ক্যানসার নিয়ে অভিনেত্রী ও সাংসদ কঙ্গনা রানাউতের একটি সোশাল মিডিয়া পোস্ট নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইনস্টাগ্রামে তিনি দাবি করেন, ৫০ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে ক্যানসারের প্রকোপ বাড়ছে এবং তাঁর পরামর্শ এর জন্য অতিরিক্ত প্রোটিন শেক ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে দূরে থাকা। পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, সত্যিই কি প্রোটিন শেক ক্যানসারের কারণ হতে পারে?
চিকিৎসকদের বক্তব্য, এই ধারণার পক্ষে কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়েও দেওয়া যায় না। কারণ, সমস্যা প্রোটিনে নয়, বরং কী ধরনের প্রোটিনজাত পণ্য খাওয়া হচ্ছে এবং তা কতটা প্রয়োজন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রোটিন শরীরের শত্রু নয়
প্রোটিন শরীরের অন্যতম অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান। পেশি গঠন ও মেরামত, নতুন কোষ তৈরির প্রক্রিয়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হরমোন ও এনজাইম উৎপাদন, এমনকী দ্রুত ক্ষত সারাতেও প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, দুধ, দই, পনির, ডাল, ছোলা, সয়াবিন, বাদাম ও বিভিন্ন বীজ প্রোটিনের উৎকৃষ্ট উৎস। নিয়মিত যাঁরা ব্যায়াম করেন বা শরীরচর্চার সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রোটিনের প্রয়োজন তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে শরীরের চাহিদা পূরণ হয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ করলেই যে বাড়তি উপকার মিলবে, এমন কোনও প্রমাণ নেই।
কঙ্গনা রানাউত। ছবি: সংগৃহীত
প্রোটিন শেক কি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়?
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, বর্তমানে এমন কোনও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই, যা প্রমাণ করে প্রোটিন শেক সরাসরি ক্যানসারের কারণ। ক্যানসার একাধিক কারণের সমন্বয়ে তৈরি হওয়া এক জটিল রোগ। বংশগত বৈশিষ্ট্য, বয়স, পরিবেশ, জীবনযাপন, স্থূলতা, ধূমপান, অ্যালকোহল, কিছু সংক্রমণ এবং অন্যান্য ঝুঁকির কারণ মিলেই ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়ে। কোনও একটি খাবার বা সাপ্লিমেন্টকে এককভাবে এর জন্য দায়ী করা যায় না।
তাহলে উদ্বেগের কারণ কী?
সমস্যা প্রোটিনে নয়, সমস্যা হতে পারে অনেক বাণিজ্যিক প্রোটিন শেক ও প্রোটিন বারের উপাদানে।
অনেক পণ্যে অতিরিক্ত চিনি, কৃত্রিম স্বাদ, পরিশোধিত উপাদান এবং অপ্রয়োজনীয় ক্যালরি থাকে। এগুলি দীর্ঘদিন নিয়মিত খেলে ওজন বেড়ে যেতে পারে। আর অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা স্তন, বৃহদান্ত্র, কিডনি, লিভারসহ একাধিক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ, প্রোটিনের নামে অতি-প্রক্রিয়াজাত পণ্যের উপর নির্ভর না করে যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রোটিন গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
কারা সতর্ক থাকবেন?
সুস্থ মানুষের জন্য পরিমিত প্রোটিন সাধারণত নিরাপদ। তবে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ, কিছু লিভারের অসুখ বা বিশেষ শারীরিক সমস্যায় ভুগলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়।
একাধিক প্রোটিন পাউডার বা শেক একসঙ্গে খেলে দৈনিক প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি প্রোটিন শরীরে প্রবেশ করতে পারে, যা অপ্রয়োজনীয়।
অতিরিক্ত নয়। ছবি: সংগৃহীত
প্রতিদিন কতটা প্রোটিন প্রয়োজন?
এটি সবার ক্ষেত্রে এক নয়। বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, ব্যায়ামের মাত্রা, অসুস্থতা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ইত্যাদির উপর নির্ভর করে প্রোটিনের চাহিদা বদলে যায়।
অধিকাংশ মানুষের জন্য ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, দই, পনির, ডাল, সয়াবিন ও বাদাম থেকেই দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। এসব খাবারে শুধু প্রোটিন নয়, ভিটামিন, খনিজ, আঁশ ও স্বাস্থ্যকর চর্বিও থাকে, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারী।
প্রোটিন পাউডার মূলত তাঁদের জন্য, যাঁরা শুধুমাত্র খাবার থেকে পর্যাপ্ত প্রোটিন পান না, যেমন প্রবীণ ব্যক্তি বা বিশেষ চিকিৎসাজনিত পরিস্থিতিতে থাকা মানুষ। তবে এটি কখনওই সুষম খাদ্যের বিকল্প নয়।
ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
ক্যানসার প্রতিরোধে কোনও একটি খাবার বাদ দেওয়া সমাধান নয়। বরং ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, ফল, শাকসবজি, দানা শস্য ও ডালসমৃদ্ধ সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ক্যানসার স্ক্রিনিংই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
প্রোটিনকে ভয় নয়, প্রয়োজন বুঝে গ্রহণ করুন। আর প্রোটিন শেককে কখনওই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের বিকল্প ভাববেন না।
