রান্নায় তেল অপরিহার্য। তেল ছাড়া রান্না ভাবাই যায় না। মাছ ভাজা থেকে শুরু করে ঝোল, তরকারি, ভর্তা বা চচ্চড়ি, প্রায় সব রান্নাতেই তেল লাগে। কিন্তু এই তেল নিয়েই সব চেয়ে বেশি বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ বলেন তেল একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে, কেউ আবার অলিভ অয়েল ছাড়া কিছু খেতেই নারাজ।
কিন্তু সত্যিটা হল, শরীরের জন্য তেল প্রয়োজন, তবে সঠিক তেল এবং সঠিক পরিমাণে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ মিলিলিটার তেল প্রয়োজন। অর্থাৎ, মাসে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিলিটার তেল একজন মানুষের জন্য যথেষ্ট। এর বেশি তেল নিয়মিত খেলে হৃদরোগ, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, স্থূলতা এবং রক্তনালিতে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অতিরিক্ততেই বিপদ। ছবি: সংগৃহীত
কোন তেল ভালো, সেটা কীভাবে বুঝবেন?
কোন তেল শরীরের জন্য উপকারী হবে, তা মূলত কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে—- প্রথমত, তেলের স্মোক পয়েন্ট কত। অর্থাৎ, কত ডিগ্রি তাপমাত্রায় তেল পুড়তে শুরু করে। তেল বেশি পুড়লে ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ক্ষতি করে।
দ্বিতীয়ত, সেই তেলে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ কত। ট্রান্স ফ্যাট সব চেয়ে ক্ষতিকর ফ্যাটগুলির একটি। এটি রক্তনালিতে চর্বি জমতে সাহায্য করে এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
এছাড়াও তেলে থাকা মিডিয়াম চেন ফ্যাটি অ্যাসিড, মনোআনস্যাচুরেটেড ও পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ। এই উপাদানগুলো শরীরের এনার্জি, হরমোন ও কোষের স্বাভাবিক কাজকর্মে ভূমিকা নেয়।
বাঙালি রান্নায় সবচেয়ে ভালো কোন তেল?
বাঙালিদের জন্য সব চেয়ে উপযোগী হল সরষের তেল। বিশেষ করে কোল্ড প্রসেসড সরষের তেল। কারণ এতে রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কম হয় এবং প্রাকৃতিক উপাদান অনেকটাই অক্ষত থাকে।
সরষের তেলে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং উপকারী ফ্যাট থাকে। পাশাপাশি এর স্বাদ ও গন্ধ বাঙালি রান্নার সঙ্গে খুব ভালোভাবে মানিয়ে যায়। সরষের তেল সাধারণত দু’ধরনের হয়—
- কোল্ড প্রসেসড
- হট প্রসেসড
এর মধ্যে কোল্ড প্রসেসড তেল তুলনামূলক বেশি স্বাস্থ্যকর বলে মনে করা হয়।
সরষের তেল কি খাওয়া যেতে পারে? ছবি: সংগৃহীত
অলিভ অয়েল কি সবচেয়ে ভালো?
সারা দুনিয়ায় এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলকে সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর তেলের মধ্যে ধরা হয়। এতে খারাপ ফ্যাট কম থাকে এবং হার্টের জন্য উপকারী উপাদান বেশি থাকে। তবে সমস্যা হল, বাঙালির প্রচলিত রান্না যেমন ভাজাভুজি বা কষা রান্নায় অলিভ অয়েল সবসময় ব্যবহার উপযোগী নয়। স্বাদ এবং রান্নার ধরন, দু’দিক থেকেই তা মানানসই নয়। অ্যাভোকাডো অয়েলও ভালো, তবে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
কোন কোন তেল খাওয়া যেতে পারে?
নিয়মিত ব্যবহারের জন্য এই তেলগুলো তুলনামূলক ভালো—
- সরষের তেল
- সানফ্লাওয়ার বা সূর্যমুখী তেল
- গ্রাউন্ড নাট বা চিনাবাদামের তেল
- তিলের তেল
কোন তেল যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলবেন?
যেসব তেল ঠান্ডায় জমে যায়, সেগুলো সাধারণত শরীরের জন্য ক্ষতিকর। যেমন—
- বনস্পতি
- পাম অয়েল
এই ধরনের তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাট বেশি থাকতে পারে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে বাইরে তৈরি ভাজাভুজি, ফাস্ট ফুড বা বেকারির অনেক খাবারে এই তেল ব্যবহার করা হয়।
পরিমাণটাই জরুরি। ছবি: সংগৃহীত
নারকেল তেল নিয়ে এত বিতর্ক কেন?
নারকেল তেলের ভালো এবং খারাপ, দুটো দিকই রয়েছে। এতে মিডিয়াম চেন ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা দ্রুত এনার্জি দেয়। তবে এতে স্যাচুরেটেড ফ্যাটও বেশি। তাই অল্প পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত নারকেল তেল খাওয়া দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।
সবচেয়ে জরুরি পরিমাণ
অনেকেই ভাবেন, তেল পুরোপুরি বাদ দিলে শরীর ভালো থাকবে। কিন্তু সেটাও ঠিক নয়। শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য কিছু পরিমাণ স্বাস্থ্যকর ফ্যাট প্রয়োজন। তাই তেল খাবেন, তবে পরিমাণ বুঝে। প্রতিদিন ২০ মিলিলিটারের বেশি তেল না খাওয়াই ভালো। আর সম্ভব হলে কোল্ড প্রসেসড সরষের তেলকে দৈনন্দিন রান্নায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
