গত কয়েক বছর কলকাতা ডার্বির বড় আকর্ষণ ছিল দুই স্প্যানিশ কোচের মগজাস্ত্রের লড়াই। তবে এবার সেই ছবিটা বদলেছে। ইস্টবেঙ্গলের ডাগআউটে রয়েছেন স্প্যানিশ কোচ আন্তোনিও লোপেস হাবাস। মোহনবাগানের নতুন 'হেডস্যর' গ্রিসের প্যানোস। তাই শনিবার যুবভারতীতে মরশুমের প্রথম ডার্বিতে দেখা যাবে স্পেন বনাম গ্রিসের দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও দ্বৈরথ। দুই কোচই ডুরান্ড কাপের ম্যাচের আগে সাংবাদিক সম্মেলনে এলেন। কী বললেন তাঁরা?
কলকাতা ডার্বির আগে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর মোহনবাগানের নতুন কোচ প্যানাজিওটিস ডিলমপেরিস। আগ্রাসী ফুটবলের প্রতিশ্রুতি দিলেও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, মাত্র তিনটি অনুশীলন সেশনে তাঁর ফুটবল দর্শন পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়তো সম্ভব নয়। তবুও ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে মরশুমের প্রথম ডার্বিতে ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই নামতে চান তিনি। ডিলমপেরিস বলেন, "মডার্ন ফুটবলের দর্শনেই চলব। আক্রমণাত্মক খেলব। তবে তিন দিনে তিনটি অনুশীলন সেশনে সেটা সম্ভব নয়।"
অনুশীলনে আপুইয়া, অনিরুদ্ধরা। ছবি মোহনবাগান সোশাল মিডিয়া।
ডার্বির গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত গ্রিক কোচ। তিনি বলেন, "আমি জানি ডার্বি এই শহরের আবেগ। মোহনবাগান সমর্থকদের জন্যও তাই। তবে আমার কাছে প্রতিটি ম্যাচই ডার্বি।" নিজের দলের শক্তির উপর পূর্ণ আস্থা রেখে মোহনবাগান কোচ বলেন, "ভারতের সেরা ফুটবলাররা আমার দলে রয়েছে। এমন দল হাতে থাকলে যে কোনও কোচের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। আমাদের দল যে কোনও দলকে হারাতে পারে।" মোহনবাগান সমর্থকদের উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন প্যানোস। তাঁর কথায়, "সমর্থকরা আমাকে যেভাবে স্বাগত জানিয়েছেন, তার জন্য ধন্যবাদ। ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে ডার্বি দিয়েই শুরু করাটাও দারুণ ব্যাপার।"
নতুন ক্লাব, নতুন দায়িত্ব। বাড়তি চাপ অনুভব করছেন? গ্রিক হেডস্যরের জবাব, "মোহনবাগানের মতো ঐতিহাসিক ক্লাবে কাজ করা আর সমর্থকদের প্রত্যাশা আমার কাছে চাপ নয়, বরং অনুপ্রেরণা। কলকাতায় আসার পর থেকেই এই ম্যাচের অপেক্ষায় ছিলাম। আমি আত্মবিশ্বাসী।" ডুরান্ড কাপের ডার্বিতে কি এবার দেখা যাবে নিখাদ ভারতীয় ব্রিগেডের দ্বৈরথ? মরশুম শুরুর আগে অনুশীলন সে ইঙ্গিত দিচ্ছে। সঙ্গে বিদেশিদের অনুপস্থিতি কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলছে ডার্বি নিয়ে সমর্থকদের আগ্রহে। যদিও এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না তিনি। "বিদেশি ফুটবলার থাকবে কি থাকবে না, সেটা নিয়ে ভাবছি না। আমার হাতে সেরা ভারতীয় স্কোয়াড রয়েছে। আরও একটা অনুশীলন সেশনের পর প্রথম একাদশ চূড়ান্ত করব।"
এদিন গ্রিক কোচের সঙ্গে এসেছিলেন সবুজ-মেরুনে দু'বছরের চুক্তিতে সই করা দেজান দ্রাজিচ। তাঁর সংযোজন, "ভারতীয় হোক কি বিদেশি সব ফুটবলারদের কাছে ডার্বি স্পেশাল হয়। আমরা মোহনবাগান, সবাই জেতা ছাড়া কিছ আশা করে না। সমর্থকরা মাঠে আসুন এবং সেলিব্রেট করুন। জনি কাউকো ও আর্মান্দো সাদিকুর সঙ্গে কথা হয়েছে মোহনবাগান নিয়ে। তারা বলেছিল মোহনবাগান ভারতের সেরা দল।" সবুজ-মেরুন জার্সিতে মাঠে নামতে মুখিয়ে রয়েছেন সার্বিয়ান মিডফিল্ডার দেজান দ্রাজিচ। ডার্বির আগে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, ভারতীয় হোক বা বিদেশি– সব ফুটবলারের কাছেই ডার্বি বিশেষ ম্যাচ। তাঁর কথায়, "আমরা মোহনবাগান। এখানে জয় ছাড়া অন্য কিছু কেউ আশা করে না। সমর্থকদের বলব মাঠে আসুন। আমাদের সমর্থন করুন। একসঙ্গে সেলিব্রেট করুন।" দ্রাজিচ আরও জানান, প্রাক্তন মোহনবাগান ফুটবলার জনি কাউকো ও আর্মান্দো সাদিকুর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকেই তিনি শুনেছেন, "মোহনবাগান ভারতের সেরা দল।"
অন্যদিকে, কলকাতা ডার্বির আগে প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় কিছুটা হলেও আক্ষেপ প্রকাশ করলেন ইস্টবেঙ্গলের হেডকোচ হাবাস। তাঁর কথায়, "ডার্বির মতো বড় ম্যাচের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি। আমি প্রতিপক্ষকে নিয়ে ভাবছি না। এত কম সময়ে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলার প্রস্তুতি নেওয়া খুব কঠিন। অতীত নিয়ে ভাবছি না। কিন্তু ম্যাচটা তো ডার্বি। তাই আমাদের খেলতেই হবে এবং জিততেও হবে।" একই সঙ্গে তিনি জানান, মোহনবাগানকে সম্মান করলেও এখন তাঁর সমস্ত মনোযোগ ইস্টবেঙ্গলকে নিয়েই। "মোহনবাগানকে সম্মান করি। তবে ইস্টবেঙ্গল নিয়েও গর্বিত। এখন ইস্টবেঙ্গলের কোচ। ইস্টবেঙ্গলের জন্যই লড়াই করব," মন্তব্য হাবাসের।
অনুশীলনে লাল-হলুদ ফুটবলাররা। ছবি ইস্টবেঙ্গল সোশাল মিডিয়া।
লাল-হলুদ দল নিয়েও আশাবাদী স্প্যানিশ কোচ। তাঁর মতে, বর্তমান স্কোয়াড যথেষ্ট ভালো হলেও আরও দু-তিন জন ভারতীয় ফুটবলার যোগ দিলে স্কোয়াড সম্পূর্ণ হবে। তবে ডার্বির আগে ইস্টবেঙ্গল শিবিরে রয়েছে বড় ধাক্কাও। হাবাস জানিয়ে দিয়েছেন, বরিস সিং এবং দানিশ ফারুখ এই ম্যাচে খেলতে পারবেন না। তাঁদের সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরতে অন্তত আরও ১৫ দিন সময় লাগবে। উল্লেখ্য, প্রথমদিন ফিটনেস ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি সিচুয়েশন এবং ট্রানজিশনের উপর বাড়তি জোর দিয়েছিলেন হাবাস। অন্যদিকে, মোহনবাগান আবার দীর্ঘদিনের স্প্যানিশ ঘরানা ছেড়ে এবার ভরসা রাখছে প্যানাজিওটিস ডিলমপেরিসের গ্রিক-মস্তিষ্কে। এমনিতে গত দু’মরশুম পাঞ্জাব এফসি-র দায়িত্বে থাকা প্যানাজিওটিস ভারতীয় ফুটবলে নতুন মুখ নন। বরং কড়া হেডস্যর হিসাবেই পরিচিত তিনি। অনুশীলনে দেখা গিয়েছিল রনডো, ট্রানজিশন, সিচুয়েশনের মতো বিষয়। এখন দেখার শনিবাসরীয় ডুরান্ড কাপের ডার্বিতে দুই দলের ফুটবলাররা কোচের আস্থার মর্যাদা কতটা রাখতে পারেন।
