১৯৯৬ সালে শ্রীলঙ্কাকে প্রথম বিশ্বকাপ জিতিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন অর্জুন রণতুঙ্গা। সেই বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ককে প্রথম দেখায় এখন চিনতেই পারছেন না অনেক ক্রিকেটপ্রেমী! একসময় ভারী চেহারার রণতুঙ্গা (Arjuna Ranatunga) এখন অনেকটাই ছিপছিপে। ব্যারিয়াট্রিক সার্জারির পর তাঁর এই আমূল পরিবর্তন ঘিরে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
সম্প্রতি কলম্বো সাহিত্য উৎসবে যোগ দিতে গিয়ে রণতুঙ্গার সঙ্গে একটি ছবি তোলেন কংগ্রেস নেতা শশী থারুর। পরে সেই ছবি সমাজমাধ্যম এক্স-এ শেয়ার করে তিনি লেখেন, ৬২ বছর বয়সে ব্যারিয়াট্রিক সার্জারির পর রণতুঙ্গার চেহারায় এসেছে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। থারুর জানান, মজার ছলেই প্রাক্তন অধিনায়ক তাঁকে বলেছেন, খেলোয়াড়ি জীবনে যেখানে তিন ওভার ব্যাট করতেই ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, এখন তিনি অনায়াসে টানা তিন ঘণ্টা ব্যাট করতে পারেন!
রণতুঙ্গার এই পরিবর্তন শুধু তাঁর নতুন চেহারার জন্য নয়, স্থূলতার চিকিৎসায় ব্যারিয়াট্রিক সার্জারির গুরুত্ব নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। চিকিৎসকদের মতে, এটি কেবল ওজন কমানোর অস্ত্রোপচার নয়, বরং স্থূলতার কারণে তৈরি হওয়া নানা জটিল স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে অত্যন্ত কার্যকর চিকিৎসাপদ্ধতি।
এক্সে যে ছবি ঘিরে এত শোরগোল। শশী থারুর সঙ্গে রণতুঙ্গা। ছবি: সংগৃহীত
কী এই ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি?
ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি হল স্থূলতার চিকিৎসার জন্য করা বিশেষ ধরনের অস্ত্রোপচার। এতে পাকস্থলীর আকার ছোট করে দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রান্ত্রের গঠনেও পরিবর্তন আনা হয়, যাতে কম খাবারেই পেট ভরে যায় এবং শরীরে ক্যালরি শোষণও কম হয়। ফলে ধীরে ধীরে ওজন কমতে শুরু করে।
যাঁরা দীর্ঘদিন খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং ওষুধ খাবার পরও ওজন কমাতে পারছেন না, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা এই অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিতে পারেন।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি করা হয় স্লিভ গ্যাস্ট্রেকটমি, যেখানে পাকস্থলীর একটি বড় অংশ বাদ দেওয়া হয়। এছাড়া রয়েছে রু-এ-ওয়াই গ্যাস্ট্রিক বাইপাস, যেখানে পাকস্থলী ছোট করার পাশাপাশি ক্ষুদ্রান্ত্রের পথও আংশিক পরিবর্তন করা হয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী মিনি গ্যাস্ট্রিক বাইপাস বা অন্যান্য মেটাবলিক সার্জারিও করা হতে পারে।
শুধু ওজন কমানো নয়, আরও অনেক উপকার
ব্যারিয়াট্রিক সার্জারির উদ্দেশ্য শুধুই ওজন কমানো নয়। এর মাধ্যমে স্থূলতার কারণে তৈরি হওয়া নানা জটিল রোগের ঝুঁকিও অনেকটাই কমানো সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই অস্ত্রোপচারের পর অনেকের টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আসে, উচ্চ রক্তচাপ কমে, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস পায়। পাশাপাশি স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং ফ্যাটি লিভারের সমস্যা কমে এবং হাঁটু ও কোমরের উপর অতিরিক্ত চাপ কমে যাওয়ায় চলাফেরাও সহজ হয়। অনেক রোগীই জানান, অস্ত্রোপচারের পর তাঁদের স্ট্যামিনা, কর্মক্ষমতা এবং দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
দুই বিশ্বজয়ী অধিনায়ক। রণতুঙ্গা, কপিল দেব। ছবি: সংগৃহীত
কারা করাতে পারেন এই অস্ত্রোপচার?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত যাঁদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ৪০ বা তার বেশি, অথবা বিএমআই ৩৫-এর বেশি এবং সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো স্থূলতাজনিত রোগ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি বিবেচনা করা হয়।
তবে অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর শারীরিক, পুষ্টিগত এবং মানসিক মূল্যায়ন করা হয়। কারণ, এই চিকিৎসা সবার জন্য উপযুক্ত নয়।
অস্ত্রোপচার করালেই দায়িত্ব শেষ নয়
চিকিৎসকদের মতে, ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি কোনও ম্যাজিক নয়, আবার ওজন কমানোর শর্টকাটও নয়। সফল ফল পেতে হলে অস্ত্রোপচারের পরও জীবনযাত্রায় স্থায়ী পরিবর্তন আনতে হয়।
সুষম ও উচ্চ-প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ এবং চিকিৎসকের নিয়মিত ফলো-আপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নিয়মগুলি না মানলে আবার ওজন বেড়ে যেতে পারে, এমনকী পুষ্টির ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।
ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি। ছবি: সংগৃহীত
স্থূলতা কোনও বাহ্যিক সমস্যা নয়
খেলোয়াড়ি জীবনে অর্জুন রণতুঙ্গার পরিচয় ছিল তাঁর অসাধারণ নেতৃত্ব, ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্ত এবং ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতায়। কিন্তু অবসরের পর তাঁর নাটকীয় শারীরিক পরিবর্তন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনে দিল, স্থূলতা কোনও বাহ্যিক সৌন্দর্যের সমস্যা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাযোগ্য রোগ।
সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, প্রয়োজন হলে উপযুক্ত অস্ত্রোপচার এবং তার সঙ্গে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস একজন মানুষের জীবন আমূল বদলে দিতে পারে। অর্জুন রণতুঙ্গার এই পরিবর্তন সেই বাস্তবতারই একটি অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ।
