গৌরব তিওয়ারি। এমন এক নাম, যা বাদ দিলে এদেশের প্যারানর্মাল চর্চার আলোচনা সম্পূর্ণ হবে না। বলা যায়, শুরুই হবে না যেন। কেননা ২০১৬ সালে দেশের প্রথম প্যারানর্মাল ইনভেস্টিগেটরের মৃত্যু এমন এক প্রশ্নচিহ্নের জন্ম দিয়েছে, যা আজও একই রকমের উজ্জ্বল। অথবা যার সারা গায়ে আজও আশ্চর্য কুয়াশা জড়ানো। যাকে ঘিরে প্রতিনিয়ত পাক খায় সেই চিরকালীন প্রশ্ন। মৃত্যুর পরেও কি থাকে চেতনা? জীবনের ওপারেও কি থাকে অস্তিত্ব! ইহজগতের সঙ্গে তাদের সংস্পর্শে কি চকমকি পাথরের মতো জ্বলে ওঠে ফিরে আসার অদম্য আকাঙ্ক্ষা?
অভিরূপ ধরের 'ঘোস্ট হান্টার গৌরব তিওয়ারি' বইয়ে পাচ্ছি খোদ গৌরবের মনের কথা— 'মানুষের দ্বৈত সত্তা রয়েছে— একটি তার জাগতিক শরীর। অপরটি এক সূক্ষ্ম সত্তা, যার অভ্যন্তরে নিহিত থাকে তার ব্যক্তিত্ব ও চেতনা। এই সূক্ষ্ম সত্তাটিকে আত্মা, স্পিরিট বা ‘উচ্চতর সত্তা’-সহ নানা নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।' এই সূক্ষ্ম সত্তাকেই সারা জীবন বুঝতে চেয়েছেন গৌরব। ভুল... মাত্র বছর দশেক। ২১ বছর বয়সে ফ্লোরিডা যাওয়ার পরই জীবনটা বদলে যায় তাঁর। তিনি প্যারানর্মাল ও প্যারা সাইকোলজিতে আসক্ত হয়ে পড়েন। আর ২০১৬ সালে বাথরুমে রহস্যময় মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স মাত্র ৩১! সেই হিসেবে মাত্র এক দশক তিনি বারবার ইহজগতের পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়েছেন এক ভিন্নতর জগতে। তবু তাঁর অনুসন্ধান, তাঁর তীব্র অন্বেষণ রয়ে গিয়েছে অতিপ্রাকৃত চর্চার এক অন্যতম বিষয় হয়ে! গৌরব কিন্তু অতিপ্রাকৃতকে বুঝতে চেয়েছেন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সাহায্যে। তিনি মনে করতেন, 'মানুষ যখন ভূত বা অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, তখন শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই এর পিছনে একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকে। হতে পারে এটি কোনও প্রাকৃতিক ঘটনার ফল। কিংবা এর পেছনে রয়েছে কোনও যৌক্তিক ব্যাখ্যা। আমরা কেবল সেই সব ঘটনাকেই অতিপ্রাকৃত বা স্বাভাবিকের ঊর্ধ্বে বলে গণ্য করি, যা কোনও গবেষণাগারে হুবহু পুনরায় সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।'
এই অনুসন্ধিৎসার সূত্রপাত, আগেই বলেছি, ফ্লোরিডায় থাকার সময়। সেই সময় তিনি ও তাঁর বন্ধুরা একটি ফ্ল্যাটে লাগাতার 'অলৌকিক' ঘটনার সম্মুখীন হন। লাগাতার ফিসফাস, কাদের হেঁটে চলার শব্দ, সর্বোপরি এক তরুণীর ছায়ামূর্তি! এই অভিজ্ঞতা গৌরবকে বদলে দিয়েছিল বরাবরের জন্য। এরপর যতদিন তিনি বেঁচেছিলেন, সারাক্ষণই খুঁজে বেরিয়েছেন অলৌকিকতার আড়ালে থাকা সত্যকে। বুঝেছেন, বহ ক্ষেত্রেই এসবের নেপথ্যে থেকে গিয়েছে কোনও না কোনও পার্থিব কারণ। কিন্তু সব ক্ষেত্রে নয়। যে কোনও যুক্তি-তর্ক-ব্যাখ্যার গলতায় যাকে ধরা যাবে না। সে রয়েছে এসবের থেকে অনেক দূরে। যাকে বুঝতে গেলে প্রবেশ করতে হবে এক চিররহস্যে ঢাকা প্রদেশে।
আমেরিকার প্যারানেক্সাস অ্যাসোসিয়েশন থেকে প্রশিক্ষণের পর ২০০৯ সালে দেশে ফিরে আসেন গৌরব। প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্ডিয়ান প্যারানর্মাল সোসাইটি। শুরু থেকেই যে সংস্থা জানিয়ে দিয়েছে, কোনও আচারভিত্তিক সমাধান নয়, তারা কাজ করবে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা ও প্রযুক্তির সাহায্যে। ইএমএফ রিডিং, সাউন্ড ম্যাপিংয়ের মতো নানা পদ্ধতি অবলম্বন করেই কাজ করত আইপিএস। পরবর্তী কয়েক বছরে ৬ হাজারের বেশি 'কেস' নিয়ে কাজ করেছে তারা। যার মধ্যে ভানগড়ের কেল্লা থেকে মুকেশ মিলসের মতো কুখ্যাত স্থান যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে বিভিন্ন বাড়ি, প্রতিষ্ঠান, পরিত্যক্ত কারখানাও। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিন্তু গৌরবের দল জানিয়ে দিয়েছে, সেই সব স্থানের 'ভৌতিক' ঘটনা আসলে ইনফ্রা সাউন্ড, দৃষ্টিভ্রম, কার্বন মনোক্সাইড কিংবা স্রেফ আতঙ্কের প্রতিফলন মাত্র।
ইউএফও বা রহস্যময় প্রাণী নিয়েও আগ্রহ ছিল প্রবল। তবু, গৌরব তিওয়ারিকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল অতীন্দ্রিয় মৃত্যুলোকের হিমশীতলতাই। আইপিএসের হয়ে কাজ করতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি কোনও অলৌকিকতা খুঁজে পাননি। কিন্তু... বাকি ঘটনাগুলি তাঁকে ক্রমশ ঠেলে দিচ্ছিল এক অনিঃশেষ আতঙ্কের কুয়োর মধ্যে। শেষপর্যন্ত মৃত্যু এসে তাঁকে জীবন থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। মাত্র একত্রিশেই।
কী হয়েছিল শেষদিন? সেদিন সকালে নিজের মেল চেক করছিলেন গৌরব। কোনও এক ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে তাঁর ছবি ছাপা হয়েছিল। সেই ছবি তিনি সোশাল মিডিয়ায় পোস্টও করেন। রাতে বাড়ি ফিরে বাথরুমে ঢোকেন স্নান করতে। এরপরই শোনা যায় এক ভারী শব্দ! দরজা খুলে দেখা যায়, তিনি মেঝেতে পড়ে রয়েছেন। গলায় এক মোটাসোটা কালো দাগ। তদন্তশেষে দিল্লি পুলিশ জানিয়ে দেয়, এটা আত্মহত্যা। কোনও ওড়না জাতীয় কিছু দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে লোহার রড থেকে ঝুলে পড়েছিলেন গৌরব। তদন্তকারীদের অনুমান, ব্যক্তিগত সমস্যা ও অবসাদ থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন 'ভূত শিকারী'। দাবি করা হয়েছিল, স্ত্রীর সঙ্গে নাকি আগের দিনই ঝগড়া হয়েছিল গৌরবের। অন্যদিকে মা-বাবাও ভালো চোখে দেখছিলেন না ছেলের এই কাণ্ড! এসবের কারণেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারেন তিনি।
কিন্তু এই দাবি উড়িয়ে দিতে দেখা গিয়েছে গৌরবের পরিবারকে। মাত্র পাঁচ মাস আগে বিয়ে হয়েছিল। ব্যক্তিগত জীবন ছিল ব্যস্ততায় ভরা। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যও ছিল যথেষ্ট। তাহলে গৌরব কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাবেন! আর গৌরবের ঘনিষ্ঠরা বলেন অন্য কথা। তাঁরা জানিয়েছেন, জীবদ্দশার একেবারে শেষদিকে পশ্চিম দিল্লির জনকপুরীতে একটি কেস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে 'বিপদে' পড়তে হয়েছিল গৌরবকে। এক তরুণী দাবি করেছিলেন, ওই বাড়িতে নাকি একাধিক প্রেতাত্মা রয়েছে। আর সেখানে যাওয়ার পর থেকেই গৌরবের মনে হতে থাকে কোনও 'নেগেটিভ এনার্জি'র পাল্লায় পড়েছেন তিনি। তাহলে? আর পাঁচটা দাম্পত্য সমস্যায় পড়ে আত্মহত্যা, নাকি কোনও অন্ধকার জগতের ষড়যন্ত্র? গৌরব তিওয়ারির মৃত্যু ঘিরে জেগে থাকা কুয়াশা কোনওদিনও হয়তো ভেদ করা যাবে না।
