একটি ল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মেয়েদের পোশাকের সঙ্গে যৌন হেনস্তার সম্পর্ক জুড়লেন। আইনি মানুষের বেআইনি বক্তব্য প্রাসঙ্গিক?
মহিলা সংরক্ষণ বিল সংসদে পাস না হওয়া নিয়ে অলীক কুনাট্য রঙ্গ চলছে দেশে। সব দলই নিজস্ব ন্যারেটিভ তৈরিতে ব্যস্ত। এমন একটা ভাব যেন, প্রতিটি দলই মহিলা উন্নয়নের সেরা ধ্বজাধারী! কিন্তু বাস্তবে দু’-একটি রাজনৈতিক দল বাদে দেশের মহিলারা বাকিদের কাছে শুধুই ‘ভোটার’। তাদের নেতৃত্বে আনা বা আইনসভায় প্রতিনিধি করে পাঠানোর ক্ষেত্রে কাজ করে চূড়ান্ত অনীহা।
মহিলা সংরক্ষণ বিল পাস হলে ৩৩ শতাংশ আসন বাধ্যতামূলকভাবে মেয়েদের জন্য বরাদ্দ রাখতে হত। কিন্তু বর্তমান আইনে তো কোথাও মহিলাদের জন্য ‘ঊর্ধ্বসীমা'’ নির্দিষ্ট করা নেই।তাহলে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলি সে পথে হঁাটে না কেন– যেখানে মহিলা-পুরুষ ভোটারের হার প্রায় সমানুপাতিক, মেয়েদের ‘অর্ধেক আকাশ’ বলে ব্যঞ্জনায় ভূষিত করা হচ্ছে?
এর কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের দু’-মুখো অবস্থান। যতই ঢেকে রাখা হোক না কেন, চোখে পড়বেই। মহিলাদের দুর্বল ভাবা, তাদের ছোট করা– এ এক ধরনের অত্যাচার। আবার মহিলাদের উন্নয়ন, তাদের সাফল্যের গল্পকেও নিজেদের সহায়তার মোড়কে পেশ করে আদতে নিজের পিঠ চুলকানোর রসদ খোঁজে পুরুষতন্ত্র। আর আছে স্বঘোষিত ‘জ্যাঠামশাই’য়ের দল– যারা, মেয়েরা কীভাবে বিপদে পড়ে, এইসব ঘটনায় তারা কতটা দায়ী, সেসব প্রমাণে সদা ব্যস্ত।
মহিলাদের দুর্বল ভাবা, তাদের ছোট করা– এ এক ধরনের অত্যাচার। আবার মহিলাদের উন্নয়ন, তাদের সাফল্যের গল্পকেও নিজেদের সহায়তার মোড়কে পেশ করে আদতে নিজের পিঠ চুলকানোর রসদ খোঁজে পুরুষতন্ত্র।
যেমন– তামিলনাড়ু ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য, যিনি মেয়েদের পোশাকের সঙ্গে যৌন হেনস্তা, শ্লীলতাহানির সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছেন। তঁার মতে, কিছু মেয়ে শর্টস বা ‘ছোট প্যান্ট’ পরে বলে ছেলেরা শ্লীলতাহানি করে। ভাবা যায়! একবিংশ শতকে দঁাড়িয়ে একজন শিক্ষিত মানুষ এই ধরনের মন্তব্য করছেন! তার উপর তিনি আবার আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে আসীন– যঁার স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত যে, পোশাকের সঙ্গে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, যৌন হেনস্তার মতো অপরাধের যোগ আইনি ব্যাখ্যায় থাকতে পারে না। নারীদের ব্যক্তি-স্বাধীনতা, পছন্দ-অপছন্দ তাদের নিজস্ব অধিকার। কে কী পরবে, কী খাবে, বা কার সঙ্গে, কখন ঘুরবে– তা এই জ্যাঠামশাইরা ঠিক করে দিতে পারে না। এমনকী, এই সমাজও না। বেআইনি কিছু করলে অবশ্যই পুলিশ-প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু সেটা আইন মেনে। সমাজের কিছু মানুষের তথা পুরুষের (এবং অবশ্যই পুরুষতন্ত্রের ধ্বজাবাহী নারীদেরও) বস্তাপচা ভাবনা আর আইন এক নয়।
তামিলনাড়ু ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য, যিনি মেয়েদের পোশাকের সঙ্গে যৌন হেনস্তা, শ্লীলতাহানির সম্পর্ক জুড়ে দিয়েছেন। তঁার মতে, কিছু মেয়ে শর্টস বা ‘ছোট প্যান্ট’ পরে বলে ছেলেরা শ্লীলতাহানি করে। ভাবা যায়!
একটা সময় গুহাবাসী সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মহিলাদের উপর জোর খাটাত পুরুষরা। যুদ্ধজয়ের পর বিজয়ীদের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য হত মহিলারা। রাজারাজড়াদের ‘ভেট’ হিসাবে পাঠানো হত। আমরা সম্ভবত এখনও সেই মানসিকতা বয়ে চলেছি। সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের প্রান্তর হোক, বা ইসলামিক স্টেটের অন্দরমহল বা তামিলনাড়ুর নামী আইন বিশ্ববিদ্যালয়– তফাত নেই। উপাচার্য নাগরাজ ক্ষমা চাইবেন কি না জানা নেই। তবে আধুনিক, শিক্ষিত মানুষের অন্তত লজ্জা পাওয়া উচিত।
