প্রচণ্ড গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে দুধে চিনি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আয়ুষ মন্ত্রক। আর সেই পরামর্শ ঘিরেই শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা। চিকিৎসকেরা যখন অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার বিরুদ্ধে বারবার সতর্ক করছেন, তখন হঠাৎ কেন ‘দুধ-চিনি’ ফর্মুলা সামনে এল— সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে সাধারণের মনে।
দেশের একাধিক রাজ্যে তাপপ্রবাহ ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে। তীব্র গরমে ডিহাইড্রেশন, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, পেশিতে টান, মাথাব্যথা থেকে শুরু করে হজমের গোলমাল— নানা সমস্যায় ভুগছেন বহু মানুষ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী মহিলা এবং যাঁরা দীর্ঘক্ষণ রোদে কাজ করেন।
চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে। ছবি: সংগৃহীত
এই পরিস্থিতিতে হিটওয়েভ মোকাবিলায় কিছু পরামর্শ দিয়েছে আয়ুষ মন্ত্রক। তার মধ্যেই অন্যতম হল দুধের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে খাওয়া। মন্ত্রকের মতে, এই পানীয় শরীরে দ্রুত শক্তি জোগাতে এবং কিছুটা হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, বিষয়টি পুরোপুরি ভুল নয় ঠিকই, কিন্তু তা সবার জন্য সমানভাবে উপযোগীও নয়। ডায়েটিশিয়ান ও ল্যাকটেশন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচণ্ড গরমে অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে জল ও প্রয়োজনীয় খনিজ বেরিয়ে যায়। ফলে ক্লান্তি, দুর্বলতা ও ডিহাইড্রেশনের সমস্যা দেখা দেয়। এই অবস্থায় দুধ ও চিনির মিশ্রণ শরীরকে সাময়িকভাবে কিছুটা দ্রুত শক্তি দিতে পারে।
তাঁদের ব্যাখ্যায়, দুধে থাকা জল, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও প্রোটিন শরীরের ফ্লুইড ব্যালান্স বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে চিনি দ্রুত গ্লুকোজ সরবরাহ করে, যা ক্লান্তি কমাতে কার্যকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাইরে খেলাধুলো করা শিশুদের ক্ষেত্রে এটি সাময়িক এনার্জি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে। একইভাবে গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মহিলাদের গরমজনিত দুর্বলতাও কিছুটা কমাতে পারে এই পানীয়।
মাত্রাতিরিক্ত হলেই বিপদ। ছবি: সংগৃহীত
তবে এই পরামর্শের শিকড় রয়েছে আয়ুর্বেদে। আয়ুর্বেদ মতে দুধ শরীরকে স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। তার সঙ্গে মিছরি বা অপরিশোধিত চিনি যোগ করলে সেই ‘কুলিং ইফেক্ট’ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হয়।
আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানও এই ধারণার কিছুটা সমর্থন করে। দুধের প্রায় ৮৭ শতাংশই জল। পাশাপাশি এতে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রোলাইট থাকে, যা ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্লুকোজ শরীরে সোডিয়াম ও জল শোষণে সাহায্য করে। ওআরএস কার্যকর হওয়ার পিছনেও একই বৈজ্ঞানিক নীতি কাজ করে।
তবে চিকিৎসকেরা সতর্কও করছেন। ডায়াবেটিস, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, পিসিওএস, স্থূলতা বা হজমের সমস্যা থাকলে অতিরিক্ত চিনি মেশানো দুধ ক্ষতিকর হতে পারে। আবার যাঁদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স, আইবিএস বা পেটের অন্যান্য সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে দুধ খেলে পেট ফাঁপা, অস্বস্তি বা ডায়রিয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
জরুরি জলপান। ছবি: সংগৃহীত
বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট বক্তব্য, এটি কোনও ‘মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট’ নয়। তীব্র ডিহাইড্রেশন ঠেকাতে এখনও সবচেয়ে কার্যকর ওআরএস, ডাবের জল, নুন-চিনির লেবুর শরবত, ঘোল, লস্যি বা অন্যান্য ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয়।
গরমে সুস্থ থাকতে চিকিৎসকেরা নিয়মিত জল পান, দুপুরে রোদ এড়িয়ে চলা, হালকা সুতির পোশাক পরা এবং জলসমৃদ্ধ ফল খাওয়ার উপর জোর দিচ্ছেন। তরমুজ, শসার মতো ফল শরীরকে স্বাভাবিকভাবে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সুস্থ মানুষ চাইলে পরিমিত পরিমাণে দুধে চিনি খেতে পারেন। তবে সেটিকে কখনওই জল, ওআরএস বা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হাইড্রেশন পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
