মাঠে তখন খেলা চলছে পুরোদমে। কয়েক মুহূর্ত আগেও বল হাতে ছন্দে ছিলেন প্রাক্তন ক্রিকেটার এসএল অক্ষয়। হঠাৎই অস্বস্তি, মাঠেই লুটিয়ে পড়েন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু আবারও সামনে আনল একটি প্রশ্ন— নিয়মিত খেলাধুলো করা, ফিট অ্যাথলেটিক মানুষদেরও কেন এভাবে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক বা সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়?
চিকিৎসকদের কথায়, শরীরের বাইরের ফিটনেস সব সময় হৃদযন্ত্রের ভেতরের বাস্তব ছবি তুলে ধরে না। জিম, ডায়েট, নিয়মিত শরীরচর্চা— সব কিছু ঠিক থাকলেও অনেক সময় শরীরের ভেতর নিঃশব্দে তৈরি হতে থাকে এমন কিছু বিপজ্জনক সমস্যা, যার কোনও স্পষ্ট লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরা পড়ে না।
এসএল অক্ষয়। ছবি: সংগৃহীত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহু অ্যাথলিট বা অত্যন্ত সক্রিয় মানুষের শরীরেও লুকিয়ে থাকতে পারে মারাত্মক হৃদরোগের ঝুঁকি। যেমন ধমনিতে প্ল্যাক জমা, জিনগত হৃদরোগের প্রবণতা, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল, লুকিয়ে থাকা উচ্চ রক্তচাপ, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা অ্যারিদমিয়া। এর সঙ্গে যদি যোগ হয় অতিরিক্ত জিম, কম ঘুম, মানসিক চাপ বা পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, তা হলে হৃদযন্ত্রের উপর চাপ আরও বাড়ে।
চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হল ‘সাইলেন্ট প্ল্যাক’। ধমনির ভেতরে চর্বি, কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম ও প্রদাহজনিত উপাদান জমে ধীরে ধীরে রক্তনালী সরু হতে থাকে। কিন্তু ফিট মানুষদের শরীর অনেক সময় সেই সমস্যাকে সাময়িকভাবে সামলে নেয়। ফলে কোনও উপসর্গই বোঝা যায় না।
কিন্তু একটু বেশি শারীরিক পরিশ্রমের সময় হঠাৎ সেই প্ল্যাক ফেটে যেতে পারে। তৈরি হতে পারে মারাত্মক ব্লকেজ বা প্রাণঘাতী হার্ট রিদম সমস্যা। আর তখনই ঘটে যেতে পারে সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।
চিকিৎসকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, হার্ট অ্যাটাক আর সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এক নয়। হার্ট অ্যাটাকে রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হয়। কিন্তু সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক ছন্দ আচমকা ভেঙে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যে হার্ট কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। দ্রুত সিপিআর ও ডিফিব্রিলেশন না হলে মৃত্যু এড়ানো কঠিন।
তরুণদের মধ্যে বাড়ছে হার্টের অসুখ। ছবি: সংগৃহীত
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয়দের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ অনেক ভারতীয় কম বয়সেই হৃদরোগে আক্রান্ত হন। বাইরে থেকে রোগা বা ফিট দেখালেও শরীরের ভেতরে ভিসেরাল ফ্যাট, মাত্রাতিরিক্ত ট্রাইগ্লিসারাইড, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ধমনির প্রদাহ তৈরি হতে পারে।
তার উপর দীর্ঘ সময় কাজ, স্ট্রেস, রাত জাগা, ডিহাইড্রেশন এবং পারফরম্যান্সের চাপ হৃদযন্ত্রকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দেয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ, কিছু উপসর্গ কখনও অবহেলা করা উচিত নয়। যেমন—
- বুকে চাপ বা অস্বস্তি
- সামান্য পরিশ্রমে হঠাৎ হাঁপিয়ে যাওয়া
- বুক ধড়ফড় করা
- মাথা ঘোরা বা জ্ঞান হারানো
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি
- আগের তুলনায় কম এক্সারসাইজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া
- পরিবারে কম বয়সে হৃদরোগ বা আচমকা মৃত্যুর ইতিহাস থাকলেও সতর্ক হওয়া জরুরি।
এখন অনেক বিশেষজ্ঞই ৩০ বছরের পর নিয়মিত কার্ডিয়াক স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী ইসিজি, ইকো, স্ট্রেস টেস্ট, লিপিড প্রোফাইল বা করোনারি ক্যালসিয়াম স্কোরিং করানোর কথা বলা হচ্ছে।
ফিটনেসের আড়ালে লুকিয়ে। ছবি: সংগৃহীত
চিকিৎসকদের পরামর্শ, শরীরচর্চা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু শুধু ‘ফিট’ দেখালেই হৃদযন্ত্র নিরাপদ, এমনটা ভাবা বিপজ্জনক। শরীরের ছোট ছোট সতর্কবার্তা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ভালো ঘুম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাই হতে পারে প্রাণ বাঁচানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
এসএল অক্ষয়ের মৃত্যু যেন আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, হৃদরোগ অনেক সময় সবচেয়ে ফিট শরীরের আড়ালেও নীরবে বাসা বাঁধতে পারে।
