shono
Advertisement
Ram Mandir

রাম মন্দিরে অনুদান চুরি! 'ভক্তি'-র পাঠ লাইনচ্যুত?

অযোধ্যার রামমন্দির থেকে বিপুল পরিমাণে অর্থ-ধনসম্পদ লুট হওয়া নিয়ে কেবল উত্তরপ্রদেশ সরকারই নয়, সরগরম দেশের রাজনীতি। রাম-কোষে লুট তো রাজকোষে চুরির শামিল! তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী কেন মৌন?
Published By: Kishore GhoshPosted: 05:50 PM Jul 01, 2026Updated: 05:50 PM Jul 01, 2026

মহিপাল সিংকে কেমন দেখতে, বয়স কত, কোথায় থাকেন, কী করছেন দেশবাসী জানে না। তবে সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা তিনি নিজেই জানেন না, ভাগ্যে কী লেখা আছে। আপাতত গৃহবন্দি। গুটিয়ে-সুটিয়ে রয়েছেন। কারণ, অজানা-অচেনা লোকজন তাঁকে প্রাণে মারার হুমকি দিচ্ছে।

Advertisement

এই দুর্দশার জন্য মহিপাল নিজেই দায়ী। ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর অ্যাকাউন্টস বিভাগের সুপারভাইজার হিসাবে তিনিই প্রথম মন্দিরের দানসামগ্রী চুরির অভিযোগ এনেছিলেন। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘হুইসলব্লোয়ার’, মহিপাল তেমনটাই। তাঁর অভিযোগ মন্দির কর্তৃপক্ষ অস্বীকারই শুধু করেনি, তাঁর চাকরিটাও খেয়ে নেয়। সেই থেকে মহিপাল সিং গৃহবন্দি। সাংবাদিকেরা চেষ্টা করেও তাঁর মুখ আর খোলাতে ব্যর্থ। তাঁর একটাই কথা: যতটুকু বলেছি ততটুকুই। বাড়তি একবর্ণও বলব না। হত্যার হুমকির মুখে আর কিছু বলতে পারব না।

সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে তদন্ত কমিটি গড়ার দাবিতে জনস্বার্থ মামলাও হয়েছে। অযোধ্যা বার অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, তাঁদের হয়ে কোনও উকিল দাঁড়াবেন না।

মহিপালের অভিযোগের রেশ ধরেই ৭ জুন অযোধ্যার ‘লুট’ প্রসঙ্গ সর্বজনীন করে তোলেন সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব। চারদিকে হইচই পড়ে যায়। সেই থেকে ‘সোপ অপেরা’-র মতো এই লুণ্ঠনকাহিনি দিন দিন ফুলেফেঁপে উঠছে। মন্দির পরিচালকেরা এক সময় যা ‘অবাস্তব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, এখন তা তাঁদের গলার ফাঁস। উত্তরপ্রদেশ সরকার বিশেষ তদন্ত কমিটি (সিট) গড়তে বাধ্য হয়েছে। ৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। ৮০ লাখ টাকা উদ্ধারও হয়েছে। যদিও অভিযোগ– শুধু টাকা নয়, দানপাত্রের সোনা-রুপোর গয়নাও বেপাত্তা। প্রকৃত লুট কত, তার হিসাবনিকেশই নাকি নেই। বিরোধীদের মতে, কয়েকশো কোটি!
মন্দির পরিচালনা সমিতির দুই চাঁই চম্পত রাই ও অনিল মিশ্র পদত্যাগ করেছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কেন এফআইআর করা হয়নি, কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি– উঠছে এসব প্রশ্ন।

সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে তদন্ত কমিটি গড়ার দাবিতে জনস্বার্থ মামলাও হয়েছে। অযোধ্যা বার অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, তাঁদের হয়ে কোনও উকিল দাঁড়াবেন না। দাঁড়ালে তাঁর ৫ লাখ টাকা জরিমানা হবে। আইনজীবীদের মত, তাঁরা-ই যত নষ্টের গোড়া। তিন দিনের মধ্যে তাঁদের অযোধ্যা ছেড়ে চলে যেতে হবে। নইলে জেলা অচল করে দেওয়া হবে।

শুধু উত্তরপ্রদেশ নয়, গমগম করছে গোটা দেশ। রাজনীতি উত্তাল। অথচ কেন্দ্রীয় সরকার এখনও নীরব! রাম-কোষে লুট রাজকোষে চুরির শামিল! ‘রাম মন্দির ট্রাস্ট’ তৈরি হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে, কেন্দ্রীয় সরকারের তদারকিতে। ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ১২ জনই সরকার-মনোনীত। রাম মন্দির নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সচিব নৃপেন্দ্র মিশ্র। সংসদের কাছেই প্রত্যেকের দায়বদ্ধতা। সরকার তা অস্বীকার করতে পারে না। তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী কেন মৌন? প্রশ্ন উঠছে, উত্তর নেই।

আন্দোলনকারীরা ‘দেশদ্রোহী, পাকিস্তানপন্থী, মার্কিন ধনকুবের সোর্সের দালাল’ বলে সহজে চিহ্নিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য ভারত সরকারকে দুর্বল করা। প্রধানমন্ত্রীকে হেয় করা। দেশের বদনাম করা।

উত্তর নেই আরও অনেক কিছুরই। ২০২৪ সালের পর এ বছরেও ‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হল। সিবিএসই-র ‘ঘোটালা’ ধরা পড়ল। অথচ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান দায় নেবেন না! ছাত্রসমাজ তাঁর পদত্যাগের দাবিতে মুখর। আরশোলা পার্টি যন্তর মন্তরে অবস্থান আন্দোলনে বসেছে। পরিবেশবিদ ও লাদাখের শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকও তাতে যোগ দিয়ে অনশন শুরু করেছেন। দিল্লি পুলিশ জল, খাবার ঢুকতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ। বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। সরকার ছাত্রদের সঙ্গে বসতে রাজি নয়। কেন? তারাই তো দেশের ভবিষ্যৎ।

কেন এত উপেক্ষা? ‘আমরা-ওরা’-তে ভাগাভাগি? ‘শত্রু-মিত্র’ চিহ্নিতকরণ? এই আবহে ধর্মেন্দ্র প্রধানের জন্মদিনে প্রধানমন্ত্রীর গদগদ অভিনন্দন বার্তা পাঠানোর কী প্রয়োজন ছিল? কী প্রমাণ করতে চাইলেন তিনি? সরকার ঠিক, আন্দোলনকারীরা ভুল? প্রশ্নগুলো উঠছে জোরালোভাবেই।

কথায় বলে, খারাপ সময়ে বিপদ চারদিক থেকে আসে। ‘নিট’-এর পর মহারাষ্ট্রে ফাঁস হল ‘টিচার এলিজিবিলিটি টেস্ট’ (‘টেট’) পরীক্ষার প্রশ্ন। ফাঁস হল পরীক্ষার ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে। যথারীতি পরীক্ষা বাতিল। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরে কেন্দ্র ও বিজেপিশাসিত রাজ্যে পাবলিক সার্ভিস কমিশন, ব্যাঙ্ক, পুলিশে চাকরির ও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি সংক্রান্ত অন্তত ৩০টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। আত্মঘাতী হয়েছেন শতাধিক। অ-বিজেপি রাজ্যেও এমন দুর্নীতি হচ্ছে না, তা নয়। পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ তো হাতেগরম। মজা হল, অবিজেপি রাজ্যে বিজেপি এ নিয়ে যত সক্রিয়, ডাবল-ইঞ্জিন রাজ্যে ততটাই তৎপর অভিযোগ ধামাচাপা দিতে। অভিযুক্তদের আড়াল করতে।

আন্দোলনকারীরা ‘দেশদ্রোহী, পাকিস্তানপন্থী, মার্কিন ধনকুবের সোর্সের দালাল’ বলে সহজে চিহ্নিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য ভারত সরকারকে দুর্বল করা। প্রধানমন্ত্রীকে হেয় করা। দেশের বদনাম করা। এই আখ্যান রচনায় বিজেপি এখনও পর্যন্ত অতি মাত্রায় সফল।
প্যাটার্নটা হল, প্রথমে কোনও নেতা বা দলের মুখপাত্র এমন মন্তব্য করবেন। কিংবা বিজেপির আইটি সেল সামাজিক মাধ্যমে একটা পোস্ট দেবে। তারপর সমস্বরে শুরু হবে অভিযোগের বিরোধিতা। গোটা ইকোসিস্টেম তেল খাওয়া মেশিনের মতো রে-রে করে উঠবে সুসমন্বিত ঐকতান বা ‘ওয়েল অর্কেস্ট্রেটেড সিম্ফনি’র মতো। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ১৬৮ একর জমি জলের দরে কেনার অভিযোগ উঠেছে। রাজ্য রাজনীতি তা নিয়ে উত্তাল।

রাম-কোষের ‘লুট’ প্যান্ডোরার বাক্স খুলছে কি? নইলে অযোধ্যার মতো মথুরাতেও শ্রীকৃষ্ণ জন্মস্থানের দান সামগ্রী ‘লুট’-এর অভিযোগ কেন তুলবেন সেখানকার সেবায়েত ‘ফলাহারি বাবা’? কেন সিবিআই তদন্তের দাবি জানাবেন?

কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী রাজস্থানের বিজেপি নেতা ভগীরথ চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তাঁরই মন্ত্রকের অধীনস্থ এক সংস্থা থেকে শসা চাষের জন্য প্রায় ১ কোটি টাকা অনুদান নিয়েছেন। লক্ষণীয়, বিজেপি দু’টি অভিযোগই ফুৎকারে উড়িয়ে বলেছে– কোথাও অনিয়ম হয়নি। দেশের কোথাও শাসক দলীয় কারও বিরুদ্ধে ইডি, সিবিআই, আয়কর বিভাগকে পা বাড়াতে দেখা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় সরকারের ভাগ্য ভাল বিরোধীরা ছন্নছাড়া। ঢাল তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার। কিন্তু ভাগ্যের চাকা কখন কোনদিকে ঘোরে কেউ জানে কি? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি ঘুণাক্ষরেও টের পেয়েছিলেন?

বিজেপিশাসিত রাজ্যে দুর্নীতির যত অভিযোগ উঠেছে, যার সঙ্গে দল বা সরকারের জড়িত থাকা নিয়ে চর্চা চলেছে, অযোধ্যার ‘রাম-কোষ’ কেলেঙ্কারি তা থেকে আলাদা। আলাদা এই কারণে, এই প্রথম কোনও চুরি বা লুটের অভিযোগ ‘মনগড়া, চক্রান্ত কিংবা বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে ওড়ানো হল না। বরং, কিছু যে একটা ঘটেছে তা ‘সিট’ গঠনের মধ্য দিয়ে স্বীকার করা হল। দ্বিতীয়ত, এই প্রথম ভগবানের সম্পদ চুরির অভিযোগ উঠল তাদের বিরুদ্ধে– যারা ‘হিন্দু ধর্মের ধারক ও বাহক’। এ-দেশে ঈশ্বরের সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ আগে যে ওঠেনি তা নয়। কেরলমের শবরিমালা মন্দিরের অর্থ তছরুপের তদন্ত চলছে। কিন্তু সেটা বিজেপিশাসিত রাজ্য নয়। অযোধ্যায় পুরুষোত্তম রামচন্দ্রর দানপাত্র লুটের লজ্জা বিজেপি কীভাবে ঢাকবে?

রাম-কোষের ‘লুট’ প্যান্ডোরার বাক্স খুলছে কি? নইলে অযোধ্যার মতো মথুরাতেও শ্রীকৃষ্ণ জন্মস্থানের দান সামগ্রী ‘লুট’-এর অভিযোগ কেন তুলবেন সেখানকার সেবায়েত ‘ফলাহারি বাবা’? কেন সিবিআই তদন্তের দাবি জানাবেন? বদ্রিধাম-কেদারনাথ মন্দির কমিটিই-বা কেন রাজনৈতিক নেতাদের জন্য মন্দিরের অর্থ নয়ছয়ের তদন্তে কমিটি গড়বে? যাঁকে অবলম্বন করে হিন্দুত্ববাদীদের ক্ষমতায় আরোহন, সেই ঈশ্বরই কি তবে তাঁদের পথের কাঁটা হয়ে উঠবেন?

প্রধানমন্ত্রী এখনও নীরব। তবে বিরোধীদের উদ্দেশে আদিত্যনাথ হুংকার দিয়েছেন, সনাতন মূল্যবোধ নিয়ে যাঁরা ছেলেখেলা করছেন, তাঁদের রেয়াত করা হবে না। আগামী বছর রাজ্য বিধানসভার ভোট। ক্ষমতার অলিন্দে রাজনৈতিক গুঞ্জন, অযোধ্যার অবগুণ্ঠনের আড়ালে দিল্লি-লখনউ রেষারেষি ও ক্ষমতার টানাপোড়েন নাকি প্রকট হচ্ছে!

(মতামত নিজস্ব)
saumyabandyo@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement