ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ মানেই শুধু মিষ্টি ছাড়া বা কম খাওয়া নয়। কখন, কীভাবে এবং কোন খাবার খাচ্ছেন, সেটিও রক্তে শর্করার ওঠানামায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাত বা রুটিতে হাত দেওয়ার আগে যদি এক বাটি ফাইবার-সমৃদ্ধ স্যালাড খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়, তাহলে খাবার পর রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের জন্য এই ছোট্ট অভ্যাস রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কী এই ‘ফুড সিকোয়েন্সিং’?
ডায়াবেটিস চিকিৎসায় এখন শুধু কী খাচ্ছেন, তা নয়, কখন কী খাবার, কীভাবে খাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই পদ্ধতিকেই বলা হয় ফুড সিকোয়েন্সিং। এতে প্রথমে খেতে হয় আঁশ বা ফাইবার-সমৃদ্ধ সবজি ও প্রোটিন, তারপর ভাত, রুটি বা অন্য শর্করাজাতীয় খাবার।
গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের শুরুতে আঁশযুক্ত সবজি খেলে পাকস্থলী থেকে খাবার ধীরে ধীরে অন্ত্রে যায়। ফলে পরে খাওয়া কার্বোহাইড্রেটও ধীরে হজম ও শোষিত হয়। এর ফলেই খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা কমে।
রোজের ডায়েটে রাখুন স্যালাড। ছবি: সংগৃহীত
কোনধরনের স্যালাড সবচেয়ে উপকারী?
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এমন সবজি বেছে নেওয়া উচিত, যাতে আঁশ বেশি এবং শর্করা কম। যেমন- শসা, টম্যাটো, গাজর, বাঁধাকপি, লেটুস, ক্যাপসিকাম ইত্যাদি। আরও ভালো ফল পেতে স্যালাডে অঙ্কুরিত ছোলা, টক দই, পনির, সেদ্ধ ডিম বা গ্রিল করা চিকেনের মতো প্রোটিন যোগ করতে পারেন। এতে হজমের গতি আরও ধীর হয় এবং পেটও দীর্ঘক্ষণ ভরা থাকে।
গবেষণায় কী মিলেছে?
একাধিক ক্লিনিক্যাল গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যখন কার্বোহাইড্রেটের আগে সবজি ও প্রোটিন খান, তখন তাঁদের খাবার পর রক্তে শর্করার বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে শরীরের ইনসুলিনের প্রয়োজনও কিছুটা কমে। দীর্ঘদিন এই অভ্যাস বজায় রাখলে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী বিটা কোষের উপর চাপও কমতে পারে। যদিও এটি ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নয়, তবে ওষুধ, নিয়মিত শরীরচর্চা ও সুষম খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে এই কৌশল যুক্ত করলে সুফল মিলতে পারে।
নিয়মিত সময় অন্তর জরুরি পরীক্ষা। ছবি: সংগৃহীত
সব স্যালাড কিন্তু উপকারী নয়
স্যালাড মানেই স্বাস্থ্যকর, এমন ধারণা ঠিক নয়। সুইট কর্ন, আলু, ভাজা নুডলস, অতিরিক্ত মেয়োনিজ বা চিনিযুক্ত সস দেওয়া স্যালাডে কার্বোহাইড্রেট ও ক্যালরির পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের বদলে উলটো ক্ষতি হতে পারে। তাই সবচেয়ে ভালো হল সাধারণ সবজির স্যালাড। স্বাদ বাড়াতে লেবুর রস, ধনেপাতা, পুদিনা বা সামান্য অলিভ অয়েল ব্যবহার করতে পারেন।
শুধু স্যালাড খেলেই হবে না
ভাত বা রুটির আগে স্যালাড খেলেই যে ইচ্ছেমতো কার্বোহাইড্রেট বা মিষ্টি খাওয়া যাবে, এমনটা নয়। এই কৌশল অতিরিক্ত খাওয়ার ক্ষতি পূরণ করতে পারে না। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পরিমিত খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ সেবন।
খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব অপরিসীম। ছবি: সংগৃহীত
ছোট্ট বদল, বড় লাভ
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য সব সময় বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় খাবার খাওয়ার অভ্যাসে সামান্য বদলও শরীরের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে ভাত বা রুটির আগে এক বাটি ফাইবার-সমৃদ্ধ স্যালাড খাওয়ার অভ্যাস করুন। এটি কোনও চিকিৎসার বিকল্প নয়, তবে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখার লড়াইয়ে একটি সহজ, নিরাপদ এবং সহায়ক অভ্যাস হতে পারে।
