কেমন আছ) শুদ্ধ বাংলা।
ভাষার ‘শ্লীল’-‘অশ্লীল’ থাকতে পারে সামাজিক রুচির বিচারে, কিন্তু ‘শুদ্ধ’-‘অশুদ্ধ’ নেই, অন্তত মুখের নিজের ভাষায়। লেখার ভাষায় বা অন্যের ভাষা বলতে বা লিখতে গিয়ে বানান বা ব্যাকরণ অশুদ্ধ হতে পারে। মান্য ভাষা আছে, যা প্রত্যেককে শিখতে হয় নানা সুবিধার জন্য। এটা মোদিজিকে যেমন বুঝতে হবে তেমনই অনেক বাঙালিরও হয়তো বোঝা দরকার।
‘অন্য’ বাংলা মানে? সেগুলি ঘরের বাংলা, যে-বাংলা আমরা জন্মের পর ঘরে প্রথম শিখি। আসল প্রথম ভাষা আমাদের। পুরুলিয়ার বাংলা, মেদিনীপুরের বাংলা, হাওড়ার বাংলা থেকে খুলনা-বরিশাল চট্টগ্রামের বাংলা, যা আমরা অনেকেই বুঝতেও পারি না।
৪
মোদিজি আর-একটা ক্যাচাল করেছেন বাংলা ভাষার এই ‘অশুদ্ধীকরণের’ জন্য অস্পষ্ট একটি দল ‘অনুপ্রবেশকারী’দের দায়ী করে। এই ‘অনুপ্রবেশকারী’ কথাটাকে যদি ভাঙচুর করি, আধুনিক আঁতেল ভাষায় যাকে বলে ‘বিনির্মাণ’, তাহলে এর নানারকম অর্থ হতে পারে। মোদিজির দলের কাছে প্রিয় অর্থ বুঝি হবে: ‘বাংলাদেশ থেকে এর মধ্যে ঢুকে পড়া মুসলমান জনসংখ্যা।’ হিন্দু জনসংখ্যাও কিছু ঢুকেছে। আমি জানি না, সম্ভবত কেউ জানে না, মোদিজির ‘শুদ্ধ’ বাংলাকে তারা কোথায় কতটা নষ্ট করতে পেরেছে। এই অনুপ্রবেশকারীরা, ‘অবৈধ’ হলে, কোথায় কথাটা ঢুকে পড়েছে তা জানা এবং তাদের আটকানো কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের দায়িত্ব। কাজেই অনুপ্রবেশকারীরা যদি বাংলা ভাষার উচ্চারণ ও প্রকাশকে বিকৃত করে থাকে, তার মূলে কেন্দ্রীয় সরকারের অক্ষমতা, তারা আমাদের সীমান্তকে দুর্ভেদ্য করে তুলতে পারেন। সেটা মোদিজি স্বীকার করবেন কি না জানি না।
আর শুধু বাংলাদেশের ‘অনুপ্রবেশকারী’ নয়, পশ্চিমবঙ্গে ভারতের অন্যন্য অঞ্চল– বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাব, ওড়িশা থেকেও প্রচুর মানুষ আসে জীবিকার খোঁজে, এসে পশ্চিমবাংলার ‘স্থায়ী’ অধিবাসী হয়ে যায়। তারা বাংলার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে হয়তো, সংস্কৃতিকে বৈচিত্রও দেয়। মোদিজির তত্ত্বানুসারে, তাদের দ্বারাও বাংলা ভাষার দূষণ হওয়ার যে-সম্ভাবনা, সে বিষয়ে তিনি কি সচেতন? এ বিষয়ে তাঁর অন্তর্দৃষ্টির একটু আভাস পেলে আমরা খুশি হতাম।
আমরা অবশ্য বাংলা ভাষার দূষণে ইংরেজি-মাধ্যম মুগ্ধ বাঙালির অবদানের কথাও কিছু ভাবি, মোদিজির অর্জুনের দৃষ্টি তাও এড়িয়ে গিয়েছে। শুধু ‘অনুপ্রবেশকারী’ তাঁকে তাড়না করে বেড়াচ্ছে। তাঁর কষ্টের কথা ভেবে আমাদেরও কষ্ট হয়। থালাবাসন বাজিয়ে বা অযোধ্যার রামমন্দিরে পুজো দিয়ে ‘অনুপ্রেশকারী’-দের তাড়ানো যায় না?
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাক্তন উপাচার্য,
রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়
pabitra37@gmail.com
