ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৬ লক্ষ শিশু জন্মায় জন্মগত ত্রুটি বা কনজেনিটাল অ্যানোমালি নিয়ে। অথচ আর্শ্চযের বিষয়, এই শিশুদের সংখ্যা, ত্রুটির ধরন বা তাদের চিকিৎসার অগ্রগতি নিয়ে দেশে কোনও জাতীয় তথ্যভান্ডার নেই! ফলে অসংখ্য জীবনের গল্প যেন শুরু হয় নীরব অজানার মধ্যে, যেখানে তথ্যের অভাবই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় চিকিৎসা ও নীতিনির্ধারণের পথে।
একসময় সংক্রামক রোগ ছিল শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতিতে সেই চিত্র ধীরে ধীরে বদলেছে। তার জায়গায় ক্রমেই সামনে আসছে জন্মগত ত্রুটি। সাম্প্রতিক অনুমান বলছে, বিশ্বে জন্মগত ত্রুটির কারণে যে শিশুমৃত্যু ঘটে, তার প্রায় ১৬ শতাংশই ভারতে। অর্থাৎ, সমস্যাটি শুধু চিকিৎসার নয়, জনস্বাস্থ্যেরও এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
ছবি: প্রতীকী
এই বাস্তবতার মাঝেই দিল্লির ইন্ডিয়া হ্যাবিট্যাট সেন্টারে এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের পথচলা শুরু হল। স্মাইল ট্রেন ইন্ডিয়া এবং বার্থ ডিফেক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশন যৌথভাবে চালু করল 'বার্থ অ্যানোমালিজ নেটওয়ার্ক অফ ইন্ডিয়া' (BIND)। এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানো, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণের ব্যবস্থা এবং আক্রান্ত শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত চিকিৎসা পরিষেবাকে আরও বিস্তৃত করা।
উদ্যোক্তাদের দাবি, এই মুহূর্তে জাতীয় জন্মগত ত্রুটি নথিভুক্তকরণ ব্য়বস্থা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন একটি রেজিস্ট্রি ব্য়বস্থা চালু করা, যেখানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। তাতে ঝুঁকির কারণগুলি চিহ্নিত করা যাবে, গবেষণা আরও এগোবে এবং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যনীতি অনেক বেশি তথ্যভিত্তিক ও কার্যকর হতে পারবে।
বর্তমানে দেশে জন্মগত ত্রুটি শনাক্তকরণ ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা বেশ অবিন্যস্ত। অনেক ক্ষেত্রেই স্ক্রিনিং পরিষেবা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছয় না। বড় শহরের বাইরে এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট, ফলে বহু শিশু সময়মতো সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়।
ছবি: প্রতীকী
ভারতে জন্মগত হৃদরোগ, ঠোঁট বা তালু কাটা, স্পাইনা বিফিডা, ক্লাবফুট, ডাউন সিনড্রোম, এমনকি দৃষ্টি ও শ্রবণজনিত সমস্যার মতো নানা ধরনের ত্রুটি দেখা দেয়। অথচ এই সমস্যাগুলির অনেকগুলিই যদি জন্মের পরপরই বা খুব অল্প বয়সে শনাক্ত করা যায়, তবে চিকিৎসার মাধ্যমে তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ বা সংশোধন করা সম্ভব।
তবে বাস্তব ছবিটা অন্যরকম। নবজাতকের নিয়মিত চিকিৎসা পরিষেবা, সার্জারি ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা—এই সবকিছুর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়। ফলে অনেক পরিবার এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে বেড়ায়, অথচ সঠিক চিকিৎসার সুস্পষ্ট পথ খুঁজে পায় না।
চিকিৎসকদের মতে, জন্মগত ত্রুটি এখনও জনস্বাস্থ্য ব্য়বস্থায় যে গুরুত্ব পাওয়ার কথা, সেই গুরুত্ব পায় না। জাতীয় রেজিস্ট্রি না থাকায় সমস্যার প্রকৃতি বোঝাও কঠিন। আর তথ্য ছাড়া পরিকল্পনা হয় অসম্পূর্ণ, উদ্যোগ হয় বিচ্ছিন্ন।
তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় এসেছে জন্মগত ত্রুটিকে জনস্বাস্থ্যের বড় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখার। কারণ প্রতিটি জন্মগত ত্রুটির পেছনে থাকে একটি নবজাতকের জীবন, একটি পরিবারের আশা, আর একটি ভবিষ্যৎ—যে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পেলে হয়তো অনেকটাই সুস্থ জীবনে ফিরতে পারত।
