যে ধরনের আবহাওয়ায় আমাদের বাস, সেখানে ডিহাইড্রেশন খুব সাধারণ সমস্যা। কিন্তু আমরা বেশিরভাগ সময় সেটাকে গুরুত্ব দিই না। শুধু চরম গরমে নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যেসের কারণে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে অজান্তেই কম জলপান করেন।
ডিহাইড্রেশন শুধু পাহাড়ে ট্রেক করতে যাওয়া মানুষ বা খেলোয়াড়দের সমস্যা নয়। এটি একেবারে দৈনন্দিন একটি অবস্থা, যা ধীরে ধীরে শরীরের উপর প্রভাব ফেলে। অফিসে বসে কাজ করা মানুষ, গৃহিণী, ছাত্রছাত্রী, বয়স্ক- প্রায় সবারই এই সমস্যা দেখা যায়, অথচ বেশিরভাগই বুঝতে পারেন না।
তেষ্টা না পেলেও জরুরি জলপান। ছবি: সংগৃহীত
আমাদের অনেকেরই দিনের ব্যস্ততায় জলপানের কথা মনে থাকে না। কেউ চা-কফির উপর নির্ভর করেন, আবার কেউ তেষ্টা না পেলে জলই পান করেন না। কিন্তু আসল বিষয়টি হল, তেষ্টা পাওয়ার আগেই শরীর ডিহাইড্রেশনের মধ্যে চলে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে তৃষ্ণার অনুভূতি দেরিতে আসে, ফলে সমস্যা আরও বাড়ে।
এমনকী যারা সারাদিন এসি ঘরে বসে কাজ করেন, তারাও নিরাপদ নন। শ্বাস-প্রশ্বাস, ঘাম ও প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে নিয়মিত জল ও ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়। দিনের শেষে অকারণে ক্লান্ত লাগা, মাথা ধরার মতো সমস্যা অনেক সময় এই কারণেই হয়।
শরীরে কী প্রভাব ফেলে?
শরীরের ওজনের মাত্র ১-২% জল কমে গেলেও তার প্রভাব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যেমন-
- সারাক্ষণ ক্লান্তি ও দুর্বলতা
- মনোযোগ কমে যাওয়া, ভুলে যাওয়া
- মাথা ঘোরা বা মাথাব্যথা
- পেশীতে টান বা ব্যথা
- কোষ্ঠকাঠিন্য
- ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, ক্ষত সারতে দেরি
- খিটখিটে মেজাজ, অস্থিরতা
ডিহাইড্রেশনের লক্ষণকে অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত
ডায়াবেটিস থাকলে সমস্যা আরও জটিল হয়। রক্তে শর্করা বেশি থাকলে প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়ে, ফলে শরীর থেকে জল আরও দ্রুত বেরিয়ে যায়। আবার ডিহাইড্রেশন রক্তে শর্করার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া এবং তৃষ্ণা কম অনুভব করার কারণে ডিহাইড্রেশন দ্রুত বাড়ে, যা ইউরিন ইনফেকশন, কিডনির সমস্যা বা হঠাৎ পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শুধু জলই কি যথেষ্ট?
সাধারণভাবে আমরা বলি, 'আরও জল খান।' এটা ঠিক, কিন্তু পুরোটা নয়। শরীরের সঠিক হাইড্রেশনের জন্য শুধু জল নয়, ইলেকট্রোলাইটও জরুরি। সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম- এই খনিজগুলো শরীরে জলের ভারসাম্য বজায় রাখে, স্নায়ু ও পেশীর কাজ ঠিক রাখে।
ঘাম হলে শুধু জল নয়, এই ইলেকট্রোলাইটও বেরিয়ে যায়। ফলে শুধু জলপানে শরীরে জলের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও ভারসাম্য পুরোপুরি ফেরে না। তাই অনেক সময় জলপানের পরও ক্লান্তি বা দুর্বলতা থেকে যায়।
আমাদের ঘরোয়া পানীয়- লেবুর জল, ডাবের জল- এগুলো ভালো বিকল্প, কারণ এতে কিছুটা ইলেকট্রোলাইট থাকে। তবে সবসময় এগুলো পর্যাপ্ত বা সহজলভ্য নাও হতে পারে।
শরীরকে হাইড্রেট রাখুন। ছবি: সংগৃহীত
ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক কতটা দরকারি?
ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক শরীরে জল ও প্রয়োজনীয় খনিজ একসঙ্গে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। এতে এমন উপাদান থাকে যা দ্রুত শরীরের কোষে জল পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।
তবে সব ধরনের ড্রিংক সমান নয়। বেছে নেওয়ার সময়-
- কম চিনি আছে এমন পানীয় বেছে নিন
- সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের পরিমাণ দেখুন
- শুধু ফ্লেভার দেওয়া জল এড়িয়ে চলুন
- ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
- অভ্যেস বদলান, সমস্যার আগেই
ডিহাইড্রেশনকে হালকাভাবে নেবেন না। দুপুরের পর ক্লান্তি, মাথাব্যথা, মনোযোগের অভাব- এই উপসর্গগুলো দেখলে নিজের জলপানের অভ্যেসটা খেয়াল করুন। স্বাস্থ্য ভালো রাখতে শুধু ডায়েট বা ব্যায়াম নয়, নিয়মিত সঠিকভাবে জল ও ইলেকট্রোলাইট নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের স্বাভাবিক কাজের ভিত্তিই হল সঠিক হাইড্রেশন।
