দীর্ঘায়ুর খোঁজে নতুন পরীক্ষা শুরু করেছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বায়ো হ্যাকার ব্রায়ান জনসন (Bryan Johnson)। প্রেমিকার ঋতুস্রাবের রক্ত ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষণ করে জরায়ুর স্বাস্থ্য, ক্ষতিকর রাসায়নিক এবং প্রজননক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি যতই অস্বস্তিকর শোনাক, এর পিছনে রয়েছে বাস্তব বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
মানুষ কত দিন সুস্থভাবে বাঁচতে পারে, বার্ধক্যের গতি কতটা কমানো সম্ভব— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করছেন ব্রায়ান জনসন। নিজের শরীর নিয়ে একের পর এক অভিনব পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তিনি আগেই আলোচনায় এসেছেন। কিন্তু এবার তাঁর নতুন ঘোষণা ঘিরে শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ব্রায়ান জনসন জানান, তাঁর প্রেমিকা কেটের ঋতুস্রাবের ১০ মিলিলিটার রক্ত তিনি একটি গবেষণাগারের মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ফ্রিজে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। পোস্টটি মুহূর্তে ভাইরাল হয়। কেউ একে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দেখেছেন, আবার অনেকের মতে, দীর্ঘায়ুর নেশা এবার হয়তো অতি উৎসাহের পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে।
ব্রায়ান জনসন। ছবি: সংগৃহীত
তবে জনসনের দাবি স্পষ্ট, এটি কোনও চমক তৈরির প্রচেষ্টা নয়। তাঁর মতে, ঋতুস্রাবের রক্ত সাধারণ রক্তের মতো নয়। এটি সরাসরি জরায়ু থেকে বেরিয়ে আসে। তাই এই নমুনা বিশ্লেষণ করে জরায়ুর কোষ, রোগপ্রতিরোধী কোষ, স্টেম সেল এবং জরায়ুর সামগ্রিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য পাওয়া যেতে পারে, যা প্রচলিত রক্ত পরীক্ষায় সম্ভব নয়।
শুধু তা-ই নয়, এই নমুনা থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক, পিএফএএস বা কেমিক্যালস এবং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এমন বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতিও পরীক্ষা করা সম্ভব বলে তাঁর দাবি।
এই বিতর্ক প্রসঙ্গে গবেষকরা বলছেন, বিষয়টি শুনে অনেকের অস্বস্তি হতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে এটি মোটেই অমূলক নয়। তাঁদের কথায়, ঋতুস্রাবের রক্ত এমন একটি টিস্যু, যা শরীর প্রতি মাসে স্বাভাবিকভাবে ঝরিয়ে আবার নতুন করে তৈরি করে। তাই এটি জরায়ুর স্বাস্থ্য বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ, সহজ এবং অস্ত্রোপচারবিহীন উপায় হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই এই ধরনের নমুনা ব্যবহার করে এন্ডোমেট্রিওসিসের মতো রোগ দ্রুত শনাক্ত করার উপায় নিয়ে কাজ করছে। বর্তমানে এই রোগ নিশ্চিত করতে অনেক ক্ষেত্রেই ল্যাপারোস্কোপির প্রয়োজন হয় এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ে সাত থেকে দশ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, গবেষণার জন্য মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে জৈব নমুনা সংরক্ষণ করা গবেষণাগারে একেবারেই প্রচলিত নিয়ম। তাই নমুনা ফ্রিজে রাখা নিয়ে অস্বাভাবিক কিছু নেই।
খুলবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন দরজা? ছবি: সংগৃহীত
তবে তাঁরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। প্রথমত, একজন মানুষের নমুনা থেকে কোনও বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না; এর জন্য বৃহৎ আকারের গবেষণা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ঋতুস্রাবের রক্ত সংরক্ষণ করলে ভবিষ্যতের প্রজননক্ষমতা রক্ষা হবে, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। সন্তান ধারণের ক্ষমতা সংরক্ষণ করতে হলে ডিম্বাণু, ভ্রূণ বা ডিম্বাশয়ের টিস্যুই নির্দিষ্ট এআরটি ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষণ করতে হয়।
পরবর্তী একটি পোস্টে ব্রায়ান জনসন ঋতুস্রাবের রক্তকে 'অত্যন্ত মূল্যবান অথচ অবহেলিত জৈব নমুনা' বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, নিয়মিত এই নমুনা বিশ্লেষণ করা গেলে অস্ত্রোপচার বা বায়োপসি ছাড়াই জরায়ুর স্বাস্থ্যের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
ব্রায়ান জনসনের এই পরীক্ষা আপাতত বিতর্কের জন্ম দিলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, ঋতুস্রাবের রক্ত নিয়ে গবেষণা বিশ্বজুড়েই দ্রুত এগোচ্ছে। ভবিষ্যতে এটি নারীদের বিভিন্ন প্রজননজনিত রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে এখনও প্রয়োজন আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
ব্রায়ান জনসনের এই ঘোষণা তাই শুধু কৌতূহল নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন সম্ভাবনার দরজা কি সত্যিই খুলে দিচ্ছে এই গবেষণা, নাকি এটি এখনও কেবল পরীক্ষাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
