সাঁতার কাটতে নেমেছিলেন কনট্যাক্ট লেন্স পরেই। কে জানত, সেই সামান্য অসতর্কতাই চোখের জন্য ডেকে আনবে ভয়ংকর বিপদ! ৩৮ বছরের ব্রিটিশ নাগরিক ম্যাট ফ্ল্যাকের চোখে দেখা দিল তীব্র ব্যথা, লালচে ভাব, জল পড়া এবং আলো সহ্য করতে না পারার মতো সমস্যা।
প্রথমে সাধারণ চোখের সংক্রমণ মনে হলেও পরে জানা গেল, চোখের কর্নিয়ায় সংক্রমণ ঘটিয়েছে বিরল এক জীবাণু, অ্যাকান্থামিবা (Acanthamoeba)। সময়মতো চিকিৎসা না হলে যা স্থায়ী ভাবে নষ্ট করে দিতে পারে দৃষ্টিশক্তি।
ইন্দোনেশিয়ার বালিতে বেড়াতে গিয়ে সুইমিং পুলে সাঁতার কাটার সময় কনট্যাক্ট লেন্স পরেছিলেন ফ্ল্যাক। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঁ চোখে অস্বস্তি শুরু হয়। চোখ লাল হয়ে যায়, অনবরত জল পড়তে থাকে, তীব্র আলোয় চোখ খুলে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, সার্ফিংয়ের সময় বালি বা নোনা জল চোখে ঢোকার কারণেই এই সমস্যা হয়েছে। তাই কনট্যাক্ট লেন্স খুলে ফেলেন। কিন্তু তাতেও কমেনি সমস্যা। বরং সময়ের সঙ্গে চোখের ব্যথা আরও বাড়তে থাকে। ব্রিটেনে ফিরে চিকিৎসকের কাছে গেলে কর্নিয়া থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। সেখানেই ধরা পড়ে অ্যাকান্থামিবা কেরাটাইটিস (Acanthamoeba Keratitis)।
কনট্যাক্ট লেন্স পরে পুলে নয়। ছবি: সংগৃহীত
কী এই অ্যাকান্থামিবা কেরাটাইটিস?
অ্যাকান্থামিবা কেরাটাইটিস হল কর্নিয়ার একটি বিরল সংক্রমণ। কর্নিয়া হল চোখের সামনের স্বচ্ছ আবরণ। অ্যাকান্থামিবা নামে অতি ক্ষুদ্র এক ধরনের জীব এই সংক্রমণের জন্য দায়ী। যা মাটি ও জলে থাকতে পারে। সুইমিং পুল বা অন্যান্য জলাশয়েও এর উপস্থিতি পাওয়া যায়।
কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণের ঝুঁকি বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জল লেন্সের সরাসরি সংস্পর্শে এলে জলে থাকা জীবাণু লেন্সের নীচে আটকে গিয়ে কর্নিয়ায় সংক্রমণ ঘটাতে পারে। তাই কনট্যাক্ট লেন্স পরে সাঁতার কাটা বা স্নান নিরাপদ নয়।
সাধারণ চোখের সংক্রমণের মতোই শুরু
অ্যাকান্থামিবা কেরাটাইটিসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, প্রথম দিকের উপসর্গ দেখে চোখের সাধারণ সংক্রমণই মনে হতে পারে। ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হতে পারে। চোখে তীব্র ব্যথা, লালচে ভাব, অতিরিক্ত জল পড়া, আলো সহ্য না হওয়া, ঝাপসা বা ঘোলাটে দেখা, চোখের মধ্যে কিছু আটকে থাকার মতো অনুভূতি এবং চোখের পাতা খুলতে না পারা এর সাধারণ লক্ষণ। কখনও কর্নিয়ায় ঘোলাটে বা গোলাকার দাগও দেখা দিতে পারে। সংক্রমণ বাড়তে থাকলে কর্নিয়ার ক্ষতি হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কাও থাকে।
সঠিক নিয়ম মেনে লেন্স ব্যবহার করুন। ছবি: সংগৃহীত
শুধু সাঁতার নয়, স্নানও বিপজ্জনক
কনট্যাক্ট লেন্স পরে জলের সংস্পর্শে আসাটাই মূল ঝুঁকি। তাই শুধু সুইমিং পুল নয়, স্নানের সময়ও কনট্যাক্ট লেন্স খুলে রাখা উচিত। এমনকী ডেইলি ডিসপোজেবল লেন্স পরলেও জলের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি কমে না। কারণ সমস্যা লেন্স কত দিন ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে নয়; লেন্স ও চোখ জলের সংস্পর্শে এসেছে কি না, সেটিই মূল বিষয়।
কয়েকটি সতর্কতা বাঁচাতে পারে দৃষ্টিশক্তি
সাঁতার কাটার আগে কনট্যাক্ট লেন্স খুলে ফেলুন। স্নানের সময়ও লেন্স পরবেন না। কলের জল দিয়ে কখনও লেন্স ধুয়ে বা সংরক্ষণ করবেন না। লেন্স ব্যবহারের আগে ও পরে হাত ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে নিন এবং নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে লেন্স পরিষ্কার ও পরিবর্তন করুন।
আর কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারের পর চোখে তীব্র ব্যথা, লালচে ভাব, অতিরিক্ত জল পড়া, আলোয় অস্বস্তি বা ঝাপসা দেখার মতো কোনও উপসর্গ দেখা দিলে সেটিকে চোখের সাধারণ সমস্যা ভেবে ফেলে রাখবেন না। চোখে জল লাগার পর এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। কারণ অ্যাকান্থামিবা কেরাটাইটিসের ক্ষেত্রে চিকিৎসা যত দেরি হয়, কর্নিয়ার ক্ষতি ও দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিও তত বাড়তে থাকে।
