বিশ্ব ক্রিকেটে তাঁর নামই যেন আত্মবিশ্বাসের আরেক নাম। মাঠে নামলেই আগ্রাসন, ব্যাটে রানের বিস্ফোরণ। রয়েছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি, রেকর্ডের পাহাড়। কিন্তু সেই বিরাট কোহলিই ভেতরে ভেতরে লড়েছেন ভয়, আত্মসন্দেহ আর মানসিক ক্লান্তির সঙ্গে! কেরিয়ারের সোনালি সময়েও তাঁর মনে হয়েছে, তিনি হয়তো সত্যিই এতটা যোগ্য নন। ‘ইমপস্টার সিনড্রোম’-এ ভোগার কথা এবার প্রকাশ্যে জানালেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক কিং কোহলি।
বেঙ্গালুরুর আরসিবি ইনোভেশন ল্যাব ইন্ডিয়ান স্পোর্টস সামিটে কোহলি বলেন, দীর্ঘদিন দেশের অধিনায়কত্ব করতে করতে তিনি মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। মাঠে পারফরম্যান্স থাকলেও, ভেতরে ভেতরে যেন হারিয়ে যাচ্ছিল খেলার আনন্দ। অধিনায়কত্ব ছাড়ার পর সেই কঠিন সময়েই তাঁর পাশে দাঁড়ান রাহুল দ্রাবিড় এবং বিক্রম রাঠৌর। কোহলির কথায়, তাঁরা শুধু ক্রিকেট নিয়ে নয়, মানুষ হিসেবেও তাঁকে সামলেছিলেন।
ব্যাট হাতে ঝড় তোলা। ছবি: সংগৃহীত
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ইমপস্টার সিনড্রোম’ এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ নিজের সাফল্যকেও বিশ্বাস করতে পারেন না। যতই প্রশংসা, পুরস্কার বা স্বীকৃতি আসুক, মনে হতে থাকে সবটাই ভাগ্যের জোরে হয়েছে। ভেতরে ভেতরে কাজ করে এক অদ্ভুত ভয়— একদিন সবাই বুঝে যাবে, তিনি আসলে ততটা যোগ্য নন।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, সাধারণ আত্মবিশ্বাসের অভাব আর ইমপস্টার সিনড্রোম এক নয়। আত্মবিশ্বাস কম থাকলে মানুষ নিজের দক্ষতা নিয়ে দ্বিধায় থাকেন। কিন্তু ইমপস্টার সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি বড় সাফল্যের পরেও নিজেকে ‘অযোগ্য’ ভাবেন। নিজের অর্জনকে ছোট করে দেখা, সবসময় অন্যের সঙ্গে তুলনা করা এবং ভেতরে ভেতরে অপরাধবোধে ভোগা এই সমস্যার সাধারণ লক্ষণ।
চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যা শুধু সাধারণ মানুষের নয়। তারকা ক্রীড়াবিদ, অভিনেতা, কর্পোরেট দুনিয়ার সফল ব্যক্তিত্ব— অনেকেই এই মানসিক চাপে ভোগেন। কারণ সাফল্যের সঙ্গে বাড়তে থাকে প্রত্যাশা, সমালোচনার ভয় এবং সবসময় নিখুঁত থাকার অদৃশ্য চাপ।
রানের সম্রাট। ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘদিন এই মানসিক অবস্থায় থাকলে উদ্বেগ, অনিদ্রা, বার্নআউট, আত্মবিশ্বাসে সমস্যা এমনকী কাজের দক্ষতাও কমে যেতে পারে। অনেকেই নতুন সুযোগ বা দায়িত্ব নিতে ভয় পান, কারণ ভেতরে ভেতরে তাঁরা নিজেকেই যথেষ্ট মনে করেন না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এই অনুভূতিকে অস্বীকার না করে স্বীকার করাই প্রথম ধাপ। নিজের সাফল্যগুলো মনে রাখা, বারবার অন্যের সঙ্গে তুলনা না করা, কাছের মানুষের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা এবং ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। প্রয়োজন হলে অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।
বিরাট কোহলির এই স্বীকারোক্তি যেন আরও একবার বুঝিয়ে দিল, সাফল্যের হাসির আড়ালেও চলতে পারে গভীর মানসিক যুদ্ধ। আর সেই লড়াইয়ের কথা প্রকাশ্যে বলা দুর্বলতা নয়, বরং সাহস।
