গরম মানেই ক্লান্তি, ঘাম আর রোদের তাপ, এই চেনা ধারণার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অচেনা বিপদ। আজকের শহুরে জীবনে আমরা যত বেশি এসি-নির্ভর হচ্ছি, ততই নিঃশব্দে বাড়ছে কিডনি স্টোনের (Kidney Stone) ঝুঁকি। বাইরে আগুনঝরা রোদ, আর ভেতরে ঠান্ডা ঘর, এই বৈপরীত্যই শরীরকে এমনভাবে প্রভাবিত করছে, যা অনেকে বুঝতেই পারেন না।
ভারতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ নতুন করে কিডনি স্টোনে আক্রান্ত হচ্ছেন। আগে যেটা মূলত রোদে কাজ করা মানুষদের সমস্যা বলে মনে করা হত, এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে অফিসে বসে কাজ করা, সারাদিন ঘরে থাকা মানুষদের মধ্যেও। গরম যত বাড়ছে, এই ঝুঁকিও ততই নীরবে বিস্তার লাভ করছে।
এসি-তে স্বাস্থ্যঝুঁকি! ছবি: সংগৃহীত
এসি ঘরের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এটি শরীরকে ভুল বার্তা দেয়। ঠান্ডা পরিবেশে থাকলে তেষ্টা কম লাগে, ঘামও তেমন হয় না। ফলে আমরা ধরে নিই শরীর ঠিক আছে। কিন্তু বাস্তবে শরীরে ধীরে ধীরে কমতে থাকে জলের পরিমাণ, কোনও সতর্ক সংকেত ছাড়াই। এই অদৃশ্য জলশূন্যতাই কিডনির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
দিনভর কাজের ফাঁকে অনেকেই জলপান না করে চা, কফি বা ঠান্ডা পানীয় পান করেন। এতে তেষ্টা কিছুটা মিটলেও শরীরের প্রকৃত জলের ঘাটতি পূরণ হয় না। বরং ডিহাইড্রেশন আরও বাড়ে।
গরমে বাড়ে কিডনি স্টোনের ঝুঁকি! ছবি: সংগৃহীত
এই পরিস্থিতিতে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায় এবং তা ঘন হয়। ফলে ক্যালসিয়াম, অক্সালেট, ইউরিক অ্যাসিডের মতো উপাদানগুলো সহজেই জমাট বেঁধে পাথর তৈরি করতে শুরু করে। অনেক সময় এই প্রক্রিয়া এত দ্রুত ঘটে যে, কয়েক দিনের মধ্যেই সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে।
খাবারের অভ্যাসও এই ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেয়। গরমে ঠান্ডা পানীয়, প্যাকেটজাত জুস বা অতিরিক্ত নুন দেওয়া পানীয়ের প্রতি ঝোঁক শরীরের ভারসাম্য নষ্ট করে। আবার পালং শাক, বিট, বাদাম বা চকোলেটের মতো অক্সালেটসমৃদ্ধ খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে ঝুঁকি বাড়তে পারে, বিশেষ করে যখন জলপান কম হয়।
যাঁদের আগে কিডনি স্টোন হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও তীব্র। শরীরের ভেতরে আগে থেকেই কিছু প্রবণতা থাকায় অল্প সময়ের জলশূন্যতাও নতুন করে পাথর তৈরি করতে পারে।
জলপানে কমে ঝুঁকি। ছবি: সংগৃহীত
তবে এই সমস্যার সমাধান খুবই সহজ, যদি সচেতন থাকা যায়। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত জলপানই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। গরমকালে শরীরের চাহিদা অনুযায়ী দিনে অন্তত আড়াই থেকে ৩ লিটার জলপান জরুরি। শুধু তেষ্টা পেলেই নয়, নির্দিষ্ট সময় অন্তর জলপানের অভ্যাস তৈরি করতে হবে।
ডাবের জল, লেবুর শরবত শরীরকে হাইড্রেট রাখতে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত নুন, মিষ্টি পানীয় বা প্রসেসড ড্রিঙ্কস এড়িয়ে চলাই ভালো। খাবারে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন, ক্যালসিয়াম পুরোপুরি বাদ না দিয়ে পরিমিতভাবে খাওয়া উচিত।
গরমের আসল লড়াইটা বাইরে যতটা, ভেতরেও ততটাই। তাই শরীরের অদৃশ্য সংকেতগুলো বোঝা এবং সঠিক সময়ে জলপান, এই দুই-ই পারে কিডনিকে সুরক্ষিত রাখতে।
