shono
Advertisement
Asha Bhosle

আশা-কণ্ঠে ‘বাবা’ আলাউদ্দিনের বন্দিশ

আলি আকবর খাঁ সে-ছবিতে সংগীত পরিচালক ও সুরকার হিসাবে কাজ করেন। বন্ধুত্ব বজায় রেখেছিলেন তাঁরা। আলি আকবর খাঁ সাহেব যখন বম্বেতে (অধুনা মুম্বই) বাজাতেন, তখন রাহুলদেব বর্মণ ও আশা ভোঁসলে তাঁর অনুষ্ঠান শুনতে যেতেন।
Published By: Kishore GhoshPosted: 01:00 AM Apr 21, 2026Updated: 01:01 AM Apr 21, 2026

আলি আকবর খাঁ সাহেবের বরাবর ইচ্ছা ছিল, পিতৃদেব আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের কাছে যেসব গানের তালিম পেয়েছিলেন, তার ঝলক, নিদর্শন রূপে কোনও বড় সংগীতশিল্পীকে দিয়ে গাইয়ে রেকর্ড করে রাখবেন। আশা ভোঁসলে সে কাজটি করেন। এর জন্য আমেরিকা গিয়ে ‘বাবা’র কাছে মার্গসংগীতের তালিম নিয়েছিলেন। লিখছেন অনন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়।

Advertisement

১৯৯৫ সালের আগস্ট মাসে ভারতের দু’জন অগ্রগণ্য সংগীতজ্ঞ আলি আকবর খাঁ ও আশা ভোঁসলে একটি ঐতিহাসিক সহযোগিতার প্রস্তুতি নিতে মিলিত হন। পরিচালক চেতন আনন্দের ‘আঁন্ধিয়া’ (১৯৫২) ছবিতে কাজ করার সময় প্রথমবার তাঁদের দেখা হয়। এরপর থেকে তাঁদের পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। আশা ভোঁসলে এবং তাঁর বড় বোন লতা মঙ্গেশকর– সেই ছবিতে ‘প্লেব্যাক’ গায়িকা রূপে ছিলেন। আলি আকবর খাঁ সে-ছবিতে সংগীত পরিচালক ও সুরকার হিসাবে কাজ করেন। বন্ধুত্ব বজায় রেখেছিলেন তাঁরা। আলি আকবর খাঁ সাহেব যখন বম্বেতে (অধুনা মুম্বই) বাজাতেন, তখন রাহুলদেব বর্মণ ও আশা ভোঁসলে তাঁর অনুষ্ঠান শুনতে যেতেন।

আলি আকবর খঁা সাহেবের বরাবরের ইচ্ছা ছিল, পিতৃদেব আলাউদ্দিন খঁা সাহেবের কাছে যেসব গানের তালিম তিনি পেয়েছিলেন, তার ঝলক, নিদর্শন রূপে কোনও বড় গায়ক বা গায়িকাকে দিয়ে গাইয়ে রেকর্ড করে রাখবেন। তিনি ভারতের দুই বিখ্যাত গায়কদকে দিয়ে সেটা করানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কোনওভাবে সফল হননি, বা মনের মতো হয়নি, কারণ তঁারা আলি আকবর খঁা সাহেবের শেখানো গানগুলো নিজের মতো করে গেয়েছিলেন।
১৯৯৪ সালে বম্বের এক অনুষ্ঠানে আশাজি আসেন। খঁা সাহেবের সঙ্গে গ্রিনরুমে দেখা করতে যান। সেখানে তঁাদের মধ্যে অনেক কথাবার্তা হয়। খঁা সাহেবের কাছে, এমনকী, আশাজি গান শেখার ইচ্ছা পর্যন্ত প্রকাশ করেন। খঁা সাহেব তাতে প্রীতমনে রাজি হন, এবং আশাজিকে আমেরিকায় তঁার কাছে গিয়ে শেখার আমন্ত্রণ জানান।

আলি আকবর খাঁ সাহেবের বরাবরের ইচ্ছা ছিল, পিতৃদেব আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের কাছে যেসব গানের তালিম তিনি পেয়েছিলেন, তার ঝলক, নিদর্শন রূপে কোনও বড় গায়ক বা গায়িকাকে দিয়ে গাইয়ে রেকর্ড করে রাখবেন।

১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আশাজি আমেরিকায় গেলেন। অন্যান্য বছরের মতো আমিও তখন খঁা সাহেবের (আমি ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করতাম) কাছে থেকে তালিম নিচ্ছিলাম। ৫ সেপ্টেম্বর রাতে, ‘বাবা’, আমাকে ফোন করে বললেন যে, আগামী কাল অর্থাৎ ৬ সেপ্টেম্বর, তাড়াতাড়ি তঁার বাড়ি যেতে, কারণ আশা ভোঁসলে তঁার কাছে দুপুরে খাবেন। তঁার জন্য রান্না করতে হবে, আর আমাকেও হাত লাগাতে হবে ‘বাবা’-র সঙ্গে। আমি খুব সকাল সকাল তঁার বাড়ি পৌঁছতেই তিনি আমাকে নিয়ে বাজার গেলেন মাছ, মাংস ও সবজি কিনতে। সেদিন ‘বাবা’ তঁার বিখ্যাত মুসুরির ডাল, ক্যাট ফিশ, ও মুরগির মাংস রেঁধেছিলেন। আমি রেঁধেছিলাম আলু-ফুলকপির ডালনা। আশাজি পরম তৃপ্তি করে খেয়েছিলেন। আর, বাবা ও আমার কাছে ডাল ও ‘আল-ফুলকপি’-র ডালনার রেসিপি জেনে নিয়েছিলেন। আমার করা ‘আল-ফুলকপি’র ডালনা অনেকটা খেয়েছিলেন, তার কারণ, সব রান্নাতেই আমি অল্প-বেশি মিষ্টি দিয়ে থাকি, আর সেদিনও দিয়েছিলাম। আর সেই স্বাদটা তঁার খুব পছন্দ হয়েছিল। ‘বাবা’ মজা করে বলেছিলেন, ‘খাইয়ে, খাইয়ে অউর খাইয়ে, কলকাতা কা বাঙ্গালিবাবুকা বনা হুয়া সবজি খাইয়ে।’

সেদিন সকাল থেকে দুপুরের খাওয়া অবধি কাজের কথা ছাড়াও হাসি-ঠাট্টা, জোক্‌স। বিরাট আড্ডা হয়েছিল ‘বাবা’-র বসার ঘরে বসে। খেতে যাওয়ার আগে ‘বাবা’-র ট্রেডমিলে আশাজি কিছুক্ষণ কসরত করলেন, আর বলেছিলেন– ভাল করে খেতে হবে তো, তাই একটু ব্যায়াম করে নিলাম। আমি সেই দৃশ্যের ছবিও তুলে রেখেছিলাম। সেই দিনটা ছিল আবার আলাউদ্দিন খঁা সাহেবের মৃত্যুদিন, সেটা জেনে আশাজি যে-ফুল এনেছিলেন, তা আলাউদ্দিন খঁা-র ছবিতে সমর্পণ করে ভক্তিপূর্ণভাবে প্রণাম করেছিলেন। ‘বাবা’-র ইচ্ছা অনুযায়ী, আশাজি ১৯৯৫ সাল থেকে তঁার কাছে গান শিখতে শুরু করেন রীতিমতো নাড়া বেঁধে। নাড়া বঁাধার পর থেকে ‘খঁা সাহেব’-এর বদলে ‘বাবা’ ডাকা শুরু করেন। ‘বাবা’ তঁাকে আলাউদ্দিন খঁা সাহেবের শেখানো বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর উপর আধারিত নানা বন্দিশ শিখিয়েছিলেন। আমার দু’-একবার সৌভাগ্য হয়েছিল, সেই তালিম শোনার, কারণ আশাজি চাইতেন না কারও সামনে শিখতে। সেই সময় ‘বাবা’-র কলেজে ভারতবিখ্যাত একজন গায়কের একজন জনপ্রিয় ছাত্রী গান শেখার জন্য এসেছিলেন। তিনি ‘বাবা’-কে অনুরোধ করেছিলেন যে, তঁাকে যদি একটু সুযোগ দেওয়া হয় আশাজির তালিম শোনার। ‘বাবা’ সরল মনে ‘হঁ্যা’ বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘরে ওই গায়িকার উপস্থিতি আশাজির পছন্দ না-হওয়ায় তিনি ‘বাবা’-কে বলেছিলেন যে, আজ শরীরটা জুতের নেই। পরে অবশ্য ‘বাবা’-কে উনি ফোন করে বলেছিলেন, আপনার ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে শিখতে অসুবিধা নেই– কিন্তু বাইরের কারও সামনে উনি শিখবেন না।

১৯৯৬ সালে বাবার শেখানো বন্দিশগুলি নিয়ে একটি রেকর্ড বের হয় ‘LEGACY’ নামে, তাতে আশাজির গানের সঙ্গে সরোদ বাজিয়েছিলেন আমার ‘গুরুবাবা’, আর তবলায় ছিলেন স্বপন চৌধুরী। ফাইনাল রিহার্সালের আগে উনি আমাকেও অনুমতি দেননি উপস্থিত থাকতে। তবে তার আগের রিহার্সাল যে-ক’টি শুনেছিলাম, তাতে দেখে আশ্চর্য হয়ে যাই– উনি কী সহজে এবং কত তাড়াতাড়ি কঠিন-কঠিন বন্দিশ সাবলীলভাবে তুলে নিচ্ছেলেন! শুনে হচ্ছিল যে, সারা জীবন উনি ওসব বন্দিশেরই চর্চা করেছেন।

পরে, ‘বাবা’ আমাদের বলেছিলেন লতা ও আশা– দুই বোনই অসম্ভব দক্ষ শিল্পী। লতা তঁার কাছে টেলিফোনে গান শিখে ‘অঁান্ধিয়া’ ছবিতে গেয়েছিলেন। আশা তঁার সামনে বসে গান শিখেছেন, তবে তঁার মতে, লতাজির থেকেও আশাজি অনেক বড় বহুমুখী প্রতিভা: ‘Asha was more versatile than Lata’.

(মতামত নিজস্ব)
লেখক সংগীতজ্ঞ

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement